ঢাকা মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দুবাই, কুয়েত, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব থেকে স্বর্ণ পাচারে কাজ করছে ৫০ মাফিয়া


আব্দুল লতিফ রানা photo আব্দুল লতিফ রানা
প্রকাশিত: ৭-৯-২০২৬ রাত ১১:৫

হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর যেন স্বর্ণের খনি। মাফিয়া চক্রের অবৈধভাবে পাঠানো কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ বিমানবন্দর থেকেই উদ্ধার করছে কর্মকর্তারা। তাতে মনে হচ্ছে বিমানবন্দরটাই যেন একটি স্বর্ণ খনি। তবে এই খনি কিন্তু মাটির নিচের খনি নয়! বাংলাদেশ বিমানসহ বিভিন্ন এয়ারলাইন্স থেকে এই স্বর্ণগুলো উন্মোচন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক চক্রের প্রায় ৫০ জন মাফিয়া দুবাই, কুয়েত, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, সৌদিআরব এবং সিঙ্গাপুরে বসে স্বর্ণ পাচারে কাজ করছেন। তারা স্বর্ণগুলো নিত্য নুতন পদ্ধতিতে লুকিয়ে বিমানবন্দরে পাঠাচ্ছে।
সূত্র জানায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, সিভিল এভিয়েশন, কাস্টমসসহ বিমানবন্দরে কর্মরত এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও ভিন্ন পরিচয়দানকারীও এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন। এসব ঘটনায় মাঝে মধ্যে চুনোপুঁটিরা ধরা পড়লেও পর্দার আড়ালে থাকা রাঘব বোয়ালারা রহস্যজনক কারণে ধরা ছোয়ার বাইরেই থাকছে। 
হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা স্বর্ণের চালানগুলো ভারতের বাজারে পাচারের উদ্দেশ্যে আনা হয়। নিরাপদ ট্রানজিট রুট হিসেবেই এখানে আনা হয়। বিমানবন্দর থেকে বের করার পর স্বর্ণের চালানগুলো সড়কপথে দেশের যশোর, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গা এবং ঝিনাইদহ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। এছাড়া মিয়ানমার থেকেও কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম হয়ে স্বর্ণের চালান ঢাকায় পৌঁছানো হয়। এরপর সেগুলো ভারতে পাচার হয়ে থাকে। আর এসব স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনায় গত ১৪ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৩৪৫টির বেশি মামলা দায়ের হয়েছে। অধিকাংশ মামলাই ১৯৪৭ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা হয়েছে। মানি লন্ডারিং আইনের বেশীরভাগ মামলা হওয়ায় গডফাদারদের টাকার উৎস এবং নায়করা নেপথ্যেই থেকে যাচ্ছে। 
দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকাগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-১৪৮ ফ্লাইট থেকে গত শনিবার বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। ফ্লাইটে দায়িত্ব পালনরত এক মেকানিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছ থেকে এসব স্বর্ণ জব্দ করা হয়। 
সূত্র জানায়, ফ্লাইটটি দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকার উদ্দেশে আসছিল। ফ্লাইটে তল্লাশি চালানোর সময় দায়িত্বে থাকা ওই মেকানিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছ থেকে স্বর্ণগুলো জব্দ করা হয়। এরপর বিমানবন্দরের বিভিন্ন সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে স্বর্ণগুলো ওজন ও গণনা করা হয়। এ ঘটনার পর আটক ব্যক্তি ও স্বর্ণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় স্বর্ণগুলো কোথা থেকে আনা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। 
একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বাংলাদেশে স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের নেপথ্যে দেশী ও বিদেশী একাধিক প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে, যাদের মধ্যে প্রধান প্রায় ৫০ জন আন্তর্জাতিক মাফিয়া বা গডফাদার মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে দুবাই, মালয়েশিয়া এবং সৌদি আরবে বসে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন। চোরাচালানের প্রধান গডফাদারদাররা অত্যন্ত প্রভাবশালী।
গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি) এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্তে এবং পূর্বের মামলাগুলোর চার্জশিট মতে বেশ কিছু শীর্ষ চোরাকারবারির নাম প্রকাশ পেয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১৫ জন গডফাদার দুবাই ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে স্বর্নপাচার নিয়ন্ত্রণ করছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- মো. নজরুল ইসলাম ওরফে লিটন, মো. আলী, রিয়াজ চেয়ারম্যান, জসিম উদ্দিন, আজাদ আহমেদ, মাসুদ কবির, মো. রায়হান আলী এবং সালেহ আহমেদ। এদের অনেকেই আগে দেশে গ্রেফতার হলেও জামিন নিয়ে বিদেশে পালিয়ে থেকে নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন। 
