ঢাকা সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর

ত্রাণের টিন সরবরাহে অনিয়ম!


নিজস্ব প্রতিবেদক photo নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৬-৭-২০২৬ রাত ৯:৪৭

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের জন্য বিপুল পরিমাণ ত্রাণের ঢেউটিন সরবরাহকে কেন্দ্র করে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেড (বিএমটিএফ)-এর বিরুদ্ধে টেন্ডারের শর্ত লঙ্ঘন, মিথ্যা তথ্য প্রদান এবং কোটি টাকার ভ্যাট সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৪৬ কোটি ৭০ লাখ টাকার এ ক্রয় কার্যক্রমে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভ্যাট সুবিধা গ্রহণ করা হলেও বাস্তবে সরবরাহ করা টিন অন্য প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রাপ্ত নথি, কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে বিতরণের জন্য ঢেউটিন সংগ্রহে ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) পদ্ধতিতে ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এ কার্যক্রমে সরবরাহকারী হিসেবে দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেড (বিএমটিএফ)। মোট ক্রয়মূল্য প্রায় ৪৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

টেন্ডার শর্তে কী ছিল?
টেন্ডার নথি অনুযায়ী, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যদি নিজস্ব কারখানায় পণ্য উৎপাদনকারী হয়, তাহলে নির্ধারিত ভ্যাট সুবিধা বা অব্যাহতি প্রযোজ্য হবে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান নিজে উৎপাদন না করে অন্য কোনো উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহ করে সরবরাহ করলে তাকে ট্রেডিং বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং প্রচলিত হারে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) পরিশোধ করতে হবে।
এ ছাড়া উৎপাদনকারী হিসেবে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে শিল্প নিবন্ধন, কারখানার তথ্য, উৎপাদন সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল।

অভিযোগের কেন্দ্রে বিএমটিএফ
অভিযোগকারীদের দাবি, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেড টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নিজেকে ঢেউটিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করে ভ্যাট সুবিধা গ্রহণ করেছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ঢেউটিন উৎপাদন কারখানা নেই।
তাদের অভিযোগ, সরবরাহ করা টিনের গায়ে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান টি কে গ্রুপের ‘ঈগল মার্কা টিন’-এর ব্র্যান্ডিং পাওয়া গেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, বিএমটিএফ নিজস্ব উৎপাদিত টিন সরবরাহ করেছে, নাকি অন্য প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত টিন সংগ্রহ করে সরবরাহ করেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, যদি অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টিন সংগ্রহ করে সরবরাহ করা হয়ে থাকে, তাহলে বিএমটিএফ প্রকৃত অর্থে উৎপাদনকারী নয়; বরং একটি ট্রেডিং বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকায় ছিল। সে ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য ভ্যাট সুবিধা গ্রহণের সুযোগ ছিল না।

ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ কত?
মোট ক্রয়মূল্য প্রায় ৪৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এই অর্থের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট হিসাব করলে সম্ভাব্য ভ্যাটের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭ কোটি ৫ লাখ টাকা।
অর্থনীতি ও রাজস্ব বিশ্লেষকদের মতে, যদি কোনো প্রতিষ্ঠান প্রকৃত উৎপাদনকারী না হয়, অথচ উৎপাদনকারী পরিচয়ে ভ্যাট বা কর-সুবিধা গ্রহণ করে থাকে, তাহলে তা রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতির কারণ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তদন্তের দাবি রাখে।

নথিতে যা পাওয়া গেছে
প্রাপ্ত কার্যাদেশ, বিল নিষ্পত্তি এবং মূল্যায়ন-সংক্রান্ত নথিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দরপত্র মূল্য, আয়কর কর্তন এবং ভ্যাট-সংক্রান্ত হিসাবের উল্লেখ রয়েছে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, যে ভিত্তিতে বিএমটিএফকে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, সেই তথ্য ও কাগজপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি প্রকৃত উৎপাদনকারী হয়, তাহলে তার শিল্প নিবন্ধন, উৎপাদন ইউনিট, যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ ব্যবহার, কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন রেকর্ড এবং জনবল কাঠামোর সুস্পষ্ট তথ্য থাকার কথা। এসব তথ্য যাচাই করলেই প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হবে।

প্রশ্নের মুখে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, শুধু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নয়, টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি, ক্রয় কমিটি এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠান প্রকৃত উৎপাদনকারী কি না, তা যাচাইয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায়।
সরকারি ক্রয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেন্ডার মূল্যায়নের সময় যদি প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে, তাহলে তা প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা দায়িত্বে অবহেলার শামিল হতে পারে।

তদন্তের দাবি
অভিযোগকারীরা বিষয়টি তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অর্থ মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তাদের দাবি, বিএমটিএফের প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহ করা টিনের উৎস, ক্রয়-বিক্রয়ের চালান, মূসক (ভ্যাট) নথি, ভ্যাট রিটার্ন, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নথিপত্র তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের তথ্য গোপন, প্রভাব বিস্তার বা নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না, তাও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেডের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।
অপরদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান সকালের সময়-কে বলেন, “দুর্যোগের সময় আমরা ত্রাণ বিতরণ করি। আপনারা জানেন, অধিদপ্তর বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির কাছ থেকে টিন বুঝে নিয়েছে। তারা যদি ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে থাকে, তাহলে আপনারা তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।”
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট-সংক্রান্ত অনিয়ম বা শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ও দায়িত্বও তদন্তের আওতায় আসা উচিত। সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী অভিযোগ প্রমাণিত হলে কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই এ ঘটনায় টেন্ডার মূল্যায়ন, সরবরাহ প্রক্রিয়া এবং ভ্যাট-সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

এমএসএম / এমএসএম

ত্রাণের টিন সরবরাহে অনিয়ম!

বদলির ফাঁদে পার্বত্যের প্রাথমিক শিক্ষকরা

নতুন সম্ভাবনার নাম মাশরুম

বন কেটে বাউন্ডারি শহীদের সাম্রাজ্য

GAP-এর মাধ্যমে নিরাপদ কৃষি ও রপ্তানির নতুন দিগন্ত: বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি

৩৩.৩৫ কোটিতে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের কন্ট্রোলার

মন্ত্রীর সঙ্গে দখলের তালিকায় দেশের শীর্ষ শিল্পগ্রুপ

বনবিভাগের মালি থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক বাউন্ডারি শহিদ

বন রক্ষকই যখন দখলের গডফাদার

বাস কোম্পানির চাঁদায় চলে এসপি অফিসের চা খরচ

ডিপফেক ও এআই প্রযুক্তি চ্যালেঞ্জে এমএস-১৩ গ্যাং এর আদলে অপরাধীরা সক্রিয়

বিসিকের অসংতিপূর্ণ টেন্ডার কার্যক্রম!

কুরিয়ারে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে জাল টাকা