ই-জিপি ছাড়াই, মেট্রোরেলের টেন্ডার
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে জনবল সরবরাহের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দরপত্রকে ঘিরে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার প্রচলিত ই-জিপি পদ্ধতি অনুসরণ না করে ম্যানুয়াল টেন্ডারের মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যা অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
প্রাপ্ত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, গত ৮ জুন ২০২৬ তারিখে ডিএমটিসিএল আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল সরবরাহের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। ২০২৬ সালের জুন মাসে দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে প্যাকেজ-৬ (মেট্রোরেল ডিপো এলাকা) এবং প্যাকেজ-৭ (উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে আগারগাঁও স্টেশন পর্যন্ত)–এ একাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।
প্যাকেজ-৬-এ অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: আল ওয়াফা সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড, মেসার্স তাকবির এন্টারপ্রাইজ, এ.কে. ট্রেডার্স লিমিটেড, ইসোর্ট ট্রেডিং, ভিএক্স সার্ভিসেস লিমিটেড, বৈশাখী সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড, একতা আউটসোর্সিং লিমিটেড এবং মন্ট ফোর্ট টেকনোলজিস (প্রা.) লিমিটেড।
প্যাকেজ-৭-এ অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: রেডিসন ডিজিটাল টেকনোলজি লিমিটেড, এ.কে. ট্রেডার্স লিমিটেড, ইসোর্ট ট্রেডিং, আল-আরাফাত সার্ভিসেস (প্রা.) লিমিটেড, ভিএক্স সার্ভিসেস লিমিটেড, বৈশাখী সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড এবং সাবলাইম ফ্যাসিলিটিস লিমিটেড।
অভিযোগ রয়েছে, উপরোক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগ্য কোম্পানিগুলোকে বাদ দিয়ে অযোগ্য কোম্পানিকে সুযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ই-জিপি টেন্ডার না করে ম্যানুয়াল টেন্ডার করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের পাঁয়তারা করছেন ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পিএস মো. জাহিদুল ইসলাম এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (স্টোর ও প্রকিউরমেন্ট) মিলন আল-মামুন। এ ছাড়া দরপত্রে অংশ নেওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
রেডিসন ডিজিটাল টেকনোলজি লিমিটেড: প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন ফারুককে নিয়ে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের আত্মীয় এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ পেয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তার বিরুদ্ধে অর্থের জোগান দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলায় তিনি সাভার থানায় হত্যামামলার আসামি । মামলা নং-১৩/৭২৪, আসামী নং-৪৭। তার প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের কালো তালিকাভুক্ত এমন অভিযোগও রয়েছে।
এ.কে. ট্রেডার্স লিমিটেড: প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলায় আসামি থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিমানবন্দরে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করার সময় চোরাচালান ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে ।
আল-আরাফাত সার্ভিসেস (প্রা.) লিমিটেড: প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলায়েত হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এপিএস-২ লিকুর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতেন। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশন চ্যানেলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে । প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ই-জিপি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ডিএমটিসিএলের এই ম্যানুয়াল টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সুশাসন ও সরকারি ক্রয়বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ই-জিপি ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার যৌক্তিকতা থাকলে তা যথাযথভাবে নথিবদ্ধ ও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। অন্যথায় অনিয়মের অভিযোগ জনমনে আস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
এ বিষয়ে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. শাওগাতুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে পরিচালক (প্রশাসন) এ.কে.এম. খায়রুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমরা নিজেরা কোনো বক্তব্য দিই না। আপনি আমাদের পিআরও মো. আহসান উল্লাহ শরিফীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।”
পরে পিআরও মো. আহসান উল্লাহ শরিফীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রশ্নগুলো লিখিত আকারে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে বলেন। পরে অভিযোগগুলো লিখিত আকারে তার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
প্রকিউরমেন্ট বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (স্টোর ও প্রকিউরমেন্ট) মিলন আল-মামুনের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, “আমি এর সঙ্গে জড়িত নই। এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।”
অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পিএস মো. জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলো শোনার পর পরে ফোন করবেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে আর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চলমান ম্যানুয়াল দরপত্র প্রক্রিয়া স্থগিত করে নতুন করে ই-জিপি পোর্টালের মাধ্যমে টেন্ডার আহ্বান করা এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক
এমএসএম / এমএসএম
ই-জিপি ছাড়াই, মেট্রোরেলের টেন্ডার
প্রকৌশল বিভাগে ঘুষের বিনিময়ে পদোন্নতির অভিযোগ
রাজধানীর গুলশান-বনানী স্পা সেন্টারের আড়ালে ভয়ঙ্কর অপরাধীদের আখঁড়া
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলমের সম্পদের ‘বিস্ময়কর’ উত্থান
বেনজীর ইউরোপের কোন দেশে পালানোর চেস্টা করছেন
ভুয়া ডি-নোট বিতর্কে রুহুল আমিন বহাল, অফিস সহায়ক ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে
লোভনীয় পদায়নে বারবার আলোচনায় নাজমুল হাসান
জাতীয় গৃহায়ণে জালজালিয়াতি ও দুর্নীতি করে প্রাইজপোস্টিংয়ের অভিযোগ
দরকষাকষি করে ঘুষ নেন স্টেশন কর্মকর্তা নাজমুল
বন মামলার নথি বদল
ত্রাণের টিন সরবরাহে অনিয়ম!
বদলির ফাঁদে পার্বত্যের প্রাথমিক শিক্ষকরা