সরকারি চাকরিজীবীদের স্বস্তি, জনজীবনে দুঃখের বোঝা
জ্বালানি সংকটে উৎপাদন খাতের চাপ, রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা এবং নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যে যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে, তখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ এতে আর্থিক স্বস্তি পেলেও বিশাল এই অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে পে-স্কেলের অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিতে হতে পারে। এতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি ও বিনিয়োগে চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি উন্নয়ন বাজেট বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) কাটছাঁটের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
একই সঙ্গে সরকারি কর্মীদের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার প্রভাব বাজারের চাহিদার ওপর পড়তে পারে। সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না থাকলে মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একদিকে পে-স্কেল, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের আগুন
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগের মধ্যেই দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় অংশকে প্রতিদিনের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ-মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যয়—সব মিলিয়ে মাসিক আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে জীবনধারণের মৌলিক খরচে।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের ব্যয়ও সরাসরি প্রভাব ফেলছে পরিবহন ও উৎপাদন খাতে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে, আর সেই বাড়তি ব্যয়ের শেষ বোঝা বহন করতে হয় ভোক্তাকেই।
ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে রাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নেবে—এ প্রশ্নটিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাড়বে সরকারের রাজস্ব ব্যয়
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে শুধু মূল বেতন নয়, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুবিধার ব্যয়ও বাড়বে। এতে সরকারের রাজস্ব বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের চাপ বাড়তে পারে।
রাজস্ব আয় একই গতিতে না বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও অন্যান্য উন্নয়ন খাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, উচ্চ গ্রেডে যে হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে, তা সরকারের ওপর চাপ তৈরি করবে। তবে নিচের গ্রেডের কর্মীদের জন্য বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজন ছিল।
তার মতে, এক বছরের মধ্যে পে-স্কেলের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রয়োজনে সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হতে পারে। এতে এডিপি কাটছাঁটের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যাংকঋণ বাড়লে বেসরকারি খাতে চাপ
সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় যদি রাজস্ব আয় দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে ঘাটতি অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।
সরকার ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের অর্থপ্রাপ্তিতে চাপ তৈরি হতে পারে। এতে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অর্থাৎ সরকারি বেতন বৃদ্ধির সুফল সরকারি কর্মীরা পেলেও এর অর্থনৈতিক চাপের একটি অংশ পরোক্ষভাবে বেসরকারি খাত ও সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নিয়েও সতর্কতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক সায়মা হক বিদিশার মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে বাংলাদেশে উৎপাদন খরচজনিত মূল্যস্ফীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, পে-স্কেলের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে রাজস্ব আহরণ কম হওয়া, বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট এবং অর্থায়নের জন্য ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করতে পারে, যা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তার মতে, পে-স্কেলের কারণে বেসরকারি খাতের ওপরও চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান, উৎপাদন ও সেবা খাতে কর্মীদের বেতন-ভাতা সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
সরকারি ব্যয় কমানোর পরামর্শ
পে-স্কেলের অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে শুধু রাজস্ব বাড়ানোর দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না—সরকারি ব্যয় কমানোর সুযোগও খুঁজতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, অতিরিক্ত জনবল ও প্রতিষ্ঠান কমিয়ে প্রশাসনকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা প্রয়োজন।
খালি পদ কমানোর পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় পদ ও বিভাগ অবলোপন এবং সরকারি কার্যক্রমে ডিজিটালাইজেশন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ওপর সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলায় উৎপাদন ব্যয় কমানো, ব্যবসা সহজ করা এবং প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সায়মা হক বিদিশা।
‘বেতন বাড়লে বাজারেও বাড়তে পারে চাপ’
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সরকারি কর্মীদের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়তে পারে। কিন্তু উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত সক্ষমতা তৈরি না হলে অতিরিক্ত চাহিদা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া বেতন বৃদ্ধির অজুহাতে কেউ যেন পণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকেও সরকারের নজরদারি প্রয়োজন।
শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং বেসরকারি খাতকে কর্মীদের বেতন সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব বলেও মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
নিম্ন গ্রেডে স্বস্তি, উচ্চ ব্যয়ে প্রশ্ন
নতুন পে-স্কেলের একটি ইতিবাচক দিক হলো—নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে তাদের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবি করে আসা এই শ্রেণির কর্মীদের জন্য এটি প্রয়োজনীয় বলেও মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
কিন্তু একই সঙ্গে উচ্চ গ্রেডে বড় মাত্রার বেতন বৃদ্ধির ফলে সরকারের ওপর যে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হবে, তার অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে—এ প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে তাই পে-স্কেলের পাশাপাশি রাজস্ব সংস্কার, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সাধারণ মানুষের স্বস্তি কোথায়?
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে যখন স্বস্তির খবর সামনে এসেছে, তখন দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে স্বস্তির চিত্রটি ভিন্ন।
একজন বেসরকারি চাকরিজীবী, একজন দিনমজুর, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে মাসের শেষের হিসাব এখনো বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।
তাদের আয় বাড়ছে ধীরগতিতে; কিন্তু খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
তাই প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্রের ব্যয়ের অগ্রাধিকার কী হবে?
শুধু সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ানো নয়, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোও রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
এমএসএম / এমএসএম
সরকারি চাকরিজীবীদের স্বস্তি, জনজীবনে দুঃখের বোঝা
রেলওয়ের মেগা প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
দুধ-মাংস-ডিমে বদলাবে চরবাসীর জীবন
মেট্রোরেলে টেন্ডার ছাড়াই নতুন চুক্তি
মসলায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বাংলাদেশ
প্রিন্সিপাল সাইফুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ
নুরুন্নবী দুর্নীতির মহাকবি
গণপূর্ত সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট-প্লট জালিয়াতি ও তথ্য পাচারের অভিযোগ
শান্তিনগরে অনুমোদনহীন ১১ তলা ভবন
রোবটিক্স-অটোমেশনে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতি
বন মামলার নথি বদল: সংবাদ প্রকাশের পর তদন্তের নির্দেশ
বঙ্গোপসাগর ঘিরে ভুরাজনীতিঃ বাংলাদেশ কী করবে?