ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

শাহানাজ শিউলী

বাবার হুইল চেয়ার


সাহিত্য ডেস্ক photo সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ২০-৭-২০২৬ রাত ৯:৬
অফিস থেকে ফিরেই ‘রানু রানু’ করে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢোকে আদি।
“রানু, চা কই? জলদি নিয়ে এসো।”
অফিস থেকে ফিরে রানুর হাতের এক কাপ চা না খেলে আদির ক্লান্তি কাটে না, স্বস্তি পায় না। বারান্দায় বসে চা খাওয়া আর খবরের কাগজ পড়া তার বহু পুরোনো অভ্যাস। আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না।
চায়ের কাপে চুমুক দিতেই চোখ পড়ল হুইলচেয়ারটার দিকে। বারান্দার এক কোণে ধুলোবালি মেখে পড়ে আছে সেটি। আদি চায়ের কাপটা রেখে চেয়ারটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। একটা পরিষ্কার কাপড় বের করে পরম যত্নে সেটি মুছতে লাগল। চেয়ারের গায়ে আলতো হাত বুলাতেই তার মনে হলো সে যেন তার বাবাকেই স্পর্শ করছে। এক তীব্র অনুভূতিতে সমস্ত শরীর শিউরে উঠল তার। বারবার হুইল চেয়ারটাকে আদর করল সে। বুকের ভিতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। নিজের অজান্তেই অশ্রু গড়িয়ে পড়ল চেয়ারটার ওপর।
রানু দূর থেকে লক্ষ্য করছিল। সে আলতো পায়ে এসে আদির কাঁধে হাত রাখল। আদি আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে; রানুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল, “আজ কেন জানি বাবাকে খুব মনে পড়ছে রানু! বুকের ভেতরটা শূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে।”
রানু তাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। এমন সময় তাদের চার বছরের একমাত্র সন্তান রিয়াদ ‘মা মা’ করে ডাকতে ডাকতে সেখানে এলো।
আদির বাবা রায়হান সাহেব ছিলেন একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান সরকারি কর্মকর্তা। একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তিনি পঙ্গুত্ব বরণ করেন। তারপর থেকে আর কখনো কথা বলতে পারেননি; শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতেন আদির দিকে।
আজ আদির মনের জানালায় সব স্মৃতি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে। বাবা যখন সুস্থ ছিলেন, অফিসে যাওয়ার সময় আদি প্রতিদিন চকলেট আর আইসক্রিমের বায়না ধরত। রায়হান সাহেব শত ব্যস্ততার মাঝেও কখনো তা আনতে ভুলতেন না। বিকেলে বাবার ফেরার সময় হলে পথের দিকে চেয়ে থাকত আদি। বাবা এলেই দৌড়ে যেত, আর বাবাও পরম মায়ায় আদিকে কাঁধে তুলে নিয়ে ঘরে ফিরতেন। রায়হান সাহেব যখন রাতে খেতে বসতেন, আদিকে সাথে নিতেন। বাবার হাতের একগাল ভাত না খেলে আদির যেন পেটের খিদে মিটত না। বাবার মাখানো সেই ভাতই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে অমৃত খাবার।
বাবাই ছিল আদির জীবনের শ্রেষ্ঠ আদর্শ, পুরো পৃথিবী। নিজের কষ্টের কথা বিন্দুমাত্র না ভেবে তিনি আদির সব আবদার পূরণ করতেন। শত বিপদেও বটবৃক্ষের মতো ছায়া হয়ে আগলে রাখতেন পরিবারকে। আজ স্মৃতির আয়নায় সেইসব দিনের কথা ভেসে উঠলো আদির। চিৎকার করে বাবাকে বারবার ডাকতে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার।
এমন সময় রিয়াদ ‘বাবা বাবা’ করে আদির কোমর জড়িয়ে ধরল। আদি দ্রুত চোখের পানি মোছার চেষ্টা করল।
রিয়াদ মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা, চলো ভাত খাবে না? আমাকে পাশে বসিয়ে খাইয়ে দেবে না? আমার খুব খিদে পেয়েছে! আর হ্যাঁ, কাল অফিস থেকে
আসার পথে আমার জন্য চকলেট-আইসক্রিম এনে দিও কিন্তু।”
আদি চমকে উঠল। সে ছোটবেলায় যা করত, রিয়াদ আজ ঠিক তা-ই করছে। আদি নিজে বাবা হওয়ার পর বুঝেছে—বাবা কী জিনিস, বাবার ভালোবাসা কাকে বলে। আজ বাবা নেই, পড়ে আছে কেবল শূন্য হুইল চেয়ারটা। আদির মনে হয়, তার নিজের অস্তিত্বের শিকড় যেন জড়িয়ে আছে ওই চেয়ারটার সাথে। তাই সে প্রতিনিয়ত চেয়ারটি যত্নে আগলে রাখে; কারণ হুইল চেয়ারটির বুকেই আদি খুঁজে পায় বাবার সেই চিরচেনা পবিত্র পরশ, যা তাকে মনে করিয়ে দেয়—বাবারা কখনো হারিয়ে যায় না, তারা বেঁচে থাকে সন্তানের অস্তিত্বে। হুইল চেয়ারটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আদি।
 

শান্তা / শান্তা