ঢাকা বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নেত্রীর পাশে আঠারো বছর: একজন শিমুল বিশ্বাসের আস্থা ও আনুগত্যের গল্প


নিজস্ব প্রতিবেদক photo নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৮-৯-২০২৬ রাত ৯:৩৫

 পদ-পদবি বদলায়, দায়িত্বের পরিধি বাড়ে, সময়ের সঙ্গে একজন নেতার পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন নতুন অভিধা। 

কিন্তু কিছু পরিচয় কখনো মুছে যায় না। বরং অন্য সব পরিচয়কে ছাপিয়ে মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে থাকে। অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ‘বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী’-এই পরিচয়টি যেন তেমনই এক পরিচয়।

২০০৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা প্রায় ১৮ বছর তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ এই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু পালাবদল, সংকট, আন্দোলন, মামলা, কারাবরণ ও রাজনৈতিক ঝড় বয়ে গেছে। 

আর এসব ঘটনার অনেকটাই তিনি দেখেছেন বেগম খালেদা জিয়ার অত্যন্ত কাছ থেকে।

একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার বিশেষ সহকারী হওয়া নিছক কোনো প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক দায়িত্ব নয়। 

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে একজন নেতার পাশে দীর্ঘদিন কাজ করতে হলে প্রয়োজন হয় আস্থা, বিচক্ষণতা, ধৈর্য, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্বের। শিমুল বিশ্বাসের দীর্ঘ দায়িত্ব পালনের ইতিহাসে এসব বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলনই দেখা যায়।

আঠারো বছরের এই দীর্ঘ সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে শিমুল বিশ্বাসের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক অনেকটা স্নেহময় অভিভাবক ও সন্তানের সম্পর্কের মতো হয়ে উঠেছিল। 

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অত্যন্ত কঠিন সময়গুলোতেও তাঁর পাশে ছিলেন শিমুল বিশ্বাস। রাজনৈতিক কর্মসূচি, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, নানা সংকট এবং ব্যক্তিগতভাবে কঠিন সময়, সবকিছুতেই তিনি ছিলেন কাছের মানুষদের একজন।

এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর নিজের জীবনও কম ঝড়ের মধ্য দিয়ে যায়নি। বিভিন্ন মামলায় আসামি হওয়া, গ্রেপ্তার, কারাবাস এবং রিমান্ডে নির্যাতনের মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। 

তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভাষ্য, এসব প্রতিকূলতার পেছনে তাঁর সবচেয়ে বড় ‘অপরাধ’ ছিল, তিনি বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী হিসেবে তাঁর পাশে ছিলেন এবং সেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি।

২০০৭ সাল থেকে পরবর্তী প্রায় দুই দশক বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন, আন্দোলন, মামলা, কারাবন্দিত্ব ও রাজনৈতিক সংঘাত, সব মিলিয়ে সময়টি ছিল ঘটনাবহুল। 

এই দীর্ঘ সময়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের নীরব সাক্ষী ছিলেন শিমুল বিশ্বাস। বেগম খালেদা জিয়ার পাশে থেকে তিনি দেখেছেন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার নানা অধ্যায়। দেখেছেন দলের কঠিন সময়, দেখেছেন নেতাকর্মীদের আন্দোলন-সংগ্রাম, আবার দেখেছেন একজন রাজনৈতিক নেত্রীর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের নানা সংকট।

কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে থেকেছে, তিনি ছিলেন আস্থাভাজন।

রাজনীতিতে আনুগত্যের কথা অনেকেই বলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সেই আনুগত্য ও বিশ্বাস ধরে রাখা সহজ নয়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে অনেক সম্পর্ক বদলে যায়, রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে যায়। অনেকেই সুবিধা অনুযায়ী অবস্থান পরিবর্তন করেন। কিন্তু শিমুল বিশ্বাসের ক্ষেত্রে দীর্ঘ ১৮ বছরের দায়িত্ব পালনের ইতিহাসটি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শিমুল বিশ্বাস। অর্থাৎ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব ধরে রেখেছিলেন। এই দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে আবেগঘন প্রতীক হয়ে উঠেছে একটি ছবি।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার মাজারের পাশে একা দাঁড়িয়ে দুহাত তুলে মোনাজাত করছেন শিমুল বিশ্বাস। পাশে নেই কোনো রাজনৈতিক বহর, নেই স্লোগান, নেই আনুষ্ঠানিক আয়োজন। নীরবে, একান্তে তিনি প্রার্থনা করছেন।

ছবিটি তাই শুধু একটি ছবি নয়; তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের একটি প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবেই অনেকের কাছে ধরা দিয়েছে।

চাইলেই সেখানে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে যেতে পারতেন তিনি। কিন্তু তিনি গেছেন একা। যে মানুষটি জীবনের দীর্ঘ ১৮ বছর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির পাশে ছিলেন, তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের অনুভূতিটুকু যেন মোনাজাতের মধ্যেই প্রকাশ করেছেন।

সেখানে রাজনীতির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।

বর্তমানে শিমুল বিশ্বাসের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের পরিধি বিস্তৃত। তিনি বিএনপির উপদেষ্টা, শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি এবং একজন সংসদ সদস্য। কিন্তু এসব পরিচয়ের পরও তাঁর নামের সঙ্গে সবচেয়ে শক্তভাবে যে পরিচয়টি উচ্চারিত হয়, সেটি হলো-‘বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী’।

