বেবিচকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরউদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়: পদ আঁকড়ে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিভিল এভিয়েশন অথরিটি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ এইচ এমডি নুরউদ্দিন চৌধুরী একই সাথে দুই পদে দীর্ঘদিন দায়িত্বে থেকে নানা দুর্নীতি অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর ধরে একই পদে থেকে, দ্বৈত দায়িত্ব পালন, নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়াসহ কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির মাধ্যমে নয়-ছয় করছেন। আর এজন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও বেবিচকের কর্মকর্তীদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা একটানা তিন বছরের বেশি একই পদে থাকতে পারেন না। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ এইচ এমডি নুরউদ্দিন চৌধুরী সেই বিধি ভেঙে প্রায় ছয় বছর ধরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করছেন। আবার একই সঙ্গে তিনি প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন, যা সরকারি নিয়মে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। শুধু তাই নয়, কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বেবিচক এর অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, প্রকৌশলী নুরউদ্দিন নিয়মিত টেন্ডার আহ্বান করলেও তার পছন্দের ঠিকাদার কোম্পানি লোয়েস্ট না হলে টেন্ডার বাতিল করে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করেন। গত জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত সাতটি টেন্ডার এমনভাবে বাতিল করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি টেন্ডার থেকে তিনি ১০ শতাংশ কমিশন নেন। এইভাবে তিনি শতাধিক কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। শুধু তাই নয়, একজন এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার অভিযোগ করে বলেন, নুরুদ্দিনকে টেন্ডার বাদ না দিয়ে ইভুলেশন করতে বলা হলে তিনি তাকে বদলির হুমকি দেন।
তিনি রাজনৈতিক প্রভাব ও দোসর ঠিকাদাদের আস্তাভাজন নুরউদ্দিন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ঘরানার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তার বিশেষ পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। এই রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে নুরউদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস পাচ্ছেন না সংশ্লিস্ট কর্তৃপক্ষ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জানান, চিফ ইঞ্জিনিয়ার বদলির ফাইল প্রস্তাব করলেও সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। বর্তমান চেয়ারম্যানের কাছে ফাইল উপস্থাপন করতেই সাহস পাচ্ছেন না প্রশাসনিক সদস্যরা। ফলে নুরউদ্দিন এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে তারই সহকর্মীরা ক্ষাভ প্রকাশ করছেন। ক্যাব-এর বহু কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেছেন, নুরউদ্দিন টাকার জোরে প্রশাসনিক উচ্চপদস্থদেরও নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে প্রশাসনিকভাবে তাকে বিপদে ফেলার ভয় দেখিয়ে আসছেন। এ কারণে দুর্নীতির প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
সূত্র জানায়, হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পদে পরিবর্তন করে গত বছরের এপ্রিল মাসে মন্ত্রণালয়ের সভায় প্রকৌশলী এ এইচ এমডি নুরুদ্দীন চৌধুরীকে থার্ড টার্মিনালের প্রকল্প পরিচালক পদে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত হয়।
প্রকৌশলী নুরুদ্দীনের নিয়োগ প্রসঙ্গে বেবিচকের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খুবই অল্প সময়ের মধ্যে এই নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনিয়রটি লংঘন করা হয়েছে। গোয়েন্দাসংস্থা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনেরও (দুদক) অনাপত্তি নেয়া হয়নি। আর গত ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর এ, কে,এম মাকসুদুল ইসলামের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল হওয়ার পর তাকে থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের পিডি করা হয়। নতুন পিডি নিয়োগে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। পিডি নিয়োগের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এবং দুদকের ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়। এ দুটি ছাড়পত্র পেতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। পরবর্তীতে প্রায় তিন মাস পর প্রকৌশলী জাকারিয়া হোসেনকে পিডি হিসেবে নিয়োগ করা হয়। জাকারিয়া হোসেনকে পিডি’র পাশাপাশি প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দ্বায়িত্বও দেয়া হয়। এছাড়াও থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের পিডি হিসেবে প্রকৌশলী শুভাশিষ বড়ুয়া, মো. শরিফুল ইসলাম ও এ. এইচ. এমডি নুরউদ্দিন চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্র জানায়, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় সংস্থাটি। আর তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের সাবেক পরিচালক এ. কে. এম. মাকসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ৭ হাজার কোটি টাকার প্রাক্কলিত প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ২২ হাজার কোটি টাকা করা হয়। যা বিভিন্ন সরঞ্জাম স্থানীয়ভাবে কিনে বিদেশ থেকে কেনা দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং মাটি পরীক্ষায় অনিয়ম ও নকশা পরিবর্তন করে ৯০০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগের অনুসন্ধানে নামে দুদক। গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদক কার্যালয়ে সংস্থাটির মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন এক ব্রিফিংয়েও এ তথ্য সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
এ ছাড়া প্রকল্পের তিনটি বড় কাজ অন্য ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে কমিশন বাণিজ্য, দরপত্রে ইউরোপীয় মানের যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জামের নাম বলে চীন ও কোরিয়ার নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জামাদি সংযোজন, সিলিংয়ের কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্য অযৌক্তিক কাজ করে ১২ কোটি টাকা অপচয়সহ সিন্ডিকেট করে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টর বলছেন, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে কোনো কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই পদে বহাল থাকলে প্রশাসনিক কাঠামোয় অস্থিরতা তৈরি হয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। আবার অনেকেই বলছেন, এটি শুধু দুর্নীতি নয়, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। একাধিক সহকর্মী ও ভুক্তভোগিরা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’র দৃষ্টি আকর্ষণ করে অবিলম্বে তদন্ত পূর্বক তাকে অপসারণ ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিভিল এভিয়েশন অথরিটি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ এইচ এমডি নুরউদ্দিন চৌধুরীর সেল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তার ফোনটি রিসিভ করেননি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ক্ষুদে বার্তা প্রেরণ করা হলেও তিনি তার প্রত্যুত্তর দেননি।
এমএসএম / এমএসএম
বেবিচকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরউদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়: পদ আঁকড়ে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ
নিরাপত্তা ঘাটতি, ক্ষতিপূরণহীন পরিবার আর অপূর্ণ সুপারিশ
সার সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ল বিএডিসির
নদী বন্দর শাখার সাবেক পরিচালক এ.কে এম আরিফ উদ্দিন নারী কেলেঙ্কারিতে বরখাস্ত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যেই অন্য বিভাগে পদায়ন
ই-জিপি ছাড়াই, মেট্রোরেলের টেন্ডার
প্রকৌশল বিভাগে ঘুষের বিনিময়ে পদোন্নতির অভিযোগ
রাজধানীর গুলশান-বনানী স্পা সেন্টারের আড়ালে ভয়ঙ্কর অপরাধীদের আখঁড়া
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলমের সম্পদের ‘বিস্ময়কর’ উত্থান
বেনজীর ইউরোপের কোন দেশে পালানোর চেস্টা করছেন
ভুয়া ডি-নোট বিতর্কে রুহুল আমিন বহাল, অফিস সহায়ক ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে
লোভনীয় পদায়নে বারবার আলোচনায় নাজমুল হাসান
জাতীয় গৃহায়ণে জালজালিয়াতি ও দুর্নীতি করে প্রাইজপোস্টিংয়ের অভিযোগ