জানা যায়, দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক বেসরকারি এয়ারলাইন্সের কতিপয় ব্যক্তিরা স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত। স্বর্ণ চোরাচালান সংক্রান্ত মামলা তদন্ত করতে গিয়ে এসব তথ্য পেয়ে থমকে যান তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, সিভিল এভিয়েশন এবং কাস্টমসের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশেই বিমানগুলোতে চলছে স্বর্ণ চোরাচালান। প্রতি বছর টনকে টন স্বর্ণ দেশে প্রবেশ করছে। আমার তা দেশ থেকে পাচার করা হচ্ছে। তবে ছোট ছোট স্বর্ণের চালান একের পর এক ধরাও পড়ছে। গত ২০২১ সাল থেকে ২০২৩ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ৫৭ মণ স্বর্ণবার ও স্বর্ণালংকার জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দারা। আর জব্দকৃত স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রয়েছে। এর বাইরে আরও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ চোরাই পথে দেশে এসেছে এবং প্রতিবেশী দেশে পাচার হয়েছে। ওই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ আনতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তার যোগানদাতারা হলেন, দেশের শীর্ষ পর্যায়ের শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর ও পুলিশের সংশ্লিষ্ট সুত্রগুলো জানায়, স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২১ সাল থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দুই শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর এক বড় বড় চালানের সূত্র ধরে আবু ওরফে গোল্ড আবু নাম প্রকাশ হয়। তিনি মুড়ি বিক্রেতা থেকে কয়েকশত কোটি টাকার মালিক বনে যান। 
এরপর সিআইডির তালিকায় নাম রয়েছে মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনির। কাপড়ের দোকানের কর্মচারী থেকে অবৈধ স্বর্ণ চোরাচালানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হন তিনি। পরে তিনি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। ঢাকার বাড্ডায় তার বিশাল সাম্রাজ্য ও রাজউকের বহু প্লট জালিয়াতির তথ্য উন্মোচন করে তাকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এদিকে আর এইচ এম শামসুল হুদাকে সিঙ্গাপুর, দুবাই ও মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে মণকে মণ সোনা পাচারের প্রধান হোতা হিসেবে সিআইডি চিহ্নিত করে। তার অধীনে ৫৬ জনের একটি বিশাল সিন্ডিকেট। 
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতের কলকাতার বটতলার স্বর্ন ব্যবসায়ী হেমন্তকুলি, নেপালি নাগরিক গৌরাঙ্গ এর সঙ্গে চোরাকারবারির সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে, যারা রুট তৈরিতে কাজ করেন। যশোর ও সাতক্ষীরা সীমান্তে বিজিবি’র অভিযানে বেশ কিছু চালান ধরা পড়ায় তাদের চক্রের মধ্যে সম্পর্কের অবনতিও ঘটে। স্বর্ণ চোরাচালান পদ্ধতিটি স্তর অত্যন্ত সুসংগঠিত। তার মধ্যে অর্থায়ন ও সংগ্রহ, প্রবাসী শ্রমিকদের কাছ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করা হয়। সেই অর্থ দিয়ে দুবাই বা সিঙ্গাপুর থেকে স্ক্র্যাপ বা বার স্বর্ণ ক্রয় করা করে। এরপর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, কেবিন ক্রু, ক্যাটারিং কর্মী এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে নিযুক্ত করা। পরে বিমানের সিটের নিচে, টয়লেটে কিংবা ক্যাটারিংয়ের ট্রলিতে করে স্বর্ণ কাস্টমসের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাইরে নিয়ে আসা হয়। 
অপর এক সূত্র জানায়, উত্তরার, মতিঝিল ও পল্টনের বেশ কিছু মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান চোরাচালানের টাকা লেনদেন ও হুন্ডি প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত, যারা অবৈধ অর্থকে বৈধ রূপ দিতে সহায়তা করে। জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের আড়ালে থাকা তাঁতীবাজার, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চোরাচালানের স্বর্ণের একটি অংশ কিনে গলিয়ে নতুন বার তৈরি করে। 
কাস্টমস ও বিমানবন্দর থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলো থেকে প্রায় ৬৯ দশমিক ৫ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে এবং এই সময়ের মধ্যে সোনা চোরাচালানের দায়ে সারা দেশে ৯২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আবার বিমানবন্দরে স্বর্ন চালানের সাথে মালিক না থাকলে ‘পরিত্যক্ত’ দেখিয়ে মামলা করা হয়। ফলে মূল অপরাধীরা আড়ালেই থাকছে। থেকে যায়। তবে মাঝে মধ্যে ২-১ জন ধরা পড়লেও তারা গডফাদারদের নাম প্রকাশ করে না। কারণ সিন্ডিকেট থেকে তাদের পরিবারের ভরণপোষণ ও আইনি লড়াইয়ের ব্যয়ভার বহন করা হয়।

এমএসএম / এমএসএম

দুবাই, কুয়েত, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব থেকে স্বর্ণ পাচারে কাজ করছে ৫০ মাফিয়া

চাকুরীর বয়স শেষ তবুও প্রধান প্রকৌশলী হতে মরিয়া গণপূর্তের আবুল খায়ের!

বাণিজ্যিক চাষে কাজু-কফির সম্ভাবনা

মাসে দেড়শ' কোটি টাকা যাচ্ছে অমুক্তিযোদ্ধার পেটে

সরকারি চাকরিজীবীদের স্বস্তি, জনজীবনে দুঃখের বোঝা

রেলওয়ের মেগা প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

দুধ-মাংস-ডিমে বদলাবে চরবাসীর জীবন

মেট্রোরেলে টেন্ডার ছাড়াই নতুন চুক্তি

মসলায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বাংলাদেশ

প্রিন্সিপাল সাইফুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ

নুরুন্নবী দুর্নীতির মহাকবি

গণপূর্ত সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট-প্লট জালিয়াতি ও তথ্য পাচারের অভিযোগ

শান্তিনগরে অনুমোদনহীন ১১ তলা ভবন