দরকষাকষি করে ঘুষ নেন স্টেশন কর্মকর্তা নাজমুল
ট্রানজিট পাস নেই, ৫০ হাজার টাকা লাগবে। না হলে সকালে চালান করে দেব ড্রাইভারকে, তখন বুঝবেন। ফোনের ওপাশ থেকে এমন কথাই শোনা যায় কুমিল্লা সামাজিক বনবিভাগের সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনের কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার মো. নাজমুল হাসানের কণ্ঠে। অসহায় কাঠ ব্যবসায়ীর অনুরোধ, স্যার, কাঠসহ ২০ হাজারের মধ্যে একটু ব্যবস্থা করেন। জবাবে কর্মকর্তা বলেন, কাঠসহ হলে ২ লাখ টাকা লাগবে। এরপরই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।
এভাবে প্রতিমাসে লেনদেন হয় কোটি টাকার বেশি। ঘুষ লেনদেনের এই সংবেদনশীল অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত বন বিভাগের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযুক্ত কর্মকর্তা বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। এতে শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যেই নয়, বন বিভাগের অনেক কর্মকর্তার মধ্যেও ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ ঘুষ বাণিজ্যের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সরেজমিনে দেখা গেছে, কাঠবোঝাই ট্রাক কিংবা ফার্নিচারবাহী কোনো যানবাহন চেক স্টেশনে পৌঁছালেই কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সংকেত দিয়ে সেটি থামান। এরপর শুরু হয় কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া।
অভিযোগ রয়েছে, বৈধ ট্রানজিট পাস (টিপি) থাকা প্রতিটি কাঠবোঝাই গাড়ি থেকেও অবৈধভাবে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০টি গাড়ি থেকে এভাবে প্রায় ২ লাখ টাকার ঘুষ সংগ্রহ করা হয়। অন্যদিকে ট্রানজিট পাস বা বৈধ কাগজপত্র না থাকা কাঠ ও ফার্নিচারবাহী যানবাহনের ¶েত্রে ঘুষের পরিমাণ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। স্থানীয়দের দাবি, শুধু সোয়াগাজী চেক স্টেশন থেকেই প্রতি মাসে কোটি টাকার বেশি অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়।
বন বিভাগের একাধিক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তার দাবি, সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনের কর্মকর্তা নাজমুল হাসানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁদের ভাষ্য, এর পেছনে ঢাকা সামাজিক বন সার্কেলের বন সংরক্ষকের প্রশ্রয় রয়েছে বলে মাঠপর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, ঘুষ লেনদেনের অডিও প্রকাশ্যে আসার পরও যদি তদন্ত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা কার্যত দায়মুক্তিই পাচ্ছেন এমন ধারণা জনমনে আরও জোরালো হবে।
এদিকে পরিবেশ ও বন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার যখন বন সংরক্ষণ, বনজ সম্পদ রক্ষা এবং সারাদেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তখন বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা যদি ঘুষের বিনিময়ে অবৈধ কাঠ পরিবহন বা বনজ সম্পদ পাচারে সহায়তা করেন, তবে তা রাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁদের দাবি, সোয়াগাজী চেক স্টেশনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা এবং চেক স্টেশনগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে বনজ সম্পদ রক্ষার সরকারি উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
বন বিভাগের বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি কাঠবোঝাই যানবাহন আনলোড করে কাঠের প্রজাতি, পরিমাণ এবং বৈধতা যাচাই করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ। সংশ্লিষ্টরা জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ট্রানজিট পাস দেখে কিংবা অনেক সময় সেটিও ঠিকভাবে যাচাই না করেই নির্ধারিত অঙ্কের ঘুষ নিয়ে গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়।
কাঠ পরিবহনকারী চালকদের অভিযোগ, ট্রানজিট পাস থাকার পরও দেশের প্রায় প্রতিটি বন চেকপোস্টে ঘুষ দিতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী যাচাই-বাছাইয়ের পরিবর্তে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়। ফলে সময় ও ঝামেলা এড়াতে বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েই চেক স্টেশন ত্যাগ করতে হয়। তাদের দাবি, শুধু সোয়াগাজী চেক স্টেশনেই একটি ট্রানজিট পাসের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৪ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া হয়।
আইন অনুযায়ী, অবৈধভাবে কাঠ পরিবহনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট চালক বা ব্যক্তিকে আটক, কাঠ ও যানবাহন জব্দ এবং বন আইনে মামলা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সেই আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অবৈধ কাঠ পরিবহনকেও কার্যত বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশ ও বন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বন চেক স্টেশনগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রতিটি স্টেশনে বাধ্যতামূলক সিসিটিভি নজরদারি, ডিজিটাল লগ সংরক্ষণ, অনলাইন মনিটরিং এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তদারকির ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে চেকপোস্টে পোস্টিং বাণিজ্য বন্ধ না হলে ঘুষের এই সংস্কৃতি নির্মূল করা সম্ভব নয়।
তাদের ভাষ্য, যদি বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃক্ষ দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চলা এসব অনিয়ম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে এই দুর্নীতির দায় কি শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের, নাকি এর সুবিধাভোগী আরও প্রভাবশালী কোনো মহলও রয়েছে?
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বন বিভাগের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, ভাইরাল হওয়া ঘুষ লেনদেনের অডিও এবং ওঠা গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কি না।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, ডেপুটি রেঞ্জার মো. নাজমুল হাসানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে লিখিতভাবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে অভিযোগের বিষয়গুলো লিখিতভাবে পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।
এমএসএম / এমএসএম
দরকষাকষি করে ঘুষ নেন স্টেশন কর্মকর্তা নাজমুল
বন মামলার নথি বদল
ত্রাণের টিন সরবরাহে অনিয়ম!
বদলির ফাঁদে পার্বত্যের প্রাথমিক শিক্ষকরা
নতুন সম্ভাবনার নাম মাশরুম
বন কেটে বাউন্ডারি শহীদের সাম্রাজ্য
GAP-এর মাধ্যমে নিরাপদ কৃষি ও রপ্তানির নতুন দিগন্ত: বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি
৩৩.৩৫ কোটিতে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের কন্ট্রোলার
মন্ত্রীর সঙ্গে দখলের তালিকায় দেশের শীর্ষ শিল্পগ্রুপ
বনবিভাগের মালি থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক বাউন্ডারি শহিদ
বন রক্ষকই যখন দখলের গডফাদার
বাস কোম্পানির চাঁদায় চলে এসপি অফিসের চা খরচ