ঢাকা রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

GAP-এর মাধ্যমে নিরাপদ কৃষি ও রপ্তানির নতুন দিগন্ত: বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি


টি আই এস বিউটি photo টি আই এস বিউটি
প্রকাশিত: ১৪-৬-২০২৬ রাত ১০:১১

বাংলাদেশের কৃষি আজ শুধু খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যম নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম চালিকাশক্তি। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার বিকাশ এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার দেশের কৃষিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় উত্তম কৃষি চর্চা (Good Agricultural Practices-GAP) বাস্তবায়ন কৃষি খাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
নিরাপদ ও মানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ সংরক্ষণ, কৃষিশ্রমিকের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ‘বাংলাদেশ উত্তম কৃষি চর্চা নীতিমালা-২০২০’ প্রণয়ন করেছে। GAP-এর মানদণ্ড অনুসরণ করে উৎপাদিত কৃষিপণ্য শুধু ভোক্তার আস্থা অর্জন করছে না, বরং রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনাও সৃষ্টি করছে।
কৃষকের মাঠ থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ টেকসই কৃষি উন্নয়ন ও স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থার পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করবে। তাই GAP আজ শুধু একটি কৃষি মানদণ্ড নয়, বরং নিরাপদ খাদ্য, টেকসই উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সফলতার এক নতুন দিগন্ত।
(পার্টনার) প্রকল্পের  ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, ডক্টর মাহবুবা মুনমুন GAP নিয়ে বিস্তারিত সকালের সময়কে বলেন। 
বাংলাদেশের কৃষি এখন শুধু নিজের খাদ্য চাহিদা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কৃষিকে বাণিজ্যিক, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক বাজার উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্য নি১য়ে কাজ করছে পার্টনার (PARTNER) প্রকল্প। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হলো GAP (Good Agricultural Practices) বা উত্তম কৃষি চর্চা।
ড. মাহবুবা মুনমুন জানান, দেশের কৃষিকে একটি নতুন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে পার্টনার প্রকল্প। আগে কৃষক মূলত নিজের পরিবারের খাদ্য চাহিদা পূরণ করে উদ্বৃত্ত অংশ বাজারে বিক্রি করতেন। এখন লক্ষ্য হলো কৃষিকে একটি লাভজনক ব্যবসায়িক খাতে রূপান্তর করা, যেখানে কৃষক শুধু উৎপাদক নন, একজন সফল উদ্যোক্তা।

বাংলাদেশের ফল ও সবজির স্বাদ, মিষ্টতা ও গুণগত মান বিশ্বমানের। কিন্তু নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরে ছিল।
এর মধ্যে রয়েছে—
অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহার
মাটি ও সেচের পানিতে ভারী ধাতুর (Heavy Metal) উপস্থিতি
অপরিষ্কার পানি ব্যবহারের ফলে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ
উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সময় বিভিন্ন ধরনের শারীরিক দূষণ
এসব কারণে খাদ্যে রাসায়নিক, জৈবিক এবং ভৌত দূষণের ঝুঁকি তৈরি হয়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বড় বাধা।
GAP-এর সহজ ও কার্যকর প্রযুক্তি
পার্টনার প্রকল্প কৃষকদের হাতে-কলমে GAP প্রযুক্তি শেখাচ্ছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের শেখানো হচ্ছে—
মাটি ও সেচের পানি পরীক্ষা করা
জমির চারপাশে নেট দিয়ে পোকামাকড় প্রতিরোধ করা
ইয়েলো ট্র্যাপ ও ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করা
জৈবিক পদ্ধতিতে বালাই দমন করা। 
নিমপাতা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করা
প্রয়োজন ছাড়া কীটনাশক ব্যবহার না করা
নির্ধারিত সময়ের আগে ফসল সংগ্রহ না করা
এর ফলে কীটনাশকের ব্যবহার কমছে, উৎপাদন খরচ কমছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে।
পার্টনার প্রকল্পের ১০ সপ্তাহের প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য কৃষকদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা।
প্রশিক্ষণে কৃষকদের শেখানো হয়—
নিরাপদ উৎপাদন পদ্ধতি
রেকর্ড সংরক্ষণ
বাজার বিশ্লেষণ
পণ্য বিপণন
রপ্তানি বাজারের চাহিদা
বর্তমানে কৃষকরা উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ নথিভুক্ত করছেন, যা GAP-এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
৯,২০০ হেক্টর জমিতে GAP চর্চা
এ বছর প্রায় ৯,২০০ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদনে GAP অনুসরণ করা হয়েছে। রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে GAP অনুসরণকারী খামারগুলো এখন দৃশ্যমান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, হর্টেক্স ফাউন্ডেশন, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের ১৫টি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আলু
GAP অনুসরণ করে উৎপাদিত আলুর প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে।
ড. মাহবুবা মুনমুন জানান, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩৪ হাজার মেট্রিক টন আলু রপ্তানি করা হয়েছে।
মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের আলুর চাহিদা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট জাতের আলু উৎপাদনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

