মসলায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বাংলাদেশ
দেশের ক্রমবর্ধমান মসলা চাহিদা পূরণ, আমদানি ব্যয় কমানো এবং মসলা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে আধুনিক জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের 'মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প'। দেশের ৪০টি জেলার ১১০টি উপজেলায় এবং ২৫টি হর্টিকালচার সেন্টারে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের মাধ্যমে মসলা চাষে নতুন প্রযুক্তি, উন্নত জাত, ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা
এবং বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশে মসলা উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পতিত ও অনাবাদি জমি, বসতবাড়ির আঙিনা, ফলবাগান এমনকি ভবনের ছাদও মসলা চাষের আওতায় আনা হচ্ছে। ফলে একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং বাড়ছে শস্যের নিবিড়তা। প্রকল্পের সামগ্রিক উদ্দেশ্য হলো আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে উন্নত জাতের মসলা ফসলের বছরব্যাপী উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি ব্যয় হ্রাস করা এবং মসলা জাতীয় ফসলে
বাড়ানো। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই মূল লক্ষ্য প্রকল্পের নির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে স্থায়ী ও মৌসুমী পতিত জমির পাশাপাশি বসতবাড়ির ফাঁকা জায়গা চাষের আওতায় এনে শস্য নিবিড়তা ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা। একইসঙ্গে আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মসলা ফসলের ফলন পার্থক্য কমানো, টেকসই উৎপাদন ও ফসল সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং মসলা প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বহুমুখীকরণ
করা। এছাড়া প্রতিকূল পরিবেশে অভিযোজন ক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে মসলা ফসলের কৃষি উৎপাদনশীলতা ৫ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। আয়বর্ধক কার্যক্রমে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নারী, বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের সম্পৃক্ত করে নারীর ক্ষমতায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া
বস্তায় আদা চাষে পতিত জমির ব্যবহার প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হচ্ছে বস্তায় আদা চাষ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ। দেশের চাহিদার তুলনায় আদার উৎপাদন ঘাটতি থাকায় প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পা পরিমাণ আদা আমদানি করতে অবস্থায় পতিত জমি, বসতবাড়ির আশপাশ, ফলবাগান এমনকি ভবনের ছাদেও বস্তায় আদা চাষের প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আমদানি করতে হয়। এ প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে,
বস্তায় আদা চাষে তুলনামূলকভাবে কম খরচ হয়। বস্তা পুনঃব্যবহারযোগ্য, পরিবেশবান্ধব, তাপ ও পানি প্রতিরোধী হওয়ায় এটি কৃষকদের জন্য সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি। এ পদ্ধতির আরেকটি সুবিধা হলো কোনো বন্ধায় কন্দপচা রোগ দেখা দিলে আক্রান্ত বস্তাটি সরিয়ে নেওয়া যায়। ফলে অন্য গাছে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে। প্রকল্পের মেয়াদে বসতবাড়ি, ছাদবাগান ও ফলবাগানে বস্তায় আদা চাষের প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজে নতুন সম্ভাবনা
মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদনেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের পাঁচটি উপজেলায় প্রতি প্রদর্শনীতে এক বিঘা জমিতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সুস্থ ও সবল বীজের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করাই এ কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য। ভবিষ্যতে বড় পরিসরে দেশীয়ভাবে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করা হলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চারা উৎপাদন ও বিতরণেও জোর দেওয়া হয়েছে। দেশের ২৫টি হর্টিকালচার সেন্টারে মানসম্মত গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চারা উৎপাদনের কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে পলিশেডে প্রদর্শনীর মাধ্যমে চারা উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
বারি পেঁয়াজ-২, ৩, ৫ এবং নাসিক-৫৩-এর মতো খরা মৌসুমে চাষযোগ্য স্বল্পমেয়াদি জাতগুলো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদে মোট ৩ হাজার ৩৭৫টি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের প্রদর্শনী বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। দেশেই জিরা উৎপাদনের উদ্যোগ
মসলার আমদানি ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে প্রকল্পের অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ হচ্ছে বারি জিরা-১ জাতের সম্প্রসারণ। দেশে জিরার চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন জিরা আমদানি করা হয় এবং এতে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার। জার কোটি টাকা পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়।
কৃষি বিজ্ঞানীদের গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত বারি জিরা-১ জাতটি ২০২২ সালে জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন লাভ করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে মাঠ পর্যায়ে এ জাতের সম্প্রসারণে কাজ শুরু করে প্রকল্পটি। প্রকল্পের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ১০টি জেলায় জিরার প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬০ জন কৃষককে মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বগুড়া থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে জিরার বীজ দেওয়া হয়েছে। কষকরা প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করে কাঙ্ক্ষিত ফলন পেয়েছেন। আগামী মৌসুমে প্রায় ৫০ বিঘা জমিতে জিরা চাষের পরিকল্পনা রয়েছে। জিরার জাত ও প্রযুক্তি আরও বিস্তৃতভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে দেশে উৎপাদন বাড়বে এবং আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পলিশেড প্রযুক্তি
