ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

ঐতিহাসিক স্থানসমূহকে চিহ্নিত অবকাঠামো নির্মাণের নামে লুটপাটের অভিযোগ

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘কফি শপ’ নামে মাদক সেবীদের আশ্রম করেছে গণপূর্ত


আব্দুল লতিফ রানা photo আব্দুল লতিফ রানা
প্রকাশিত: ২৮-১০-২০২৬ দুপুর ৪:৩৫

ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মাণাধীন ‘কফি শপ বা ফুড কোর্ট’ এখন মাদকের হাট বসানো হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ের দুর্নীতিবাজ প্রধান প্রকৌশলী শামিম আখতারের নেতৃত্বে নকশা ও কাঠামোগত কাজ শুরু করা হয়।
গণপূর্তের নির্মাণাধীন কথিত ‘কফি শপ’-এ মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল নিয়ে গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে তার স্টাফ অফিসারের সঙ্গে সেল ফোনে কথা বলা হলে, তিনি সকালের সময় এর প্রতিবেদককে জানান, আপনার সঙ্গে পরে যোগাযোগ করবেন। এর আগে গণপূর্তের আব্দুল গণি রোডের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি উক্ত বিষয়টি একমাত্র প্রধান প্রকৌশলীই বলতে পারবেন এবং আর কেউ উক্ত বিষয়ে কথা বলবেন না বলে তিনি জানান।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঐতিহাসিক এই উদ্যানের গণপূর্তের নির্মাণাধীন ‘কফি শপ’ ঘিরে এখন মাদকসেবী, মাদক বিক্রেতা ও অপরাধচক্রের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। হেরোইন, গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ নানা মাদকদ্রব্যের অবাধ বেচাকেনা চলে হরদম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশের এই উদ্যানে অপরাধ তৎপরতায় আতঙ্কিত সাধারণ দর্শনার্থী ও শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যার পর উদ্যানজুড়ে দেখা যায় ভয়ংকর রূপ। মাদক ব্যবসার পাশাপাশি ছিনতাই, ব্ল্যাকমেইল, অসামাজিক কার্যকলাপসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। গত বছর এই উদ্যানে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন ঢাবি শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য।
প্রতিদিন উদ্যানে সন্ধ্যার পর থেকে মুক্তমঞ্চ, কালীমন্দির, ছবির হাট, লেকপাড়, টিএসসি-সংলগ্ন গেট, মন্দিরের পাশের গেট, ভিআইপি গেট এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের পেছনের এলাকাগুলোতে প্রকাশ্যে মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়। পারুলী, রেখা, ফিরোজ, নাসু, ওলি, বাবু, হৃদয়সহ অন্তত ১০ জনের নেতৃত্বে মাদক ব্যবসায় সক্রিয় রয়েছে ৬০ থেকে ৭০ জন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় উদ্যানের মাদক সিন্ডিকেট এবং অবৈধ দোকানপাট নিয়ন্ত্রণ করত ছাত্রলীগ। ৫ আগস্টের পর নতুন চাঁদাবাজরা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে উদ্যান। তাদের চাঁদা দিয়েই মাদক ব্যবসা চালানো হচ্ছে।  মঞ্জুর হোসেন নামে এক রিকশাচালক জানান, পার্কে গাঁজা কিনতে ছাত্র, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, রিকশাওয়ালা, পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার মাদক সেবী লোকজনও আসে। রাতে মুক্তমঞ্চ এলাকায় প্রকাশ্যে গাঁজার আসর বসে। এক পুরিয়া ১০০ টাকা দাম।
জানা গেছে, রেসকোর্স ময়দান বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক স্থানসমূহকে চিহ্নিত এবং সংরক্ষণের নির্দেশনা চেয়ে ২০০৯ সালের ২৫ জুন হাইকোর্টে এক রিট দায়ের করা হয়। পরে আদালত এক নির্দেশনা দেন। কিন্তু সেই নির্দেশকে আমান্য করে নির্মাণের প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট চালানো হচ্ছে বলে সচেতন মহল বলে আসছেন। আর নির্মাণাধীন ৭টি কথিত ‘কফি শপ’ এর জায়গায় ৭টি টয়লেট করা হয়েছে। সেখানে এখন মাদকসেবীরা নিরাপদ আখড়া গড়ে তুলেছে। তারা দিন রাত ২৪ ঘন্ট পরিবার-পরিজন নিয়ে অবস্থান করছে। প্রকাশ্যে মাদক বিক্রেতা ও অপরাধচক্রের অভয়ারণ্যে পরিণত করে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ নানা মাদকদ্রব্যের অবাধ বেচাকেনা চলছে। পার্কের নিরাপত্তায় আনসার ক্যাম্প থাকলেও তারা অনৈতিক সুবিধা পেয়ে মাদক ব্যবসায়ীসহ অপরাধীদের নিরাপত্তা দিচ্ছে বলেও অভিযোগে জানা গেছে। 
