দুধ-মাংস-ডিমে বদলাবে চরবাসীর জীবন
নদীভাঙন ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে দেশের চরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা বরাবরই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। কৃষিজমির স্বল্পতা, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে এসব এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়-রোজগারের সুযোগও সীমিত। এমন বাস্তবতায় নদীবিধৌত চরাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলোকে প্রাণিসম্পদ পালনের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও জীবন-জীবিকার উন্নয়নে কাজ করছে সরকার।
মানিকগঞ্জ, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলার নদীবিধৌত চরাঞ্চলে বাস্তবায়নাধীন ‘সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প’ এর আওতায় ৬৫ হাজার ২৯০টি দরিদ্র পরিবারের জীবন-জীবিকার উন্নয়নের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া প্রকল্পটি চলবে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে ইতোমধ্যে ১০ হাজার ১৭০ জন সুফলভোগীর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী বিতরণ করা হয়েছে।
শুধু প্রাণী বিতরণ নয়, সুফলভোগীদের প্রশিক্ষণ, ঘর নির্মাণ, উন্নত জাতের ঘাস চাষ ও সাইলেজ তৈরির প্রদর্শনীসহ নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি সমন্বিত প্রাণিসম্পদভিত্তিক জীবিকা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি ভবিষ্যতে উৎপাদিত দুধ, মাংস ও ডিমের বাজারসংযোগ আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় ৩০ হাজার ৩৬৭ দশমিক ৩৪ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৩০৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত। ঢাকা বিভাগের সাত জেলার ৩১টি উপজেলার ১২০টি ইউনিয়ন এ প্রকল্পের আওতাভুক্ত। প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো পশুপালনের মাধ্যমে নদীতীরবর্তী দরিদ্র পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকার উন্নয়ন, চরাঞ্চলে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রাণিসম্পদ প্রযুক্তি গ্রহণে সুফলভোগীদের সক্ষম করে তোলা।
প্রকল্প পরিচালক আব্দুর রহিম সকালের সময়কে বলেন, প্রকল্পের আওতায় সুফলভোগীদের বিভিন্ন ধরনের প্রাণি দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মুরগি, হাঁস, ছাগল, পাঁঠা, ভেড়া, বকনা এবং কবুতর/কোয়েল। পাশাপাশি উন্নত জাতের ঘাস চাষ ও সাইলেজ তৈরির প্রদর্শনীও করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে চরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষকে প্রাণিসম্পদ পালনের সঙ্গে যুক্ত করে তাদের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই প্রধান লক্ষ্য। এ পর্যন্ত ১০ হাজার ১৭০ জন সুফলভোগীকে বিভিন্ন কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, প্রাণিসম্পদ শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত নয়; গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রেও এর বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের মানুষের জন্য পশুপালন তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য একটি আয়ের উৎস হতে পারে। এ কারণে প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাণি বিতরণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ শাহজামান খান সকালের সময়কে বলেন, এ ধরনের প্রকল্প অনুসরণ করে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও আরও প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর মতে, চরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের আত্মকর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনে প্রকল্পটি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। শাহজামান খান বলেন, “দারিদ্র্য বিমোচন ও আত্মকর্মসংস্থানের জন্যই এই প্রকল্প। যখন একজন কৃষককে আমরা উন্নত করতে পারব, তখন তিনি নিজেই প্রাণিসম্পদ নিয়ে কাজ করতে পারবেন।
তিনি বলেন, প্রকল্পের বিভিন্ন বিতরণ কর্মসূচিতে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও এসব কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত হচ্ছেন। ফলে সুফলভোগী নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রাণি বিতরণ পর্যন্ত কার্যক্রম দৃশ্যমানভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
গত ২৬ আগস্ট গজারিয়ায় গবাদিপশু বিতরণ অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন বলেও জানান তিনি।
উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজন বাজারসংযোগ
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; উৎপাদিত পণ্য যাতে কৃষক সহজে বাজারজাত করতে পারেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারসংযোগ তৈরি, সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নয়ন এবং ভ্যালু চেইন শক্তিশালী করার বিষয়ে কাজ চলছে। কৃষক যদি নিশ্চিত হন যে তাঁর উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য বাজার রয়েছে, তাহলে তিনি আরও বেশি বিনিয়োগ ও উৎপাদনে উৎসাহিত হবেন।
