ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

অভিযোগ বন সংরক্ষক এ.এস.এম. জহির উদ্দিনের বিরুদ্ধে

বন মামলার নথি বদল


শাহেদ ফেরদৌস হিরু photo শাহেদ ফেরদৌস হিরু
প্রকাশিত: ১১-৭-২০২৬ রাত ১০:১২

বনের বুক চিরে তখনও থামেনি করাতের শব্দ। ভোরের নীরবতা ভেঙে শতবর্ষী শালগাছ একের পর এক লুটিয়ে পড়ছিল মাটিতে। কাটা গাছের গুঁড়ি সরানোর আগেই পরিমাপ হচ্ছিল নতুন দখলের সীমানা। সরকারি সংরক্ষিত বনভূমির বুক চিরে গড়ে উঠছিল বসতি, শিল্প-কারখানা আর দখলের নতুন নতুন অধ্যায়। বন বিভাগের কাছে খবরও পৌঁছেছিল। মনে হয়েছিল, এবার হয়তো ধরা পড়বে বনদস্যুদের মূল হোতারা। কিন্তু নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত অন্য দিকেই মোড় নেয়।

একটি অভিযান, একজন গ্রেপ্তার, আদালতে পাঠানো লিখিত স্বীকারোক্তি এবং মামলার সঙ্গে সংযুক্ত সরকারি নথি সবকিছুই ইঙ্গিত করছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্রের দিকে। ধৃত ব্যক্তির জবানবন্দিতে উঠে আসে আরও তিনজনের নাম, যাঁদের একজনকে স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে বনভূমি দখল ও গাছ কাটার মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে চিহ্নিত করে আসছিলেন। কিন্তু মামলা আদালতে পৌঁছানোর আগেই অভিযোগপত্র থেকে উধাও হয়ে যায় সেই নামগুলো। শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত হিসেবে রাখা হয় শুধু হাতেনাতে গ্রেপ্তার হওয়া একজনকে।

প্রতিবেদকের হাতে আসা সরকারি নথি, পিওআর মামলা, লিখিত জবানবন্দি, দাপ্তরিক চিঠিপত্র এবং বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুধু এই একটি মামলাই নয় গত দুই দশকে ভাওয়ালের সংরক্ষিত বনভূমি দখল, গাছ নিধন এবং প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার পেছনে বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে বারবার উঠে এসেছে তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ. এস. এম. জহির উদ্দিন আকনের নাম। তিনি বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বন সংরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মামলার নথি অনুযায়ী, ঢাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ভাওয়াল রেঞ্জের অধীন রাজেন্দ্রপুর পশ্চিম বিটের ৪ নম্বর বাড়ইপাড়া মৌজার গেজেটভুক্ত সিএস ২০৮৭ দাগে সংরক্ষিত বনভূমির কড়ইতলী এলাকায় ২০১৬ সালে অবৈধভাবে গাছ কাটার সময় রাশেদুল ইসলাম নামে একজনকে হাতেনাতে আটক করেন তৎকালীন বিট কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম ও তাঁর সহকর্মীরা। অভিযানের সময় অন্য তিন জন অভিযুক্ত পালিয়ে যান।

বন আইনের বিধান অনুযায়ী ধৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে লিখিত জবানবন্দিসহ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গাজীপুরের বন আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত তাঁকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠান। 

মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে রাশেদুল ইসলাম লিখিতভাবে স্বীকার করেন, তিনি এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি মনির হোসেন ওরফে মনির হাজীর নির্দেশে তাঁর বাবা শামছুল হক ও মা জোসনা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে সংরক্ষিত বনভূমিতে গাছ কাটতে গিয়েছিলেন।

এই জবানবন্দির ভিত্তিতে তৎকালীন বিট কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম চারজনের নাম উল্লেখ করে বন আইনের ১৯২৭ সালের আইনের (২০০০ সালের সংশোধনী) ২৬(১)(ক) ও ২৬(১)(খ) ধারায় পিওআর মামলা নম্বর–৩/রাজ (প)/২০১৬–১৭ প্রস্তুত করেন এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র রেঞ্জ কর্মকর্তার মাধ্যমে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠান।

পরবর্তীতে তৎকালীন রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহ মো. হোসেন তাঁর দপ্তরের পিওআর নং–৪/ভারে/২০১৬–১৭ মূলে মামলার নথি বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে পাঠান, যাতে তা গাজীপুর বন আদালতে উপস্থাপন করা যায়। যার মামলা নং ১৯৫/২০১৬।

প্রতিবেদকের হাতে থাকা নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৌঁছানোর পরই মামলার গতিপথ বদলে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এস এম জহির উদ্দিন আকন চারজনের পরিবর্তে শুধু ধৃত রাশেদুল ইসলামের নাম রেখে নতুন করে মামলা পাঠানোর নির্দেশ দেন। ফলে জবানবন্দিতে নাম থাকা বাকি তিনজনকে বাদ দিয়ে আদালতে মামলা পাঠানো হয়।

প্রতিবেদনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তৎকালীন রাজেন্দ্রপুর পশ্চিম বিটের কর্মকর্তা (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা ধৃত আসামির লিখিত স্বীকারোক্তি অনুযায়ী চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলার নথি প্রস্তুত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছিলাম।