উদ্যানে হাটতে আসা সুফিয়া বেগম বলেন, এত সুন্দর একটা জায়গা অপরাধীদের অভয়ারণ্য হোক, আমরা কখনোই তা চাই না। এই উদ্যানকে অপরাধমুক্ত করা হোক। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান শুধু একটি পার্ক নয়, এটি আমাদের ঐতিহাসিক স্মৃতির স্থান। এখানে মাদক, অপরাধ ও ভাসমান পতিতাদের অসামাজিক কার্যকলাপ চলতে থাকলে তা হবে জাতির জন্য লজ্জার। উদ্যানজুড়ে এখন বেশ কিছু সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে। পর্যাপ্ত আলো, নিয়মিত টহল, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করলে পরিবেশটা আরো ভালো হবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে ঘিরে নিরাপত্তাহীনতা ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ করে সচেতন একজন নাগরিক বলেছেন, সময়ের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে উঠেছে চাঁদাবাজি, মাদকসেবনসহ বিভিন্ন অপকর্মের আখড়া। উদ্যানের চারপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক ইউনিট ও অফিস থাকলেও তারা এসব অনিয়ম দমন না করে উলটো এসবের ‘ভাগীদার’ হয়ে উঠেছে। এর ফলে যুবসমাজের একটা অংশ বিপথে যাচ্ছে, প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
রফিকুল ইসলাম নামে সাবেক একজন যুগ্ম সচিব বলেন, এত সুন্দর একটা জায়গা অপরাধীদের অভয়ারণ্য হোক, আমরা কখনো চাই না। এই উদ্যানকে অপরাধমুক্ত করা হোক। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান শুধু একটি পার্ক নয়, এটি আমাদের ঐতিহাসিক স্মৃতির স্থান। এখানে মাদক, অপরাধ ও অসামাজিক কার্যকলাপ চলতে থাকলে তা হবে জাতির জন্য লজ্জার। 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রাতহ্রাসে আসা এক ব্যক্তি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী ছুরিকাঘাতে নিহত হওয়ার পর উদ্যানে অনেকগুলো সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে। আর পর্যাপ্ত আলো, নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু কয়েকদিন পরেই আবার সেই আগের অবস্থায় পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হলেও পুলিশ না দেখার ভান করে। মন্দিরের পাশ, গ্লাস টাওয়ার ও চারুকলার গেট এলাকায় সন্ধ্যার পর তরুণ-তরুণী ও হিজড়াচক্রের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। চলে অসামাজিক কার্যকলাপ। এরা মানুষকে ভয় দেখিয়ে মোবাইল ফোন-টাকাও ছিনিয়ে নেয়। অনেক জুটি ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলেও লজ্জা বা ভয়ে প্রকাশ করে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, উদ্যানের অপরাধচক্রে জড়িত রয়েছে কতিপয় শিক্ষার্থীও। বান্ধবীদের ফাঁদ হিসাবে ব্যবহার করে দর্শনার্থীদের ব্ল্যাকমেইল করেন তারা।
জানা গেছে, গত ২০১০ সালের ৭ জুলাই রায় প্রকাশ করা হয়, যাতে রায়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক সাতটি স্থানকে চিহ্নিত করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। স্থানগুলো হলো: ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের প্রথম গর্ভনর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাষণের স্থান, ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের স্থান, ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ দল থেকে জাতীয় ও প্রাদেশিক সংসদে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের স্থান, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণের স্থান, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষরের স্থান, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রদানের স্থান এবং ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ প্রদানের স্থান। আর হাইকোর্ট সেই রায়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে অংশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল, সেটিকে ‘স্বাধীনতা চত্বর বা লিবার্টি স্কয়ার’ নামকরণ করার জন্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিল।