শাহজামান খান বলেন, “লাইভস্টক তখনই মার খায়, যখন মার্কেটে সমস্যা সৃষ্টি হয়। দুধ উৎপাদন করে দাম না পাওয়া বা ডিম উৎপাদন করে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া—এ ধরনের সমস্যা থাকলে মানুষ নিরুৎসাহিত হয়। সরকার যদি বাজারের নিশ্চয়তা দিতে পারে, তাহলে উদ্যোক্তা তৈরি হবে।”
তিনি জানান, প্রাণিসম্পদ খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি রপ্তানিমুখী উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। এ জন্য ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা: মহাপরিচালক জানান, চরাঞ্চলের এই প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও প্রাণিসম্পদ উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণের চিন্তা করা হচ্ছে। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলা নিয়ে রাজশাহী অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প, ময়মনসিংহ অঞ্চলের উন্নয়ন প্রকল্প ও সিলেট অঞ্চলের উন্নয়ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগ ও দেশের দক্ষিণাঞ্চলেও এ ধরনের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রকল্প নিয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি। শাহজামান খান বলেন, এসব প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু প্রাণি বিতরণ নয়, বাজারসংযোগ, সংরক্ষণ, রোগ নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও রপ্তানির সক্ষমতা—সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে।
রপ্তানিমুখী প্রাণিসম্পদ খাত গড়ার লক্ষ্য: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ভবিষ্যতে প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও বেশি রপ্তানিমুখী করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য রোগ নিয়ন্ত্রণ ও ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, রোগ শনাক্তকরণ ও নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা বাড়াতে বগুড়ায় ভ্যাকসিন-সংক্রান্ত একটি কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
রপ্তানির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রাণিসম্পদ খাতের বিভিন্ন পণ্য বিদেশে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পোল্ট্রি শিল্পকে আরও সক্ষম করে পোল্ট্রি মাংস রপ্তানির সম্ভাবনাও দেখা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য রোগ নিয়ন্ত্রণ, মান নিশ্চিতকরণ ও আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের বিষয়গুলো পূরণ করতে হবে।
প্রাণি বিতরণে স্বচ্ছতার দাবি: প্রকল্পের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে দাবি করে শাহজামান খান বলেন, সুফলভোগীদের কী পরিমাণ ও কী ধরনের প্রাণি দেওয়া হচ্ছে, তা সরাসরি যাচাই করা সম্ভব। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ, ঘর নির্মাণসহ অন্যান্য কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমরা সুফলভোগীদের কী দিচ্ছি, সেটা যাচাই-বাছাই করে দেওয়া হয়। গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস-মুরগি—কতগুলো দেওয়া হচ্ছে, তা সরাসরি দেখা যায়। প্রশিক্ষণ হচ্ছে কি না, ঘর দেওয়া হচ্ছে কি না—এসবও দৃশ্যমান।”
চরাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলোকে প্রাণিসম্পদভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তায় পরিণত করা গেলে একদিকে যেমন তাদের আয় বাড়বে, অন্যদিকে দেশের দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদনও বাড়বে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রাণি বিতরণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, রোগ নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, ন্যায্যমূল্য এবং স্থায়ী বাজারসংযোগ নিশ্চিত করাই প্রকল্পের সাফল্যের বড় পরীক্ষা হবে।
এমএসএম / এমএসএম
দুধ-মাংস-ডিমে বদলাবে চরবাসীর জীবন
মেট্রোরেলে টেন্ডার ছাড়াই নতুন চুক্তি
মসলায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বাংলাদেশ
প্রিন্সিপাল সাইফুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ
নুরুন্নবী দুর্নীতির মহাকবি
গণপূর্ত সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট-প্লট জালিয়াতি ও তথ্য পাচারের অভিযোগ
শান্তিনগরে অনুমোদনহীন ১১ তলা ভবন
রোবটিক্স-অটোমেশনে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতি
বন মামলার নথি বদল: সংবাদ প্রকাশের পর তদন্তের নির্দেশ
বঙ্গোপসাগর ঘিরে ভুরাজনীতিঃ বাংলাদেশ কী করবে?
ডিএইতে পরিবর্তনের চেষ্টা করেছি : মহাপরিচালক আব্দুর রহিম
বেবিচকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরউদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়: পদ আঁকড়ে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