ঢাকা বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

মন্ত্রীর সঙ্গে দখলের তালিকায় দেশের শীর্ষ শিল্পগ্রুপ


নিজস্ব প্রতিবেদক photo নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৯-৬-২০২৬ রাত ১১:৫৫

ময়মনসিংহের ভালুকা রেঞ্জের সংরক্ষিত বনভূমি এখন যেন দেশের প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দখলে গড়ে ওঠা এক বিশাল শিল্পাঞ্চল। বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, অন্তত ৫ হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমি জবরদখল করে শিল্পকারখানা, গার্মেন্টস, স্পিনিং মিল, ডেইরি, কেমিক্যাল ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন দেশের শীর্ষ শিল্পপতি ও করপোরেট গ্রুপগুলো। তালিকায় রয়েছেন বর্তমান বনমন্ত্রী আব্দুল আওয়াল মিন্টু, পারটেক্স গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, এনভয় গ্রুপ, রানার গ্রুপ, ব্র্যাকসহ প্রভাবশালী একাধিক শিল্পগোষ্ঠীর মালিক ও পরিচালকরা।

বন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে সর্বশেষ জরিপভিত্তিক তালিকায় দেখা যায়, ভালুকা রেঞ্জের হবিরবাড়ী বিটের বিস্তীর্ণ বনভূমি ধীরে ধীরে দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, বনমন্ত্রীর মালিকানাধীন লাল তীর কোম্পানি লিমিটেডের দখলেই রয়েছে প্রায় ৮০ একর বনভূমি। তবে স্থানীয় অনুসন্ধান ও সরেজমিন ঘুরে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন ধরে বনভূমি দখল করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও রহস্যজনকভাবে নীরব থেকেছে বন বিভাগ। অভিযোগ রয়েছে, ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও ভালুকা রেঞ্জ কর্মকর্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদায়নের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়। স্থানীয়দের দাবি, সেই অর্থের একটি বড় অংশ আসে বনভূমি দখল করে গড়ে ওঠা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের মাধ্যমে। ফলে বনভূমি রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের একাংশ কার্যত দখলদারদের নীরব সহযোগীতে পরিণত হয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন ব্যক্তি ও শিল্পগোষ্ঠী ভালুকা রেঞ্জের প্রায় ৫ হাজার একর বনভূমি দখল করে বিশাল শিল্প সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। তাদের হিসাবে, বর্তমান বাজারমূল্যে জবরদখলকৃত এসব বনভূমির মূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুল আর্থিক স্বার্থ জড়িয়ে থাকায় বছরের পর বছর ধরে বনভূমি দখলের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বরং প্রভাবশালী দখলদারদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের কারণেই এই দখল প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

বন বিভাগের তালিকা অনুযায়ী, বর্তমান বনমন্ত্রী আব্দুল আওয়াল মিন্টুর লাল তীর কোম্পানি লিমিটেডের দখলে রয়েছে ৭৯ দশমিক ৯৩ একর বনভূমি দখলের পাশাপাশি শীর্ষে রয়েছে পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল হাশেমের দখলে রয়েছে প্রায় ৪৭ দশমিক ৫০ একর। স্কয়ার নিটস ফেব্রিক্স অ্যান্ড ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরীর দখলে রয়েছে ৩৩ দশমিক ৭২ একর। গাজী ফ্যাশনের মালিক মো. হারুণ অর রশিদের দখলে রয়েছে ৩৯ দশমিক ১৪ একর।

যমুনা সুগার মিল লিমিটেডের চেয়ারম্যান এম সিরাজের দখলে রয়েছে ১৮ দশমিক ৭০ একর। ফিনিক্স হ্যাচারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছামিউল হাসানের দখলে রয়েছে ১৭ দশমিক ৮৩ একর। ব্র্যাকের দখলে রয়েছে ১০ একর। রিদিশা টেক্সটাইল ও রিদিশা স্পিনিং মিলসের দখলে রয়েছে ১০ একর। সামিনা মৎস্য খামারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনায়েতুর রহমান বাপ্পীর দখলে রয়েছে ১০ একর। আইকন আর্কিটেক্ট লিমিটেডের মালিক এ কে এম সাইদুর রহমানের দখলে রয়েছে ৯ একর। এজিসি স্পিনিং মিলের আব্দুল গাফফার চৌধুরীর দখলে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৯ একর।