কারণ এই পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ ১৮ বছরের ইতিহাস। জড়িয়ে আছে আস্থা ও আনুগত্যের গল্প। জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকার গল্প। জড়িয়ে আছে একজন নেত্রীর পাশে থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা।

সংসদে বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে যখন শিমুল বিশ্বাস বক্তব্য দেন, তখন তাঁর বক্তৃতা অন্যরকম আবেগ তৈরি করে। তাঁর বক্তব্যে ব্যক্তিগত স্মৃতি, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের সম্পর্ক একসঙ্গে উঠে আসে। তাঁর বক্তব্যের সময় সংসদে এক ধরনের নীরব মনোযোগ তৈরি হয়। 

বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে তাঁর বক্তব্য শুনতে সংসদ সদস্যদের আগ্রহও লক্ষণীয়। এমনকি বক্তব্যের সময় বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সর্বসম্মতভাবে স্পিকারের প্রতি অনুরোধ জানানোর ঘটনাও তাঁর বক্তব্যের গুরুত্ব ও আবেগের প্রতিফলন হিসেবে সামনে আসে।

এখানেও তাঁর ‘বিশেষ সহকারী’ পরিচয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়াকে দেখেননি; তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ একটি অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ অংশীদার ছিলেন।

শিমুল বিশ্বাসকে ঘিরে আরেকটি বিষয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, অর্থ ও সম্পদের প্রতি তাঁর নির্লোভ মনোভাব। তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের অনেকেই মনে করেন, ক্ষমতা ও সম্পদের প্রতি আকর্ষণ থেকে নিজেকে দূরে রেখে দীর্ঘদিন রাজনীতি করে যাওয়া তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

নিজ এলাকায় তাঁর উদ্যোগে ১১০টিরও বেশি মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, স্কুল, কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার কথাও উল্লেখ করা হয়। এসব উদ্যোগ তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি দিক তুলে ধরে।

একজন জনপ্রতিনিধির সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তাঁর পদ নয়; মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং আস্থাও। শিমুল বিশ্বাসের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সেই জায়গাটিই সামনে আনে।

রাজনীতিতে কিছু মুহূর্ত ইতিহাসের মতো থেকে যায়। শিমুল বিশ্বাসের মাজারে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করার ছবিটিও তেমন একটি মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।

ছবিতে কোনো বক্তৃতা নেই, রাজনৈতিক বক্তব্য নেই, নেই ক্ষমতার প্রদর্শন। আছে একজন মানুষের নীরব প্রার্থনা।

দুই হাত তুলে তিনি যেন সেই মানুষটির জন্য দোয়া করছেন, যিনি দীর্ঘ ১৮ বছর তাঁকে নিজের পাশে থাকার সুযোগ দিয়েছিলেন, বিশ্বাস করেছিলেন এবং বিশেষ সহকারীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

রাজনীতিতে পদ পাওয়া যায়, দায়িত্ব পাওয়া যায়, ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি যাওয়া যায়। কিন্তু দীর্ঘদিনের আস্থা অর্জন করা এবং সেই আস্থার মর্যাদা শেষ দিন পর্যন্ত ধরে রাখা, এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

শিমুল বিশ্বাসের আঠারো বছরের পথচলা সেই আস্থারই এক গল্প।

তাঁর আজকের পরিচয় সংসদ সদস্য, দলের উপদেষ্টা কিংবা সংগঠনের শীর্ষ দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে যতই বিস্তৃত হোক না কেন, রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন পরিচয়টি হয়তো থেকে যাবে একটাই, বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী।

আর মাজারের পাশে একা দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটির ছবিটি যেন বলে যায়, রাজনৈতিক সম্পর্কেরও কিছু অধ্যায় থাকে, যা পদ-পদবি কিংবা সময়ের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। সেগুলো লেখা থাকে আস্থা, আনুগত্য, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার অদৃশ্য অক্ষরে।

এমএসএম / এমএসএম

পাটের অতিরিক্ত সচিব রায়না চক্রের জুলুম

নেত্রীর পাশে আঠারো বছর: একজন শিমুল বিশ্বাসের আস্থা ও আনুগত্যের গল্প

দুবাই, কুয়েত, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব থেকে স্বর্ণ পাচারে কাজ করছে ৫০ মাফিয়া

চাকুরীর বয়স শেষ তবুও প্রধান প্রকৌশলী হতে মরিয়া গণপূর্তের আবুল খায়ের!

বাণিজ্যিক চাষে কাজু-কফির সম্ভাবনা

মাসে দেড়শ' কোটি টাকা যাচ্ছে অমুক্তিযোদ্ধার পেটে

সরকারি চাকরিজীবীদের স্বস্তি, জনজীবনে দুঃখের বোঝা

রেলওয়ের মেগা প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

দুধ-মাংস-ডিমে বদলাবে চরবাসীর জীবন

মেট্রোরেলে টেন্ডার ছাড়াই নতুন চুক্তি

মসলায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বাংলাদেশ

প্রিন্সিপাল সাইফুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ

নুরুন্নবী দুর্নীতির মহাকবি