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় মোকাবিলায় পলিশেডে চারা উৎপাদন প্রযুক্তিও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। অতিরিক্ত তাপদাহ, বর্ষায় অতিবৃষ্টি কিংবা শীতের তীব্র ঠান্ডায় খোলা মাঠে সুস্থ-সবল চারা উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় পলিশেড বা পলিহাউস প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিকূল পরিবেশ থেকে চারাকে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষিত কৃষকদের মাধ্যমে পলিশেড স্থাপন এবং চারা উৎপাদনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
মাতৃবাগান থেকে মানসম্মত চারা
মসলা ফসলের উন্নত জাতের চারা কলম সহজলভ্য করতে দেশের ২৪টি হর্টিকালচার সেন্টারে দারুচিনি, গোলমরিচ, তেজপাতাসহ বিভিন্ন মসলা ফসলের মাতৃবাগান স্থাপন করা হয়েছে। মাতৃবাগানের মাধ্যমে রোগমুক্ত গুণগত মানসম্পন্ন চারা-কাটিং উৎপাদন, জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ এবং কৃষকদের মধ্যে উন্নত জাতের চারা বিতরণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে মসলা উৎপাদনের পরিধি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। গোলমরিচ চাষেও বাড়ছে অগ্রহ
আম, সুপারি, কাঁঠাল ও জামসহ বিদ্যমান গাছকে সাথী ফসল হিসেবে ব্যবহার করে গোলমরিচ চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এতে নতুন করে জমি ব্যবহারের প্রয়োজন না থাকায় কৃষকের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরে প্রকল্পের আওতায় ৪০০টি গোলমরিচ প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে গোলমরিচ চাষে উদ্বুদ্ধ করা এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি করাই এসব প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য। একই জমিতে একাধিক মসলা
আন্তঃফসল, সাথী ফসল ও আইল ফসল হিসেবেও মসলা চাষের প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আম, মাল্টা, পেয়ারা, লেবু, তেজপাতা, দারুচিনি, ড্রাগন ফলসহ বিভি-ন্ন বাগানে আদা, হলুদ, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচ, কালোজিরা, মৌরি ও একাঙ্গির মতো মসলা চাষ করা হচ্ছে। এছাড়া আখের সঙ্গে ধনিয়া, পেঁয়াজ ও কালোজিরা এবং কলাবাগানে মরিচসহ বিভিন্ন সমন্বিত চাষ পদ্ধতি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ফলে একই জমি থেকে কৃষকের একাধিক ফসল ও আয় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। মডেল মসলা গ্রাম
পতিত ও অনাবাদি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং মসলার ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় একটি মডেল মসলা গ্রাম স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় ২০ একর জমিতে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নত জাতের মসলা উৎপাদনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এখানে আদা চাষের পাশাপাশি আন্তঃফসল, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, পলিহাউস ও নেট হাউস, মালচিং এবং মাটির উর্বরতা ও আর্দ্রতা ধরে রাখার বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামের ১০০টি কৃষক পরিবারের বসতবাড়ির আঙিনায় বছরব্যাপী মসলা চাষের কার্যক্রম চলছে। কম জায়গায় বেশি উৎপাদনের লক্ষ্যে ভার্টিক্যাল এগ্রিকালচারের প্রদর্শনীও করা হচ্ছে
কৃষক মো. আসগর আলীর বক্তব্য আমি মো. আসগর আলী, বয়স ৩৬ বছর। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের গোলাই গ্রামের একজন সাধারণ কৃষক। কৃষিকাজ করেই আমার সংসার চলে। নতুন কোনো ফসল চাষ করা আমাদের মতো দরিদ্র কৃষকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ ও উপজেলা কৃষি অফিসের প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রথমবারের মতো জিরা চাষে আগ্রহী হই।
'মসলার আধুনিক জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের' আওতায় ১০ শতাংশ জমিতে জিরা চাষ করি। শুরুতে কিছুটা ভয় ও সংশয় থাকলেও কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতায় ভালো ফলন পাই। ১০ শতাংশ জমি থেকে প্রায় ৩০ কেজি জিরা উৎপাদন হয়েছে। হিসাবে হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় ৭৪০ কেজি, উৎপাদন খরচ প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং বাজারমূল্য প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এতে হেক্টরপ্রতি প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিট লাজের সম্ভাবনা রয়েছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, আমাদের বরেন্দ্রভূমিতেও জিরা চাষ সম্ভব, যা প্রমাণ করতে পেরেছি। আমার জমির ফলন দেখতে আশপাশের গ্রামের অনেক কৃষক আসছেন এবং জিরা চাষে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। অনেকে আমার কাছ থেকে বীজও
সংগ্রহ করছেন। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা নিয়মিত জমি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের প্রশিক্ষণ, উন্নত বীজ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ছাড়া প্রথমবারের মতো জিরা চাষে এই সাফল্য অর্জন করা কঠিন ছিল। আমি মনে করি, কৃষি বিভাগের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে আমাদের এলাকায় জিরা চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে, কৃষকের আয় বাড়বে এবং দেশের মসলার চাহিদা পূরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষক মো. নূরুল ইসলামের বক্তব্য