নাসা ফার্মাস প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. ইদ্রিস আলীর দখলে রয়েছে ৬ দশমিক ২১ একর। মোখলেছুর রহমানের নামে রয়েছে ৬ একর। ইনডেক্স গ্রুপের মাজহারুল কাদেরের দখলে রয়েছে ৫ একর। বাদশা টেক্সটাইল লিমিটেডের মালিক বাদশা মিয়ার দখলে রয়েছে ৪ একর। প্লানেট টেক্সটাইলের পরিচালক মো. সাইদুর রহমান ভূঁইয়ার দখলে রয়েছে ৪ একর। সান আন এনার্জি লিমিটেডের মোখলেছুর রহমানের নামে রয়েছে ৪ একর । এক্সিলেন্ট সিরামিকস ও এক্সিলেন্ট টাইলসের মালিক মো. আব্দুল হালিমের দখলে রয়েছে ৪ একর ।

অরচার্ড গ্রুপ অব কোম্পানির চেয়ারম্যান মো. ফারুকের দখলে রয়েছে ৩ একর। রানার গ্রুপের দখলে রয়েছে ৩ একর। ময়মনসিংহ ডেইরি কমপ্লেক্সের পারভেজ খোকনের দখলে রয়েছে ৩ একর। হারুন সোয়েটারের দখলে রয়েছে ৩ একর। হলিডে কটেজের দখলে রয়েছে ৩ একর। প্যারাডাইস পয়েন্টের নামে রয়েছে ৩ একর। সুপ্রিম সিড লিমিটেডের দখলে রয়েছে ৩ একর।

কনজ্যুমার নিটেক্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান এমদাদুল হকের দখলে রয়েছে ৩ দশমিক ১৮ একর। এনভয় টেক্সটাইল লিমিটেডের পরিচালক আব্দুস সালাম মোর্শেদীর দখলে রয়েছে ২ একর। বেলী ইয়ার্ন ডাইংয়ের মালিক আবুল কাশেমের দখলে রয়েছে ২ একর। কটন গ্রুপের শাহীন মাহমুদের দখলে রয়েছে ২ একর। রাইমার কেমিক্যাল কোম্পানির মঞ্জুর আলমের দখলে রয়েছে ২ একর। ফ্রেশ ফার্ম প্রোডাক্টসের দখলে রয়েছে ২ একর ।

একোয়া চিপস ও আডভা গার্মেন্টস লিমিটেডের নামে রয়েছে মোট ১৭ একর। বিকন গ্রুপের দখলে রয়েছে প্রায় সাড়ে ২০ একর । তাইপে বাংলার দখলে রয়েছে ৭ একর। মো. আহসানুল হকের দখলে রয়েছে প্রায় সাড়ে ১২ একর। ঢাকা নিট গার্মেন্টসের দখলে রয়েছে দেড় একর। প্রেসিডেন্ট সিনথেটিক ইয়ার্ন এর মালিক জোসেফ লরেন্স দখলে ১৪ একর। অবসর প্রাপ্ত মেজর হামিদ এন্ড সন্স লিমিটেডের দখলে ৮ দশমিক ১৪ একর।নাহিদ কম্পোজিট লিমিডেটের এম এ ওয়াহিদের দখলে ১০ একর। নাভানা কোম্পানীর দখলে ৮ একর। রাকিব অটোরাইস মিল আব্দুল কাদেরের দখলে ৪ একর। কম্বাইন এগারো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল্লাহ চৌধুরীর দখলে ৪ একর। এ. এস. কে. এগ্রো প্রোডাক্ট কমপ্লেক্সের দখলে ৪ একর।

গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের পি সি আই এল এর দখলে নামে ১৯ দশমিক ৫০ একর। সি সি ডি বি এর নির্বাহী পরিচালক জয়ন্ত অধিকারীর দখলে ২৫ দশমিক ৫৫ একর। মদিনা স্পিনিং মিলস লিমিটেডের আব্দুর রশিদ খানের দখলে ১৪ একর। কর্ণেল (অব:) মোস্তাফার সিয়া টেক্সটাইলের দখলে ৮ দশমিক ৪১ একর। লাবিব ডাইং মিলস লিমিটেডের দখলে ৩ একর। ফিরোবিতা প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক শামীম আহমেদের দখলে ১৬ একর। ড. মনোয়ার হোসেনের মার্ক এ. ই. এন্টাপ্রাইজের দখলে ৭ দশমিক ৪৯ একর। এক্টিভ স্পিনিং মিলস লিমিটেডের দখলে ২ দশমিক ৫৬ একর। এ. কে প্রোটিন সেন্টার এন্ড হ্যাচারির দখলে ৬ একর ও লে বিজিং এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের দখলে ১ দশমিক ৭৫ একর বনভূমি।

এছাড়াও অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ছোট বড় অনেক গ্রুপের দখলে আরো কয়েকহাজার একর বনভূমি দখলে থাকলেও অদৃশ্য কারনে কোন তথ্য নেই বনবিভাগের কাছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব বনভূমি দখলের পুরো প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ে কাজ করেছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বাউন্ডারি শহীদ নামে পরিচিত শহীদুল ইসলাম এবং যুবলীগের সাবেক নেতা মনিরুজ্জামান ওরফে জঙ্গল মনির ছিলেন এই দখলচক্রের সবচেয়ে সক্রিয় দুই মুখ।

এক সময় বন বিভাগের নার্সারিতে দৈনিক পাঁচ কেজি গমের বিনিময়ে কাজ করা শহীদুল ইসলাম এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। বনভূমি দখল, বাউন্ডারি নির্মাণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য জমি ম্যানেজ করা এবং দখল পাকাপোক্ত করার ক্ষেত্রে ছিল তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ।

অন্যদিকে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে বন বিভাগের অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি মামলা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজস্ব বাহিনী দিয়ে তিনি বনভূমি দখল, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ এবং জমির মালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করতেন স্থানীয়দের দাবী, ভালুকায় বড় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বনভূমিতে গড়ে উঠতে গেলে এই দখলচক্রের ‘সবুজ সংকেত’ লাগত।

ময়মনসিংহ বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভালুকা রেঞ্জের হবিরবাড়ী বিটের আওতাধীন ৯টি মৌজায় মোট বনভূমির পরিমাণ ৭ হাজার ১৭ একর। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৪৪ জন ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রায় ৪ হাজার ৭৯৮ একর বনভূমি জবরদখল করে রেখেছেন বলে বন বিভাগের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

জবরদখলকৃত বনভূমি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ জেলা জজ আদালতে বর্তমানে ১০৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। পাশাপাশি উচ্চ আদালতে এ সংক্রান্ত ৪৭টি রিট পিটিশন ও সিভিল রিভিশন মামলা বিচারাধীন আছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, বন বিভাগের নথিতে যদি বর্তমান বনমন্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের নামে সংরক্ষিত বনভূমি দখলের তথ্য থেকে থাকে, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং জনমনে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়; এটি জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও স্থানীয় জনগণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ।

তিনি অভিযোগ করেন, এ ধরনের ঘটনা প্রশাসনিক ব্যর্থতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আইন প্রয়োগে বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। বনভূমি দখলে জড়িত ব্যক্তি, শিল্পগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। আলমগীর কবির এ ঘটনাকে পরিবেশগত অপরাধ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট এবং পরিকল্পিত পরিবেশ ধ্বংসযজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করেন।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জবরদখলকৃত বনভূমি উদ্ধার এবং অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের লক্ষ্যে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসকের কাছে মোট ৯৫৫টি উচ্ছেদ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে এসব প্রস্তাবের ভিত্তিতে এখনো কোনো মামলা রুজু করা হয়নি বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