তাঁর দাবি, ধৃত আসামির জবানবন্দী মতে অন্য তিনজনের নাম থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে একই মামলায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে কেন এমন পরিবর্তন করা হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তৎকালীন রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহ মো. হোসেনের (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। মামলার নথি প্রস্তুতের সঙ্গে যুক্ত এক সহযোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ এস এম জহির উদ্দিন আকন চারজনের পরিবর্তে ধৃত আসামী ছাড়া বাকী তিনজনের নাম বাদ দিয়ে নতুন করে মামলা প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলে তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর দাবি, পরে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার তাকে কার্যালয়ে ডেকে মামলার প্রথম পাতার মূল কপি পরিবর্তন করা হয় এবং পলাতক তিনজনের নাম বাদ দিয়ে কেবল ধৃত আসামী রাশেদুল ইসলামকে আসামি রেখে পুনরায় মামলা লিখে আদালতে পাঠানো হয়।

প্রতিবেদকের হাতে থাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কর্তৃক আদালতে দাখিলকৃত মামলার নথিপত্রে দেখা যায়, আদালতে পাঠানো চূড়ান্ত কপিতে ধৃত রাশেদুল ইসলাম ছাড়া অন্য তিনজন পলাতকের নাম নেই।

মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দা ও বন-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির দাবি, জবানবন্দিতে নাম থাকা মনির হোসেন ওরফে মনির হাজী দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বনভূমি দখল ও গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত বলে পরিচিত। তার দখলে বর্তমানে কয়েক কোটি টাকার বনভূমি দখলে রয়েছে বলেও জানান তারা। তাঁদের অভিযোগ, অবিভক্ত রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জে শিক্ষনবিশ দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এস এম জহির উদ্দিন আকনের সঙ্গে ওই ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সম্পর্কের কারণেই মামলায় তার নামসহ তিনজনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

বন আইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো মামলার তদন্ত শেষে যিনি মামলা দাখিল করেন, তাঁর প্রস্তুত করা নথিতে আসামির নাম পরিবর্তনের এখতিয়ার অন্য কারও নেই। বন আইনে তদন্তে নতুন তথ্য এলে বা সংযোজন বা বিয়োজনের প্রয়োজন হলে তা আদালতের নির্দেশ বা আইনসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মামলা দাখিলকারী কর্মকর্তার সাহায্যে সম্পন্ন করতে হয়।  এ কারণে জবানবন্দিতে নাম থাকা তিনজনকে বাদ দেওয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ভাওয়ালের সংরক্ষিত বনভূমি দখল, অবৈধ গাছ কাটা এবং প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ বহু বছর ধরেই রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম তৎকালীন বিভাগীয় বন এ এস এম জহির উদ্দিন আকন।

স্থানীয় পরিবেশবাদী, বন রক্ষা আন্দোলনের কর্মী ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, বন বিভাগের এ সকল দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা বনভূমি রক্ষার পরিবর্তে দখলদার ও কাঠচোরদের সঙ্গে যোগসাজশ করায় একের পর এক বনভূমি বেহাত হয়ে আসছে।

তাঁদের দাবি, মামলার নথিতে তিনজনের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং বনভূমি দখল ও বনজ সম্পদ লুটপাটের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আর্থিক অনৈতিক সুবিধার একটি উদাহরণ। পরিবেশবাদীদের দাবি, এ ঘটনায় জড়িত এ. এস. এম. জহির উদ্দিন আকনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে তদন্ত করে প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

গাজীপুর আদালতের বন মামলার পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো মামলার বিষয়ে তথ্য দেওয়ার সুযোগ নেই। অনুমতি পেলে প্রয়োজনীয় তথ্য আপনাকে জানাব।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, বর্তমানে কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বন সংরক্ষক এ.এস.এম. জহির উদ্দিন আকনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি প্রথমে অফিসে গিয়ে দেখা করার কথা বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর কল রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে লিখিতভাবে বক্তব্য জানতে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি বার্তাটি দেখেছেন (সিন) কিন্তু কোনো জবাব দেননি।

একই বিষয়ে বক্তব্য জানতে বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসাইন চৌধুরীর সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে লিখিতভাবে বক্তব্য জানতে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

এমএসএম / এমএসএম

বন মামলার নথি বদল

ত্রাণের টিন সরবরাহে অনিয়ম!

বদলির ফাঁদে পার্বত্যের প্রাথমিক শিক্ষকরা

নতুন সম্ভাবনার নাম মাশরুম

বন কেটে বাউন্ডারি শহীদের সাম্রাজ্য

GAP-এর মাধ্যমে নিরাপদ কৃষি ও রপ্তানির নতুন দিগন্ত: বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি

৩৩.৩৫ কোটিতে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের কন্ট্রোলার

মন্ত্রীর সঙ্গে দখলের তালিকায় দেশের শীর্ষ শিল্পগ্রুপ

বনবিভাগের মালি থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক বাউন্ডারি শহিদ

বন রক্ষকই যখন দখলের গডফাদার

বাস কোম্পানির চাঁদায় চলে এসপি অফিসের চা খরচ

ডিপফেক ও এআই প্রযুক্তি চ্যালেঞ্জে এমএস-১৩ গ্যাং এর আদলে অপরাধীরা সক্রিয়

বিসিকের অসংতিপূর্ণ টেন্ডার কার্যক্রম!