ঢাকা রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

নিয়োগবিধি জটিলতায় জনবল সংকট, বিপাকে রেল


এসএম পিন্টু photo এসএম পিন্টু
প্রকাশিত: ২১-৬-২০২৬ দুপুর ১:২৭

নিয়োগবিধি জটিলতায় তীব্র জনবল সংকটে ভুগছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন খাত বাংলাদেশ রেলওয়ে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে রেলের গুরুত্ব দিন দিন বাড়লেও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগে দীর্ঘসূত্রিতা, নিয়োগবিধি সংশোধনের জটিলতা এবং কর্মী ধরে রাখতে ব্যর্থতা প্রতিষ্ঠানটিকে ক্রমেই একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি ও বিপর্যয়ের আশঙ্কায় পড়েছে সরকারি এই সেবা সংস্থাটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে জনবল কাঠামো অনুযায়ী ৪৭ হাজার ৬৩৭ জন কর্মরত থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ২৪ হাজার। অর্থাৎ ৫০ শতাংশ পদই শূন্য। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পদে নিয়োগ কার্যক্রম স্থবির থাকায় এই শূন্যতা তৈরি হয়েছে। আর এই শূন্য পদ নিয়ে বেকায়দায় আছে রেল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে লোকোমোটিভ/ইঞ্জিন মেইনটেন্যান্স সেকশন। এই শাখায় ৭৫ শতাংশ পদ শূন্য, আছে মাত্র ২৫ শতাংশ। এমন শূন্যতা রেলের অনেক দপ্তরেই আছে। এর অন্যতম কারণ বিদ্যমান নিয়োগবিধি সংশোধনের প্রক্রিয়া। আবার কিছু ছোট পদের বিপরীতে শিক্ষিত প্রার্থী আহবান করায় কাজে দক্ষরা পরীক্ষায় টিকছে না আর যারা টিকছে তারা বেশিরভাগই অন্যত্র ভালো সুযোগ পাওয়ায় যোগদান করছে না। আবার যোগদান করেও অনেকে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে জনবল ঘাটতি দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে।
জানা যায়, আগে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী (খালাসি, ওয়েম্যান, পোর্টার) নিয়োগের ক্ষেত্রে ৮ম শ্রেণি পাস হলেই চলতো, লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হতো না, ভাইবাতে দেখা হতো শারীরিক পরিশ্রম করার দক্ষতা আছে কি না। সেই যোগতায় নিয়োগ দিলে তারা কাজ করতে পারতো। কিন্তু বর্তমানে এসব পদে এসএসসি পাস এবং লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।  ফলে এই পদের জন্য উচ্চ শিক্ষিত লোকেরা আবেদন করছেন আর কম শিক্ষিত কিন্তু কাজে দক্ষ এমন লোকেরা তাদের সাথে পরীক্ষায় টিকতে না পেরে শিক্ষিতরাই লেবারের পদগুলো পেয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে শিক্ষিত ছেলেরা চাকরি পেলেও অনেকেরই যোগদান করতে আগ্রহ থাকে না, আবার যোগদান করলেও বেটার চান্স পেয়ে অনেকে চাকরী ছেড়ে চলে যাচ্ছে বলে শূন্যতা পুরণ করা যাচ্ছে না। ফলে রেলের বিভিন্ন দপ্তর থেকে অনেক খালাসি চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে সহকারী স্টেশন মাস্টার (এএসএম) পদের জন্য বিএ পাস, সহকারী লোকো মাস্টার (এএলএম) পদের জন্য বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস বাধ্যতামূলক আছে। কিন্তু বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় উচ্চ শিক্ষিত প্রার্থীরা এসব পদে অংশ নিয়ে টিকে যান। ফলে নিয়োগপত্র পেয়েও অনেক প্রার্থী চাকরিতে যোগ দেননি। আবার যোগ দিয়েও অনেকে অন্যত্র আরো ভালো চাকরি নিয়ে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। 
বিগত ২০২২ সালে ৫৮৭ জন সহকারী স্টেশন মাস্টারকে (এএসএম) চুড়ান্ত নিয়োগ দিলেও যোগদান করেছে মাত্র ৩৫২ জন, যোগদান করেননি ২২৫ জন। আবার যোগ দিয়েও চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন আরো ১৬২ জন। অন্যদিকে ২০২৫ সালে ৩৫৩ জন সহকারী লোকো মাস্টারের (এএলএম) বিপরীতে যোগ দিয়ে চাকরি ছেড়েছে ৪৫ জন। পরে যদিও ৩ ধাপে ওয়েটিং লিস্টের বরাত দিয়ে আরো ৪৫ জনকে নিয়োগ দিয়েছে। শুধু এগুলোই নয়, রেলের বিভিন্ন দপ্তরে এমন ঘটনা অহরহ। ফলে তাদের নিয়োগ ও ট্রেনিং বাবদ রেলের সময় ও অর্থে অপচয় হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে ওয়েটিং লিস্টের নামে যাদের দেওয়া হচ্ছে সেখানে দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ ওয়েটিং লিস্ট কোথাও সংরক্ষণ করা হয়নি বলেও সূত্রের দাবি।   
শুধু তাই নয়, রেলওয়ের বিভিন্ন কারিগরি, অপারেশনাল এবং প্রশাসনিক পদে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের স্থলাভিষিক্ত করার মতো নতুন জনবল সময়মতো নিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অভিজ্ঞ কর্মীদের অবসরের কারণে যে শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে তা পূরণ করা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে একাধিক পদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে কাজের চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও বিলম্ব দেখা দিচ্ছে।
এবিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র লোকো মাস্টার এমআর মনজু বলেন, একজন কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং মাঠপর্যায়ে দক্ষ করে তুলতে উল্লেখযোগ্য সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। কোনো কর্মী অল্প সময়ের মধ্যে চাকরি ছেড়ে দিলে সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না। ফলে প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। বর্তমানে রেলের বিভিন্ন বিভাগে এমন পরিস্থিতি প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পতিত বিগত সরকারের আমলে চাপিয়ে দেওয়া ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ বিধি ও পদ্ধতি -২০২০ এর মাধ্যমে পিএসসি কর্তৃক নিযুক্ত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর বিভিন্ন পদে ওভার কোয়ালিফাইড লোক নিযুক্ত হওয়ার কারণে তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ট্রেনিং  শেষ করে অথবা ট্রেনিং এর মধ্যবর্তী সময় চাকুরী ছেড়ে যাওয়ার কারণে দক্ষতার অপচয়, সরকারের আর্থিক অপচয়, লোকবল সংকট জারি থাকা সহ বহুবিধ সমস্য সৃষ্টি হচ্ছে। আবার ওয়েটিং লিস্ট থেকে কথিত প্যানেল নিয়োগ দেয়া হচ্ছে, এই প্রক্রিয়াতে স্বচ্ছতার উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই রেলকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে নিয়োগবিধি ও পদ্ধতি ২০২০ দ্রুত সংশোধন করে নতুন বিধি ও পদ্ধতিতে নিয়োগের মাধ্যমে উদ্ভূত সংকট সমাধান করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রেলওয়ের অপারেশনাল কার্যক্রমে এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। স্টেশন ব্যবস্থাপনা, ট্রেন পরিচালনা, সিগন্যালিং, লোকোমোটিভ রক্ষণাবেক্ষণ, ট্র্যাক মেইনটেন্যান্সসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় কর্মীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি ভুলের ঝুঁকিও বাড়ছে। নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একই সময়ে দুই বা ততোধিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জীবনেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে কর্মীদের মধ্যে মানসিক চাপ ও ক্লান্তি বাড়ছে, যা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রেলের জনবল সংকট শুধুমাত্র নিয়োগের সংখ্যা বাড়িয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাস্তবমুখী ও যুগোপযোগী নিয়োগবিধি। কোন পদে কী ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন, কোন পদে কর্মী ধরে রাখার জন্য কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত এবং কীভাবে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়, এসব বিষয় নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে।
এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনার অভাবও বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে। প্রতিবছর কতজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে যাবেন, কোন বিভাগে কতজন নতুন কর্মী প্রয়োজন হবে এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য কী পরিমাণ জনবল দরকার হবে, এসব বিষয়ে আগাম পরিকল্পনা থাকলে সংকট অনেকাংশে কমানো সম্ভব হতো।
রেল খাতের উন্নয়নে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। নতুন রেললাইন, আধুনিক স্টেশন, উন্নত কোচ ও ইঞ্জিন সংযোজনের মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটলেও প্রয়োজনীয় জনবল ছাড়া এসব বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন। অবকাঠামো যত আধুনিকই হোক, তা পরিচালনার জন্য দক্ষ ও পর্যাপ্ত জনবল অপরিহার্য।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নিয়োগবিধি সংশোধনের জটিলতা দ্রুত নিরসন, শূন্য পদে জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ, অবসরপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ জনবলের বিকল্প তৈরির পরিকল্পনা এবং কর্মী ধরে রাখার কার্যকর কৌশল গ্রহণ না করলে আগামী দিনে রেলের জনবল সংকট আরও তীব্র হতে পারে। আর সেই সংকটের প্রভাব পড়বে ট্রেন পরিচালনা, যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর।
এবিষয়ে জানতে চাইলে জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, জনবল নিয়োগের বিষয়ে সরকারের একটা সিদ্ধান্ত আছে, আমরা আস্তে আস্তে বাস্তবায়ন করার পথে এগুচ্ছি। নিয়োগকার্যক্রম চলমান আছে, সামনে আরো নিয়োগ দেওয়া হবে। বিধি সংশোধনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।
দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় রেলকে আরও কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে হলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় উন্নয়নের চাকা যতই এগিয়ে যাক, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে সেই অগ্রযাত্রা কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে।

