বেনজীর ইউরোপের কোন দেশে পালানোর চেস্টা করছেন
বহুল আলোচিত বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ ইউরোপের একটি দেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পুলিশ সদরদপ্তরও অফিসিয়ালভাবে কোন তথ্য পায়নি বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার দুবাইয়েল আদালত থেকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে কারামুক্ত হন বেনজীর আহমেদ। এর আগে গত ২৭ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আদালত তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। দুবাইয়ের কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া বেনজীর আহমেদের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি সে দেশের পুলিশ।
দুবাই পুলিশ জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ প্রধান সেদেশের কারাগার থেকে মুক্তির বিষয়ে তারা কোনো তথ্য প্রকাশ করেন না। আর এ-সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাইলে বেনজীর আহমেদের কোনো নিকটাত্মীয়কে সংশ্লিষ্ট পুলিশ স্টেশনে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার আইনি প্রক্রিয়া শেষে কারামুক্ত হন বেনজীর আহমেদ। এর আগে ২৭ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আদালত তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। সেখান থেকে ইউরোপের একটি দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। তার পারিবারিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যদিও আদালতের শর্ত অনুযায়ী, তার দুবাই ত্যাগের অনুমতি নেই এবং তার পাসপোর্টও কর্তৃপক্ষের কাছে জমা রাখা হয়েছে।
অপরদিকে সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজির আহমেদের মুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশ সদরদপ্তরে ইন্টারপোল শাখা ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো বা এনসিবি জানে না বলে সেখানকার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। গতকাল দুপুর পর্যন্ত এ নিয়ে পুলিশের কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতেও রাজি হননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রত্যর্পণসংক্রান্ত নথিপত্র এবং আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে দুবাইয়ের আদালতে উভয়পক্ষের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। পরে শর্তসাপেক্ষে বেনজীরকে জামিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন আদালত।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলায় দুবাইয়ে গ্রেফতার হন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। দুবাই পুলিশের সহায়তায় এবং আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। গত ১২ জুন এক চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে অবহিত করে দুবাই পুলিশ।
অপর এক সূত্র জানায়, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচারসহ একাধিক অভিযোগে তদন্ত চালাচ্ছে দুদক। সেই তদন্তের ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। গত ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের মহাপরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেন বেনজীর আহমেদ। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার এবং র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন। আর গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সেই তালিকায়ও তার নাম প্রকাশ করা হয়।
আর গত ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কয়েক মাস আগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে তদন্ত শুরু করে দুদক। অভিযোগ ওঠার পর তিনি দেশ ত্যাগ করেন। পরে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয় এবং আদালত থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়। গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতার পরোয়ানা জারির আদেশ দেন আদালত। বেনজির আহম্মেদ দুবাই থেকে ইউরোপের একটি দেশে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু সেদেশের আদালতের শর্ত অনুযায়ী, তার দুবাই ত্যাগের অনুমতি নেই এবং পাসপোর্টও কর্তৃপক্ষের কাছে জমা রয়েছে।
সুত্রটি আরো জানায, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রত্যর্পণসংক্রান্ত নথিপত্র এবং আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে দুবাইয়ের আদালতে উভয়পক্ষের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। পরে শর্তসাপেক্ষে বেনজীরকে জামিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন আদালত। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচারসহ একাধিক অভিযোগে তদন্ত চালাচ্ছে দুদক। সেই তদন্তের ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আর চাকরি জীবনে ছিলেন আলোচিত ও সমালোচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তিনি ছিলেন প্রভাবশালী। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ, জমি দখল, অর্থ পাচার, পাসপোর্ট জালিয়াতি ও ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনসহ অনেক অভিযোগ উঠেছে।