আমি মো. নূরুল ইসলাম, বয়স ৪০ বছর। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার বিনায়েকপুর গ্রামের একজন কৃষক। আগে ৫ শতাংশ জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে আদা চাষ করতাম। এতে রোগ-পোকা, পানি নিষ্কাশন সমস্যা, বেশি উৎপাদন খরচ এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে তেমন লাভ করতে পারতাম না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মসলা প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে বস্তায় আদা চাষের আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে পারি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রদর্শনীর মাধ্যমে প্রথমবার আদা উৎপাদন করি। এতে ১৫ হাজার ৫০০ বস্তায় আদা চাষ করে ৩২৫ কেজি আদা উৎপাদন ব ৫০০ টাকা করে ৩৪ হাজার ১২৫ টাকার আদা বিক্রি করে ১৮ হাজার ৬২৫ টাকা লাভ হয়। এতে উৎসাহিত হয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রদর্শনীর ৫০০ বস্তার পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে আরও ২ হাজার বস্তায় আদা চাষ করি। মোট ২ হাজার ৫০০ বস্তা থেকে ২ হাজার ১২৫ কেজি আদা উৎপাদন করে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি করি এবং ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৫০ টাকা লাভ করি।
বস্তায় আদা চাষ আমার জন্য লাভজনক ও সহজ একটি প্রযুক্তি। এই পদ্ধতিতে কম জায়গায়, তুলনামূলক কম খরচে ভালো ফলন পাওয়া যায়। আমার সফলতা দেখে গ্রামের অন্য না কৃষকরাও বস্তায় আদা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আমি এখন আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারছি এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রাখতে পারছি।
এ প্রসঙ্গে মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক রাসেল আহমেদ বলেন, গত বছরের তুলনায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে বিভিন্ন মসলা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির ইতিবাচক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে আদা, রসুন, হলুদ ও কালোজিরার উৎপাদনে অগ্রগতি হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাপসিকামের উৎপাদনও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, ২০২৩-২৪ সালের তুলনায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মসলা ফসলের উৎপাদন বেড়েছে। আদা, রসুন ও হলুদের ক্ষেত্রে আমরা ভালো সাফল্য পেয়েছি। কালোজিরার উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে ক্যাপসিকামের উৎপাদনও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সব মিলিয়ে চলতি বছরে প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
রাসেল আহমেদ বলেন, দেশের মসলা উৎপাদন আরও বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে উন্নত ও অধিক ফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ, মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা এবং মাতৃবীজের নিশ্চয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, আমাদের সামনে আরও অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নতুন ও ভালো জাতের বীজ এবং মানসম্মত মাতৃবীজ নিশ্চিত করতে পারলে মসলা ফসলের উৎপাদনশীলতা আরও বাড়ানো সম্ভব। ফলে দেশের মোট মসলা উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে এবং ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। গোলমরিচ উৎপাদনের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, এ খাতেও ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একসময় গোলমরিচের চাহিদা পূরণে প্রায় পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হলেও বর্তমানে দেশে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, গোলমরিচের ক্ষেত্রে আগে আমাদের প্রায় শতভাগ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হতো। এবার প্রায় ১৭ টন আমদানি করতে হয়েছে। এ বিষয়টি আমাদের জন্য একটি ইতিবাচক দিক এবং একইসঙ্গে এখানে উৎপাদন
বুদ্ধির বড় সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, মসলা উৎপাদনে টেকসই সাফল্য অর্জনের জন্য শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না। মানসম্মত বীজ ও উন্নত জাতের সরবরাহ হাতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। রাসেল আহমেদ বলেন, আমরা যদি বিস্তৃত পরিসরে কাজ করতে পারি এবং ভালো জাত, ভালো বীজ ও মাতৃবীজ নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং মোট উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে। ভবিষ্যতে ভবিষ্যতে বীজের বিষ বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে মসলা আমদানির ওপর যে চাপ রয়েছে, তা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। এর
ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশের মসলা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথ আরও সহজ হবে। প্রকল্পের আওতায় মাঠপর্যায়ে উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৃষকদের প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী, মাতৃবাগান, পলিশেড, আন্তঃফসল ও সাথী ফসলসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
দেশের ৪০টি জেলার ১১০টি উপজেলা এবং ২৫টি হর্টিকালচার সেন্টারে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক মসলা চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালক মনে করেন, এসব কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে একদিকে কৃষকের উৎপাদন ও আয় বাড়বে, অন্যদিকে দেশে মসলা উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে আমদানিনির্ভরতা কমবে। দীর্ঘমেয়াদে এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দেশের মসলা খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথ আরও সুগম হবে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন, মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের' আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মসলাজাতীয় ফসলের উন্নত জাত ও আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করা হচ্ছে।
