মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি
নিরাপত্তা ঘাটতি, ক্ষতিপূরণহীন পরিবার আর অপূর্ণ সুপারিশ
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি। নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি, ভবন নির্মাণের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন—সব মিলিয়ে এক বছর পরও কাটেনি অনিশ্চয়তা।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানটি স্কুলের হায়দার আলী ভবনের সিঁড়ির ঠিক বাম পাশে আঘাত হানে। এতে ভবনের বাম অংশে আগুনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি ছিল। দুর্ঘটনার পরপরই সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, দিয়াবাড়ি মেট্রোরেলের ফায়ার ফাইটিং ইউনিট এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তদন্তে উঠে আসে, ক্ষতিগ্রস্ত হায়দার আলী ভবনে ছিল মাত্র একটি সিঁড়ি। অথচ ভবনের আয়তন ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিবেচনায় সেখানে অন্তত তিনটি সিঁড়ি থাকা প্রয়োজন ছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি থাকলে প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতো।
অনুমোদনহীন ভবনের অভিযোগ
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ওই ক্যাম্পাসের অর্ধেকের বেশি ভবন প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, ভবনের অনুমোদনসংক্রান্ত নথিপত্র দুর্ঘটনার আগুনে পুড়ে গেছে।
তদন্ত কমিশনের সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান সাংবাদিকদের বলেন, বিমানবন্দরের ফ্লাইং জোনে নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণের বিধান থাকলেও তা কার্যকর না হওয়াটা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, অনুমোদিত ও অনুমোদনহীন ভবনসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা কলেজ কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষও সেগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
চিকিৎসায় দীর্ঘ লড়াই
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন সাংবাদিকদের জানান, দুর্ঘটনার পর ৫৭ জন রোগী বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে ১১ জনের শরীরের ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে গিয়েছিল।
তিনি জানান, অধিকাংশ রোগী আগুনে দগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি ইনহেলেশন বার্নে আক্রান্ত হন। ভবনের ভেতরে আটকে থাকায় ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে, যা অনেকের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।
বাস্তবায়ন হয়নি ক্ষতিপূরণের সুপারিশ
তদন্ত কমিশন নিহত ও আহতদের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ প্রণয়নের সুপারিশ করেছিল। সুপারিশ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী নিহত শিশুদের পরিবারকে এক কোটি টাকা এবং প্রাপ্তবয়স্ক নিহতদের পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল।
আহতদের ক্ষেত্রেও ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী শিশুদের জন্য ১৫ থেকে ৬০ লাখ টাকা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করা হয়।
তবে দুর্ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর।
ভুক্তভোগী পরিবারের ক্ষোভ
দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাভিদ নাওয়াজ দীপ্তের শরীরের ৫২ শতাংশ পুড়ে যায়। টানা ৯৭ দিন চিকিৎসার পর হাসপাতাল থেকে ফিরলেও এখনও তাকে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
দীপ্তর বাবা মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, এই দুর্ঘটনা তাঁদের পরিবারের জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। চিকিৎসা, যাতায়াত ও পুনর্বাসনের ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে।
নিহত শিক্ষার্থী তাসনিয়া হকের বাবা নাজমুল হক সাংবাদিকদের বলেন, সন্তানের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ চাওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও সরকার ঘোষিত সহায়তা পাওয়ার আশায় তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছেন। বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ পাননি।
তাঁর অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা এবং আহতদের ৫ লাখ টাকা করে সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে অধিকাংশ পরিবার তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
চিকিৎসা ব্যয় নিয়েও অনিশ্চয়তা
তদন্ত কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, আহতদের চিকিৎসার জন্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটকে অতিরিক্ত বাজেট দেওয়ার কথা ছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলতি অর্থবছরের নতুন বাজেটে মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার জন্য পৃথক কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি।
তদন্ত কমিশনের সদস্য অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান সাংবাদিকদের বলেন, হতাহতদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিয়ে কমিশনের সুস্পষ্ট সুপারিশ রয়েছে। রাষ্ট্রের উচিত প্রতিবেদনটি পুনরায় পর্যালোচনা করে দ্রুত তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া।
নীরব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়
তদন্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানতে বর্তমান সরকারের একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র ডিরেক্টর রাশেদ খান মেননের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দৈনিক সকালের সময়কে বলেন, “আপনি একাডেমিতে এসে সিনিয়রদের কাছ থেকে বক্তব্য নেন। এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না।”
এক বছর পরও প্রশ্ন
এক বছর পেরিয়ে গেলেও মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি, ভবন নির্মাণ ও অনুমোদনসংক্রান্ত প্রশ্ন, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়গুলো এখনো আলোচনায়।
তদন্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি কেবল একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার স্মৃতি হয়েই থাকবে না; বরং এটি নগর নিরাপত্তা, ভবন ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় বিদ্যমান দুর্বলতারও একটি বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে।
এমএসএম / এমএসএম
নিরাপত্তা ঘাটতি, ক্ষতিপূরণহীন পরিবার আর অপূর্ণ সুপারিশ
সার সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ল বিএডিসির
নদী বন্দর শাখার সাবেক পরিচালক এ.কে এম আরিফ উদ্দিন নারী কেলেঙ্কারিতে বরখাস্ত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যেই অন্য বিভাগে পদায়ন
ই-জিপি ছাড়াই, মেট্রোরেলের টেন্ডার
প্রকৌশল বিভাগে ঘুষের বিনিময়ে পদোন্নতির অভিযোগ
রাজধানীর গুলশান-বনানী স্পা সেন্টারের আড়ালে ভয়ঙ্কর অপরাধীদের আখঁড়া
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলমের সম্পদের ‘বিস্ময়কর’ উত্থান
বেনজীর ইউরোপের কোন দেশে পালানোর চেস্টা করছেন
ভুয়া ডি-নোট বিতর্কে রুহুল আমিন বহাল, অফিস সহায়ক ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে
লোভনীয় পদায়নে বারবার আলোচনায় নাজমুল হাসান
জাতীয় গৃহায়ণে জালজালিয়াতি ও দুর্নীতি করে প্রাইজপোস্টিংয়ের অভিযোগ
দরকষাকষি করে ঘুষ নেন স্টেশন কর্মকর্তা নাজমুল