এমএসএম / এমএসএম

উল্লাপাড়ায় বস্তায় আদা চাষ প্রদর্শনীর মাঠ দিবস, চারা বিতারণ ও বৃক্ষ রোপন অনুষ্ঠিত

রাজস্থলী থানার জাম পাড়তে উঠে পড়ে এক পুলিশ সদস্য আহত

সীমান্তের শূন্যরেখায় আটদিন ধরে মানবেতর জীবন, অনিশ্চয়তায় পাঁচ যুবক

পত্নীতলায় ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক

গোপালগঞ্জে বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মান রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন

ফটিকছড়িতে পানিতে ডুবে ৩ বছরের শিশুর মৃত্যু: এলাকায় শোকের ছায়া

জনগণের টাকায় কোনো ধরনের নিম্নমানের কাজ বরদাস্ত করা হবে না: আনোয়ারুল হক এমপি

ছাতকে মাদকবিরোধী ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

ফরিদপুর মধুখালীতে বাক প্রতিবন্ধী এক নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে

শ্রীবরদীতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

প্রেমে মজেছে দুজন- গ্রেপ্তারে একজন, নেপথ্যে প্রেমিকার বয়স কম

নন্দীগ্রামে থানায় আসার পথে প্রতিপক্ষের হামলা' পুলিশের প্রতি ক্ষোভ

ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে ছাত্র লীগ কর্মীর মৃত্যু