রাজশাহী ও সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে GAP অনুসরণ করে আম উৎপাদন করা হচ্ছে।
আম সংগ্রহের পর—
হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট
নিরাপদ প্যাকেজিং
ব্যাগিং প্রযুক্তি
পরিচ্ছন্ন সংরক্ষণ
ইত্যাদি পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরার কলারোয়ার একটি GAP সার্টিফায়েড আমবাগান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসা পেয়েছে এবং কাতারে আয়োজিত আন্তর্জাতিক এক্সপোতেও প্রদর্শিত হয়েছে।
নিরাপদ খাদ্যের জন্য সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা
বাংলাদেশে GAP বাস্তবায়নের জন্য একটি জাতীয় মানদণ্ড তৈরি করা হয়েছে।
এই মানদণ্ড—
খাদ্য নিরাপত্তা
পরিবেশ সুরক্ষা
শ্রমিক কল্যাণ
উৎপাদন ব্যবস্থাপনা
বাজারজাতকরণ
সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত করে।
এটি BSTI অনুমোদিত এবং বাংলাদেশ GAP স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে স্বীকৃত।
এছাড়া BSCP (Bangladesh Certification Body for Safe Crops Production) মাঠ পর্যায়ে অডিট করে GAP অনুসরণকারী কৃষকদের সার্টিফিকেট প্রদান করছে।
কৃষকদের জন্য বাস্তব সহায়তা
পার্টনার প্রকল্প কৃষকদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে—
মাটি ও পানি পরীক্ষার সুযোগ
প্লাস্টিক হারভেস্টিং ট্রে
প্রযুক্তিগত পরামর্শ
রপ্তানি বাজারের সঙ্গে সংযোগ
ক্রেতা ও উৎপাদকের মধ্যে লিংকেজ। 
এছাড়া মিনাবাজার, স্বপ্নসহ আধুনিক খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কৃষকদের সংযুক্ত করা হয়েছে।
পার্টনার প্রকল্প চর ও উপকূলীয় অঞ্চলেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।
উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—
চিনাবাদাম চাষ
সূর্যমুখী চাষ
লবণাক্ততা সহনশীল তরমুজ
মিষ্টি কুমড়া উৎপাদন
বিশেষ করে খুলনা অঞ্চলে সারা বছর উৎপাদিত ‘অক্সিজেন তরমুজ’ কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের উৎস হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
ড. মাহবুবা মুনমুন বলেন, GAP-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো মানুষের মধ্যে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে GAP আরও বিস্তৃত হবে এবং বাংলাদেশ নিরাপদ ফল ও সবজি উৎপাদনে আন্তর্জাতিকভাবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে।
তিনি ভোক্তাদের উদ্দেশে বলেন, “বাংলাদেশের ফল ও সবজি নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার কারণ নেই। ফল ও সবজি আমাদের পুষ্টির অন্যতম প্রধান উৎস। নিরাপদ উৎপাদন নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি, আর GAP সেই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।”
 নিরাপদ ও রপ্তানিমুখী করার যে যাত্রা শুরু হয়েছে, GAP তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠছে। কৃষক, ভোক্তা ও দেশের অর্থনীতির জন্য এটি এক আশাব্যঞ্জক অগ্রযাত্রা।