এর মধ্যে বস্তায় আদা চাষ একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। বিশেষ করে আদার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে বস্তায় আদা চাষের প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় প্রথম দিকে বস্তায় আদা চাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের কাজ শুরু করা হয়। বর্তমানে শুধু গ্রামাঞ্চলেই নয়, ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাড়ির ছাদেও স্বল্প পরিসরে বস্তায় আদা চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি আম, পেয়ারা ও অন্যান্য ফলবাগানেও বস্তা বা অনুরূপ পদ্ধতিতে আদা চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও যশোরসহ বিভিন্ন এলাকায় এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আদা চাষ হচ্ছে।
মহাপরিচালক বলেন, সঠিক জাত, বীজ, বস্তার মাটি ও সার ব্যবস্থাপনা এবং পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে একটি বস্তায় ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে প্রতি বস্তায় প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম আদা উৎপাদন হচ্ছে। তবে কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে আরও উন্নত ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি প্রয়োগ ও কৃষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। এ বিষয়ে কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
জিরা চাষ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে জিরার চাষ খুবই সীমিত ছিল। বর্তমানে দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জাত ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। পরীক্ষামূলকভাবে জিরা উৎপাদনের মাধ্যমে দেশে নতুন একটি সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। জিরার চাহিদা ও বাজারমূল্য বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে এ চাষ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের আওতায় চুইঝাল নিয়েও কাজ করা হচ্ছে। দেশের বিশেষ করে খুলনা ও যশোর অঞ্চলে চুইঝাল মসলা ও সবজিজাতীয় উপাদান হিসেবে বিভিন্ন খাবারে ব্যবহৃত হয়। স্থানীয়ভাবে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই সম্ভাবনাময় এ মসলাটির উৎপাদন ও সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কাঁচামরিচ উৎপাদনেও প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে উল্লেখ করে আব্দুর রহিম বলেন, বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে কাঁচামরিচের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ সমস্যা মোকাবিলায় উঁচু বেড বা উপযুক্ত মাটি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মালচিং পদ্ধতিসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাঁচামরিচ চাষের সম্প্রসারণ হচ্ছে। এটিও প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
রসুনের বিষয়ে মহাপরিচালক বলেন, বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রসুনের পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বারি রসুনের বিভিন্ন জাত নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। দেশের অন্যতম প্রধান রসুন উৎপাদনকারী এলাকা নাটোরের গুরুদাসপুর। সেখানে স্থানীয় জাতের রসুনের চাষ ব্যাপকভাবে হয়ে থাকে। স্থানীয় এসব রসুনের আকার তুলনামূলক ছোট হলেও ঝাঁঝ ও স্বাদের কারণে এর আলাদা চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি বারি রসুনের কয়েকটি উন্নত জাতও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, রসুনের উন্নত জাতগুলো এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে এ বিষয়ে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। উন্নত জাত, আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক ব্যবস্থাপনা মাঠপর্যায়ে আরও বিস্তৃত করা গেলে দেশের মসলা উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। মহাপরিচালক বলেন, মসলার উৎপাদন বাড়াতে শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন নয়, উৎপাদন প্রযুক্তি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া, অনাবাদি ও পতিত জমি কাজে লাগানো এবং কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করাও জরুরি। এ লক্ষ্যেই প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন মসলা ফসলের উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এমএসএম / এমএসএম
মেট্রোরেলে টেন্ডার ছাড়াই নতুন চুক্তি
মসলায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বাংলাদেশ
প্রিন্সিপাল সাইফুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ
নুরুন্নবী দুর্নীতির মহাকবি
গণপূর্ত সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট-প্লট জালিয়াতি ও তথ্য পাচারের অভিযোগ
শান্তিনগরে অনুমোদনহীন ১১ তলা ভবন
রোবটিক্স-অটোমেশনে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতি
বন মামলার নথি বদল: সংবাদ প্রকাশের পর তদন্তের নির্দেশ
বঙ্গোপসাগর ঘিরে ভুরাজনীতিঃ বাংলাদেশ কী করবে?
ডিএইতে পরিবর্তনের চেষ্টা করেছি : মহাপরিচালক আব্দুর রহিম
বেবিচকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরউদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়: পদ আঁকড়ে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ
নিরাপত্তা ঘাটতি, ক্ষতিপূরণহীন পরিবার আর অপূর্ণ সুপারিশ