কিন্তু সেখানে আদালতের সেই নির্র্দেশ না মেনে সেখানে বাণিজ্যিক করণের চেষ্টায় ৭টি ‘কফি শপ’ নির্মাণের চেস্টা করা হয়। আর সেই কফি শপ নির্মানের জন্য নির্মিত স্থাপনা তৈরী করতে সরকারের প্রায় কোটি টাকা ব্যায় করা হয়। কিন্তু পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনাবিধগণ আদালতের স্বরণাপুর্ন হলে তা গণপূর্ত বিভাগ তা বন্ধ করতে বাধ্য হন। এখন তা পরিত্যাক্ত স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। সেখানে রাত দিন প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসায়ী, মাদক সেবী ছাড়াও অসামাজিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হচ্ছে এক শ্রেণীর নারী পুরুষ। কিন্তু মাদক সেবীদের নিরাপদ আস্তানা ভেঙে ফেলা হবে না, সেখানে পুনরায় কফি শপ করা হবে তা কেউ বলতে পারছেন না। 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি জানান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের তৃতীয় পর্যায়ের কাজ শুরুর পর থেকে দুর্বৃত্তায়ন শুরু হয়েছে। উদ্যানের ঐতিহাসিক স্থানগুলো সংরক্ষণ করে তা মানুষের সামনে উপস্থাপনের বদলে প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে অপ্রয়োজনীয় ফুড কোর্টসহ নানান স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। শুরুতে আঁকাবাকা ওয়াকওয়ে করার নামে গাছ কাটা হয়েছে। 
এ ব্যাপারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অবকাঠামো নির্মানে নিরীক্ষা কমিটির সদস্য নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলে এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। ওটা গণপূর্ত বিভাগ বলতে পারবে। তারা সেগুলো ভেঙে ফেলবে না কি করবে। তবে এ আগে তিনি গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ‘আমাদের ডিজাইনে কোনো খাবার দোকান বা টয়লেট ছিল না। আদালত সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিল যে, সাতটি জায়গা চিহ্নিত করে সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হোক এবং অন্যান্য সব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হোক। আমরা সেভাবেই নকশা করেছিলাম। সেখানে খাবার দোকান টয়লেট রাখার প্রশ্নই আসে না।’

এমএসএম / এমএসএম

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘কফি শপ’ নামে মাদক সেবীদের আশ্রম করেছে গণপূর্ত

সাবেক শ্রমিক লীগ নেতাদের পদায়ন ও পদ বাণিজ্যের অভিযোগ

অনাবাদি জমিতে রোজেলা চাষে নতুন সম্ভাবনা

‎বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষে ফ্যাসিবাদের দোসর উপপরিচালক শাহরিয়ার আল হাসান এর অসীম দৌরাত্ম!

ধানমন্ডির অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পুরাতন ঢাকা ক্যাম্পাস শিশু শিক্ষার্থীকে শারীরিক নির্যাতন করার অভিযোগ

দূর্যোগে ঘুরে দাঁড়াবে কৃষি

মাশরুম চাষে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন

কৃষি ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে ২০ হাজার উদ্যোক্তা

বিআরটিএর দুর্নীতিবাজ সুব্রত দেবনাথের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ দায়ের

নোমান গ্রুপের সুনাম নষ্ট ও ক্ষতি করতে সংঘবদ্ধ চক্র মাঠে

বন্ধ হচ্ছে না রেললাইন নির্মাণ

রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

পাটের অতিরিক্ত সচিব রায়না চক্রের জুলুম