উত্তম কৃষি চর্চা (GAP) অনুসরণে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এ বিষয়ে প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন, নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (PARTNER) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, GAP সঠিকভাবে অনুসরণ করা হলে নিরাপদ ও মানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর ফলে বাজারে তাজা সবজি ও ফলের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং বিপণন প্রক্রিয়াও হবে আরও সহজ ও কার্যকর।
তিনি বলেন, “GAP-এর মূল বিষয় হলো ফসল উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে নির্ধারিত কৃষি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা এবং সব কার্যক্রমের সঠিক রেকর্ড সংরক্ষণ করা। এতে একজন ভোক্তা সহজেই জানতে পারবেন কোন কৃষক কী পরিমাণ সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেছেন এবং ব্যবহৃত উপকরণ মানবস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ কি না।”
আবুল কালাম আজাদ আরও জানান, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে GAP-এর আওতায় সর্বোচ্চ অবশিষ্টাংশ সীমা (Maximum Residue Limit-MRL) পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি সেচ ও উৎপাদনে ব্যবহৃত পানির মানও পরীক্ষা করা হয়, যাতে পানিতে আর্সেনিক বা অন্য কোনো ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
তিনি বলেন, “GAP ব্যবস্থায় কৃষিপণ্যের ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করতে কিউআর কোড ব্যবহার করা হবে। কিউআর কোড স্ক্যান করে ভোক্তারা জানতে পারবেন পণ্যটি কে উৎপাদন করেছেন, কোথায় উৎপাদিত হয়েছে, উৎপাদনের সময় কী ধরনের কৃষি চর্চা অনুসরণ করা হয়েছে এবং সেই চর্চাগুলো মানবস্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ ও উপকারী।”
GAP শুধু নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনেই নয়, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। কারণ এই পদ্ধতিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথাযথ ও সীমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়, ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পায় এবং উপকারী পোকামাকড় ও জীববৈচিত্র্য কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আবুল কালাম আজাদ জানান, দেশে GAP-এর ব্যাপক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন ভোক্তারা নিরাপদ খাদ্য পাবেন, অন্যদিকে কৃষকরাও উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম পেয়ে আরও বেশি উৎপাদনে উৎসাহিত হবেন। এর মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা, টেকসই কৃষি এবং কৃষকের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

এমএসএম / এমএসএম

GAP-এর মাধ্যমে নিরাপদ কৃষি ও রপ্তানির নতুন দিগন্ত: বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি

৩৩.৩৫ কোটিতে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের কন্ট্রোলার

মন্ত্রীর সঙ্গে দখলের তালিকায় দেশের শীর্ষ শিল্পগ্রুপ

বনবিভাগের মালি থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক বাউন্ডারি শহিদ

বন রক্ষকই যখন দখলের গডফাদার

বাস কোম্পানির চাঁদায় চলে এসপি অফিসের চা খরচ

ডিপফেক ও এআই প্রযুক্তি চ্যালেঞ্জে এমএস-১৩ গ্যাং এর আদলে অপরাধীরা সক্রিয়

বিসিকের অসংতিপূর্ণ টেন্ডার কার্যক্রম!

কুরিয়ারে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে জাল টাকা

শুল্কফাঁকি দিয়ে অ’বৈধ বাজাজ সিএনজি আমদানির নামে শত কোটি টাকার মালিক এখন হাজী আব্দুর রশিদ বুলু

যৌন সহিংসতা - সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার তীব্র সংকটে বাংলাদেশ

প্রাণীসম্পদ খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপ দিতে কাজ করছে সরকার : শাহজামান খান

দলিল বাণিজ্যের অন্দরমহল