১৯৮৮ সালে পুলিশে যোগ দেওয়া বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি পদে ছিলেন। এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির অনুসন্ধানে গতি বৃদ্ধি পায়। একের পর এক দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসে। কয়েকটি মামলার পর আদালত থেকে আসে গ্রেফতারি পরোয়ানা। তাকে গ্রেফতারে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার পেরিয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তার গ্রেফতারের খবর এল। ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাই পুলিশের মাধ্যমে ১২ জুন সে দেশে তাকে গ্রেফতার করা হয়। রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার একজন আসামি বেনজীর আহমেদ। এ ঘটনার সময় ডিএমপির কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর মো.আমিনুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে মাসে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ৫৮ জন হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারসহ অনেকে এই মামলার আসামি।
র্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী মামলায়ও বেনজীর আহমেদ আসামি। এই মামলায় মোট আসামি ১৭ জন। এর মধ্যে ১২ জন সেনা কর্মকর্তা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলায় এখন সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। শুধু তাই নয়, গোপালগঞ্জের বিশাল এলাকাজুড়ে রিসোর্ট গড়ে তুলেছিলেন বেনজীর। গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে কয়েক শ বিঘা জমি কেনেন তিনি। এর সবই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৈরাগীটোল গ্রামে ৬০০ বিঘার বেশি জমির ওপর তিনি গড়ে তোলেন সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক। পরে আদালত পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা জব্দের নির্দেশ দেন। ২০২৪ সালের জুনেই সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন।
আবার ডেমরা-ইছাপুরা সড়কের পাশে ২৪ কাঠা জায়গাজুড়ে একটি বাড়ি করেন বেনজীর আহমেদ। নিজের মেয়ের মালিকানাধীন বাড়িটির নাম দেওয়া হয় সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড। এর আগে আনন্দ হাউজিং সোসাইটির নামে স্থানীয় প্রেমানন্দ সরকারের মালিকানাধীন একটি ৫৫ শতাংশের জলাশয় জোর করে ভরাট করা হয়। পরে ভরাট করা ওই জমি ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় কিনে নেন বেনজীর আহমেদ।
শুধু তাই নয়, বেনজীর আহমেদ ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন। তিনি নামের আগে ‘ডক্টর’ শব্দটি ব্যবহার করা শুরু করেন। তবে ডক্টরেট ডিগ্রি নেওয়ার প্রোগ্রামে ভর্তির যোগ্যতাই তার ছিল না। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তথ্য গোপন করে বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে পাসপোর্ট নিয়েছিলেন বেনজীর আহমেদ। এই কাজটি তিনি করেছিলেন ২০১৬ সালে, তখন তিনি র্যাবের মহাপরিচালক।
জানা গেছে, বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন তিনি করলে তখন আপত্তি জানিয়েছিল পাসপোর্ট অধিদপ্তর। র্যাব সদর দফতরে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। ওই চিঠির জবাবে র্যাব সদর দপ্তরের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) আবদুল জলিল মণ্ডল অবিলম্বে বেনজীরের পাসপোর্ট প্রতিস্থাপনের অনুরোধ করে চিঠি দেন। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বেনজীরকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়। ছবি তোলা ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হয় তার বাসায় গিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা : ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা কর্মকর্তাদের মধ্যে বেনজীর আহমেদও ছিলেন, যদিও তখন র্যাবে দায়িত্ব পালন শেষে আইজিপি পদে ছিলেন তিনি। তিনি র্যাবের প্রধান ছিলেন ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। আর সেই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ২০২২ সালের আগস্টে বেনজীর আহমেদ জাতিসংঘের পুলিশপ্রধান সম্মেলনে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যান। তবে সম্মেলনের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার বাইরে ওই সফরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোথাও তিনি যেতে পারেননি।
আর দুর্নীর প্রমাণ হচ্ছে, বেনজীর আহমেদ ও তার স্ত্রী-সন্তানদের নামে ঢাকার গুলশানে ৪টি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ৩টি বিও হিসাব (শেয়ার ব্যবসা করার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) এবং ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের সন্ধান পায় দুদক। দুদকের আবেদনে এসব সম্পদ জব্দ করার আদেশ দেন আদালত।
উল্লেখ্য, দুর্নীতির খবর প্রকাশের পর দুদকের অনুসন্ধান শুরু হলে ২০২৪ সালের ৪ মে দেশ ছেড়েছিলেন বেনজীর।
এমএসএম / এমএসএম
বেনজীর ইউরোপের কোন দেশে পালানোর চেস্টা করছেন
ভুয়া ডি-নোট বিতর্কে রুহুল আমিন বহাল, অফিস সহায়ক ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে
লোভনীয় পদায়নে বারবার আলোচনায় নাজমুল হাসান
জাতীয় গৃহায়ণে জালজালিয়াতি ও দুর্নীতি করে প্রাইজপোস্টিংয়ের অভিযোগ
দরকষাকষি করে ঘুষ নেন স্টেশন কর্মকর্তা নাজমুল
বন মামলার নথি বদল
ত্রাণের টিন সরবরাহে অনিয়ম!
বদলির ফাঁদে পার্বত্যের প্রাথমিক শিক্ষকরা
নতুন সম্ভাবনার নাম মাশরুম
বন কেটে বাউন্ডারি শহীদের সাম্রাজ্য
GAP-এর মাধ্যমে নিরাপদ কৃষি ও রপ্তানির নতুন দিগন্ত: বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি
৩৩.৩৫ কোটিতে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের কন্ট্রোলার