কৃষি ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে ২০ হাজার উদ্যোক্তা
কৃষি খাতে যুবক ও নারীদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ২০ হাজার সম্ভাব্য উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর (ডিএএম)। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন Program on Agricultural and Rural Transformation for Nutrition, Entrepre-neurship and Resilience in Bangladesh (PARTNER) কর্মসূচির আওতায় এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে এপিসিইউ-ডিএএম।
কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত সম্ভাব্য উদ্যোক্তাদের বাস্তব কর্মপরিবেশে ১২ দিনের অন-দ্য-জব ট্রেনিং (OJT) দেওয়া হচ্ছে। সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, উত্তম কৃষি চর্চা, হিসাবরক্ষণ ও বুককিপিং, ব্যবসায় পরিকল্পনা, বিক্রয় ও বিপণন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, আইনগত বাধ্যবাধকতা ও ডকুমেন্টেশন এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ মোট আটটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণার্থীরা সফল কৃষিপণ্য ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে হাতে-কলমে ব্যবসায়িক
অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। কর্মসূচির আওতায় ২০ হাজার সম্ভাব্য উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যের মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী এবং ৪০ শতাংশ পুরুষ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বীজ, নার্সারি, মাশরুম, ভার্মিকম্পোস্ট, পাটজাত ও দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন উপখাতে উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের জন্য ভ্যালুচেইনভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি 'সকালের সময়'কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান PARTNER-এর এপিসিইউ-ডিএএম অংশের এজেন্সি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর (উপসচিব) ড. মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আল-ফারুক। তিনি বলেন, PARTNER কর্মসূচির আওতায় ডিএএমের দুটি প্রধান দায়িত্ব রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো DLI-7, যার মাধ্যমে ২০ হাজার উদ্যোক্তা উন্নয়ন করা হবে। কৃষি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বীজ এবং কৃষিভিত্তিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণির উদ্যোক্তাকে এর আওতায় আনা হচ্ছে। তিনি জানান, মাশরুম, নার্সারি, ভার্মিকম্পোস্ট, পাটজাত পণ্য, দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক খাতে উদ্যোক্তা তৈরির কাজ চলছে। আমাদের লক্ষ্য ২০ হাজার উদ্যোক্তা তৈরি করা। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী ও ৪০ শতাংশ পুরুষ। বর্তমানে প্রকল্পের চতুর্থ বছর চলছে। এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৭৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরে প্রায় ৭ হাজার উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ড. আবদুল্লাহ আল-ফারুক বলেন, সারা দেশের ৬৪ জেলা ও ২০৮টি উপজেলায় এ কার্যক্রম চলছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শুধু উদ্যোক্তা তৈরি নয়, তাদের ব্যবসায়িক দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা জ্ঞান এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরির
ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাঁচ কৃষিপণ্যে ভ্যালুচেইনভিত্তিক সংগঠন: PARTNER-এর ডিএএম অংশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হলো Value Chain Pormational Body গঠন। এ প্রসঙ্গে ড. আবদুল্লাহ আল-ফারুক বলেন, ভ্যালুচেইন প্রমোশনাল বডি একটি নতুন ধারণা। একটি পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের অংশীজনকে একটি প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসাই এর উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, একটি কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে কৃ ষক, ইনপুট সরবরাহকারী, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ব্যবসায়ী, হিমাগার, গবেষক, পরিবহন ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক, বিপণনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ব্যাংক ও এনজিও, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক, ভোক্তা এবং উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণির অংশীজন রয়েছে। এই অংশীজনদের সমন্বিতভাবে যুক্ত করে সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন ও রপ্তানির সমস্যা চিহ্নিত এবং সমাধানে কাজ করা হবে। তিনি জানান, গত বছর দুটি ভ্যালুচেইন
প্রমোশনাল বডি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আম ও আলু। পর্যায়ক্রমে কাঁঠাল, টমেটো ও সুগন্ধি চালের জন্যও এ ধরনের সংগঠন কার্যকর করা হবে।
৭৬৭টি মার্কেট অ্যাক্টরস বিজনেস স্কুল: কৃষিপণ্যের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণির অংশীজনকে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত করতে Market Actors Business School (MABS) গঠন করা হচ্ছে। ডিএএমের আওতায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকায় এ ধরনের ৭৬৭টি স্কুল গঠনের কাজ হয়েছে বলে জানান তিনি । ড. আবদুল্লাহ আল-ফারুক বলেন, যে এলাকায় যে পণ্যের উৎপাদন বেশি, সেখানে সেই পণ্যকে কেন্দ্র করে মার্কেট অ্যাক্টরস বিজনেস স্কুল গড়ে তোলা হচ্ছে। আলুর ক্ষেত্রে ২২৭টি স্কুল করা হয়েছে। এ বছর আরও ৩৩৫টি স্কুল করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, এসব স্কুলের মাধ্যমে কৃষক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, হিমাগার মালিক, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও অন্যান্য বাজার-অংশীজনকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে। এর ফলে নির্দিষ্ট কৃষিপণ্যের পুরো বাজারব্যবস্থার সমস্যা ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করা সহজ হবে।
তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে সংগঠন এ কার্যক্রমের কাঠামো সম্পর্কে PARTNER-এপিসিইউ-ডিএএমের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার নিখিল চন্দ্র দে বলেন, "মার্কেট অ্যাক্টরস বিজনেস স্কুল মূলত তৃণমূল পর্যায়ের একটি সংগঠন। এখান থেকে পর্যায়ক্রমে উপজেলা ও জাতীয় পর্যায়ে ভ্যালুচেইন প্রমোশনাল বডি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, একটি উপজেলায় যদি ২০টি মার্কেট অ্যাক্টরস বিজনেস স্কুল থাকে, তাহলে প্রতিটি স্কুল থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রতিনিধিকে নিয়ে উপজেলা পর্যায়ে একটি সংগঠন করা হবে। এরপর উপজেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জাতীয় পর্যায়ে ভ্যালুচেইন প্রমোশনাল বডি গঠন করা হবে। নিখিল চন্দ্র দে জানান, আলুর ক্ষেত্রে ২২৭টি মার্কেট অ্যাক্টরস বিজনেস স্কুল করা হয়েছে এবং প্রতিটি স্কুলে ২৫ জন করে সদস্য রাখা হয়েছে। এসব সদস্যের মধ্য থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ভোটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আলু ভ্যালুচেইন প্রমোশনাল বডির সভাপতি রংপুর থেকে এবং সাধারণ সম্পাদক মুন্সিগঞ্জ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তার ভাষ্য, তৃণমূল পর্যায়ে কৃষিপণ্যের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি কার্যকর বাজার কাঠামো তৈরি করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
সুগন্ধি চালে কৃষক ও ভোক্তার দামের বড় ব্যবধান: সুগন্ধি চালের ভ্যালুচেইন নিয়ে কাজ করা PARTNER-এপিসিইউ-ডিএএমের কনসালট্যান্ট ফাইজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে সুগন্ধি চালের চাহিদা উৎপাদনের তুলনায় বেশি। ফলে দেশে চাহিদা পূরণে বিভিন্ন দেশ থেকে সুগন্ধি চাল আমদানি করতে হয়। তিনি বলেন, দেশে সুগন্ধি চালের বাজারে বড় বড় প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা বেশি হওয়ায় এ খাতে আরও উৎপাদন ও মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে।
কৃষক পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়টি তুলে ধরে ফাইজুল ইসলাম বলেন, বাজারে কোনো কোনো সুগন্ধি চাল খুচরা পর্যায়ে প্রায় ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও কৃষক একই ধরনের ধান বা চালের জন্য অনেক কম দাম পান। ফলে উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে মূল্য ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, ভ্যালুচেইন প্রমোশনাল বডির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো কৃষককে ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা। উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ, প্যাকেজিং ও মূল্য সংযোজনের প্রতিটি ধাপে কোথায় সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ফাইজুল ইসলাম আরও বলেন, সুগন্ধি চাল উৎপাদকদের প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং ও মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে বাজারে আরও কার্যকরভাবে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা হবে। এতে কৃষক যেমন ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন, তেমনি ভোক্তার কাছেও মানসম্মত পণ্য পৌঁছানো সহজ হবে।
প্রশিক্ষণ থেকে উদ্যোক্তা, উদ্যোক্তা থেকে কর্মসংস্থান: পার্টনার ডিএএম এর প্রশিক্ষণ শেষে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের জন্য ইনকিউবেশন, ফলোআপ, আইনগত সহায়তা ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন সহযোগিতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অগ্রগামী উদ্যোক্তাদের পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্রয়োজনভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে ৭০:৩০ অনুপাতে ম্যাচিং গ্রান্ট দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্র্যান্ডিং এবং বিপণনে সহযোগিতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রশিক্ষণ, ব্যবসায়িক পরামর্শ, বাজারসংযোগ, প্রযুক্তি ও অর্থায়ন সহ-ায়তার সমন্বয় করা গেলে কৃষিভিত্তিক নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। PARTNER-এর ডিএএম অংশের লক্ষ্য শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে উদ্যোক্তা তৈরি করা নয়; বরং উৎপাদনকারী, ব্যবসায়ী, প্রক্রিয়াজাতকারী, পরিবহনকারী, গবেষক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাকে একই ভ্যালুচেইনের মধ্যে এনে কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থাকে আরও সংগঠিত করা। এর মাধ্যমে কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন, বাজার সম্প্রসারণ এবং কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার পথ তৈরি হবে বলে আশা করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
এমএসএম / এমএসএম
কৃষি ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে ২০ হাজার উদ্যোক্তা
বিআরটিএর দুর্নীতিবাজ সুব্রত দেবনাথের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ দায়ের
নোমান গ্রুপের সুনাম নষ্ট ও ক্ষতি করতে সংঘবদ্ধ চক্র মাঠে
বন্ধ হচ্ছে না রেললাইন নির্মাণ
রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ
পাটের অতিরিক্ত সচিব রায়না চক্রের জুলুম
নেত্রীর পাশে আঠারো বছর: একজন শিমুল বিশ্বাসের আস্থা ও আনুগত্যের গল্প
দুবাই, কুয়েত, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব থেকে স্বর্ণ পাচারে কাজ করছে ৫০ মাফিয়া
চাকুরীর বয়স শেষ তবুও প্রধান প্রকৌশলী হতে মরিয়া গণপূর্তের আবুল খায়ের!
বাণিজ্যিক চাষে কাজু-কফির সম্ভাবনা
মাসে দেড়শ' কোটি টাকা যাচ্ছে অমুক্তিযোদ্ধার পেটে
সরকারি চাকরিজীবীদের স্বস্তি, জনজীবনে দুঃখের বোঝা