এদিকে বনভূমি সংক্রান্ত বিরোধ ও মালিকানা দাবির বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব), ভূমি আপিল বোর্ড এবং সচিব আদালতেও অসংখ্য মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ফলে বনভূমি উদ্ধার ও সংরক্ষণ কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতার মধ্যে আটকে আছে।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুর রহমান বলেন, বন বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো উচ্ছেদ প্রস্তাবনা পাওয়া গেলে এবং সেখানে সরকারি স্বার্থ জড়িত বলে প্রতীয়মান হলে জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তিনি আরও বলেন, দখলদাররা যত বড় শিল্পগোষ্ঠীরই হোক না কেন, জেলা প্রশাসন তাদের কাছে মাথা নত করবে না। খাস জমি দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ ধরনের অবৈধ দখল উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। 

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বনভূমি ও খাস খতিয়ানের বিপুল পরিমাণ জমি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর দখলে থাকলেও গত দেড় দশকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তাদের দাবি, প্রভাবশালী দখলদারদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় এসব দখলের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বনভূমি দখল করে গড়ে ওঠা অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে প্রভাবশালী মহল ও বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের মাসোহারা দিয়ে আসছে। এর ফলে দখলদারদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও কার্যকর উচ্ছেদ হয় না।

বন বিভাগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ময়মনসিংহ বিভাগীয় কর্মকর্তা ও ভালুকা রেঞ্জকে বন বিভাগের অন্যতম “লাভজনক পোস্টিং” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই রেঞ্জে পদায়ন পেতে অনেক সময় মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন ও উচ্চপর্যায়ের তদবির লাগে। কারণ, এখানে দায়িত্ব পেলে বনভূমি দখল করে গড়ে ওঠা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা বলেন, কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করলে তারা জমির মালিকানাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেয়। কোনো প্রতিষ্ঠান বনভূমি দখল করে থাকলে সেই তথ্য বা দলিল তারা স্বেচ্ছায় পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে জমা দেবে না বলেই স্বাভাবিক। 

তিনি বলেন, হাজার হাজার একর জমির মধ্যে কোনটি বন বিভাগের এবং কোনটি নয়, তা পৃথকভাবে যাচাই করা পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে সবসময় সম্ভব হয় না। আবেদনকারীদের জমা দেওয়া নথিপত্রের ভিত্তিতেই পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান করা হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান বনভূমি দখল করেছে কি না, সে বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারে বন বিভাগ। তিনি আরও বলেন, জবরদখলকৃত জমি শনাক্ত করা মূলত পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব নয়। তবে জমা দেওয়া নথিপত্র যাচাইয়ের সময় কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়। 

সরকারি ঘোষিত শিল্পাঞ্চল না হওয়া সত্ত্বেও ওই এলাকায় কীভাবে বিপুল সংখ্যক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই বহু বছর আগে গড়ে উঠেছে। এছাড়া বিগত সরকারের সময়ে কৃষিজমিসহ বিভিন্ন এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। শুধুমাত্র ওই কারণ দেখিয়ে ছাড়পত্র না দেওয়ার মতো কোনো আইন বা বিধিমালা আছে বলে আমার জানা নেই, বলেন তিনি।

অর্থের বিনিময়ে পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান কিংবা মাসিক মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগ প্রসঙ্গে শেখ মো. নাজমুল হুদা বলেন, সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ কেউ অভিযোগ করলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে অধিদপ্তরের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি জানান, পরিবেশ আইন অমান্য করে পরিচালিত বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত তথ্য অধিদপ্তরের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, দেশে বনভূমি দখল এখন এক ধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বন দখলের সময় স্বাভাবিকভাবে কোনো কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। আইনগতভাবে বন দখল নিষিদ্ধ হলেও যাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্ব রয়েছে, তাদের অনেকেই প্রভাবশালীদের সঙ্গে এক ধরনের যোগসাজশে জড়িয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, বন দখলের ঘটনায় যেসব বড় শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে আসে, তাদের অধিকাংশই ক্ষমতাধর মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সরকারে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা বিষয়টি দেখেও যেন না দেখার ভান করে। ফলে প্রভাবশালী মহল বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে বন-সংক্রান্ত অপরাধ করে যাচ্ছে।

বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ সম্পর্কে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর যোগসাজশ ছাড়া এত বড় পরিসরে বনভূমি দখল করে শিল্প সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বন রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দখলদারদের আর্থিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে বলেই মনে হয়। এতে উভয় পক্ষই লাভবান হয়। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বন সংরক্ষণের দায়িত্ব রয়েছে, তাদের কেউ কেউ অর্থের লোভে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে বন ধ্বংসের সহযোগী হয়ে উঠছেন। ফলে তারা বন দখল প্রতিরোধের বদলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দখলদারদের সহায়তা করছেন। এভাবে বন দখলে সহযোগিতাকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মোঃ আমির হোসাইন চৌধুরী বলেছেন, সারাদেশের জবরদখলকৃত বনভূমির একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮ হাজার একর বনভূমি উদ্ধার করে বনায়ন করা হয়েছে এবং আরও ২ লাখ ৩৭ হাজার একর বনভূমি উদ্ধারের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে উচ্ছেদ প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।

ভালুকায় মন্ত্রী ও বিভিন্ন শিল্পগ্রুপের বনভূমি দখলের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব জমি নিয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কোনোটি শুনানি, কোনোটি আপিল এবং কোনোটি স্থিতাবস্থা আদেশের পর্যায়ে থাকায় সরকার সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারছে না। তিনি বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে কাউকে চূড়ান্তভাবে অবৈধ দখলদার বলা যাচ্ছে না।

দীর্ঘদিনেও কেন জবরদখল উচ্ছেদ হচ্ছে না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভালুকার বড় সমস্যা হলো বন বিভাগের অনেক জমি ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়ে গেছে। একই জমির ওপর বন বিভাগের পাশাপাশি ব্যক্তির নামেও রেকর্ড থাকায় আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। এসব জমিতে রেকর্ড সংশোধন ও জবরদখল সংক্রান্ত একাধিক মামলা চলমান রয়েছে।

বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দখলদারদের যোগসাজশের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাইরে থেকে এমন ধারণা সৃষ্টি হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনি জটিলতা রয়েছে। কোনো কর্মকর্তা দখলদারদের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এমএসএম / এমএসএম

মন্ত্রীর সঙ্গে দখলের তালিকায় দেশের শীর্ষ শিল্পগ্রুপ

বনবিভাগের মালি থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক বাউন্ডারি শহিদ

বন রক্ষকই যখন দখলের গডফাদার

বাস কোম্পানির চাঁদায় চলে এসপি অফিসের চা খরচ

ডিপফেক ও এআই প্রযুক্তি চ্যালেঞ্জে এমএস-১৩ গ্যাং এর আদলে অপরাধীরা সক্রিয়

বিসিকের অসংতিপূর্ণ টেন্ডার কার্যক্রম!

কুরিয়ারে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে জাল টাকা

শুল্কফাঁকি দিয়ে অ’বৈধ বাজাজ সিএনজি আমদানির নামে শত কোটি টাকার মালিক এখন হাজী আব্দুর রশিদ বুলু

যৌন সহিংসতা - সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার তীব্র সংকটে বাংলাদেশ

প্রাণীসম্পদ খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপ দিতে কাজ করছে সরকার : শাহজামান খান

দলিল বাণিজ্যের অন্দরমহল

ঢাকার সড়কে "এআই নজরদারি": ডিজিটাল মামলার ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ট্রাফিক চিত্র

ব্লাডব্যাংকের নামে মরন ফাঁদ, মিছে বাঁচার আশা