ঢাকা রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬

চট্টগ্রামের ডিসি পদের জন্য ৬৯ কোটির চুক্তি সালাহউদ্দিনের!


এসএম পিন্টু photo এসএম পিন্টু
প্রকাশিত: ২-৮-২০২৬ দুপুর ১২:৫৬

সরকারি চাকরি বিধিমালার তোয়াকা না করে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদ পেতে ৬৯ কোটি টাকা পরিশোধের চুক্তি হিসেবে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) কন্ট্রোলার অব স্টোর্স মো. সালাহউদ্দিন আহমেদ। পদায়ন হওয়ার আগেই ব্যাপক দুর্নীতির ছক তৈরি করছেন এই সিন্ডিকেট। সরকারি পদ যেন দায়িত্ব নয়, একটি টাকা কামানোর মেশিন বানাতে চাইছেন এই চক্রটি। কথা প্রসঙ্গে বিষয়টি স্বীকারও করেছেন এই কর্মকর্তা।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, ডিসি পদের জন্য ঘুষের ৩০ কোটি টাকা সিন্ডিকেট ম্যানেজ করবে আর পদায়নের পর সেই টাকার দ্বিগুন অর্থাৎ ৬০ কোটি এবং সার্ভিস চার্জ বাবদ আরো ৯ কোটিসহ মোট ৬৯ কোটি টাকা পরিশোধের জন্য রাজি আছেন সালাউদ্দিন আহমেদ। আর এই টাকা যোগদানের ১৮ মাসের মধ্যেই পরিশোধ করবেন বলে অঙ্গীকারবদ্ধ তিনি।

জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ভান্ডার রক্ষক) ও বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের উপসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ স্বজ্ঞানে এমন নজিরবিহীন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। তার নিজের স্বাক্ষর করা এমন গোপন ‘সম্মতি পত্র’ ফাঁস হওয়ার পর প্রশাসন পাড়ায় তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে বসার জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ ও লবিং শুরু করেছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তবে এই লবিং তিনি নিজে বা প্রশাসনিক নিয়মের মধ্যে থেকে না করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। কাঙ্ক্ষিত পদায়ন নিশ্চিত করতে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৪৫ কোটি টাকা অনৈতিক ঋণ বা ফান্ড গ্রহণের জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন এই কর্মকর্তা। মূলত ডিসি পদের মতো সংবেদনশীল চেয়ার আর্থিক চুক্তি ও লিয়াজোঁর মাধ্যমে ‘কেনার’ এই মিশন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।

ফাঁস হওয়া ওই সম্মতি পত্রটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের ২৯ মার্চ সালাহউদ্দিন আহমেদ (যার পরিচিতি নম্বর ১৬৫২১) অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে নিজের পদ ও ব্যাচ উল্লেখ করে লিখিত ঘোষণা দিয়েছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম পদে তাকে পদায়ন করা হলে উক্ত পদে যোগদান করতে তার কোনো আপত্তি নেই। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন আগাম এবং প্রকাশ্য সম্মতি পত্র দেওয়ার ঘটনা প্রশাসনিক রেওয়াজে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন।

তবে এই চিঠির সবচেয়ে বিস্ফোরক এবং আপত্তিকর অংশটি রয়েছে এর দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে। সেখানে সালাহউদ্দিন আহমেদ লিখেছেন, ”জনাব মো. হাবিবুর রহমান, পিতা: মো. আবদুল মজিদ, মাতা: নুর জাহান বেগম, যার স্থায়ী ঠিকানা পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার বগা বন্দর এলাকায়”। তিনি তার পরিচিত ব্যক্তি। এরপর ওই কর্মকর্তা চিঠিতে লিখেছেন, ”আমার পক্ষ হয়ে উপরোক্ত বিষয়ের (অর্থাৎ চট্টগ্রাম জেলার ডিসি পদে পদায়ন) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমি স্বেচ্ছায় সম্মতি প্রদান করলাম”। একজন প্রথম শ্রেণীর ক্যাডার কর্মকর্তা কিভাবে সরকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে একজন তৃতীয় পক্ষ বা সাধারণ ব্যবসায়ীকে লিখিতভাবে যোগাযোগের ক্ষমতা অর্পণ করতে পারেন, তা নিয়ে প্রশাসনের সচেতন মহল স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন।

সূত্র জানায়, জেলা প্রশাসক বা ‘ডিসি’ পদটি মাঠ প্রশাসনের একটি প্রভাবশালী ও মর্যাদাপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচিত। এই পদটি বাগিয়ে নিতে আমলাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকা নতুন কিছু নয়। তবে সেই প্রতিযোগিতার নামে কোটি কোটি টাকা ঘুষ প্রদানের বিষয়টি সংশ্লিষ্টদেরও অবাক করেছে। প্রচলিত আইন, সরকারি চাকরি বিধিমালা এবং নৈতিকতার সব সীমা লঙ্ঘন করে একজন সাধারণ ব্যবসায়ীকে লিখিতভাবে তদবিরের দায়িত্ব বা ‘অথরাইজেশন’ প্রদান করেন, তবে তা পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দেয় বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

আইন ও সরকারি চাকরি বিধিমালা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উপসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের এই কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ বেআইনি এবং বড় ধরনের অপরাধ। প্রথমত, সরকারি চাকরিতে বদলি ও পদায়ন সম্পূর্ণভাবে সরকারের এখতিয়ার এবং এটি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কোনো কর্মকর্তা নিজে থেকে কোনো নির্দিষ্ট জেলায় ডিসি হওয়ার জন্য আগাম ‘আপত্তি নেই’ মর্মে সম্মতি পত্র বা আবেদনপত্র জমা দিতে পারেন না। এটি ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর বিধি: ১১ এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। যেখানে বলা হয়েছে, ”কোনো সরকারি কর্মচারী তার চাকরি সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে কোনো ধরনের অনৈতিক লিখিত বা মৌখিক তদবির করতে পারবেন না। এছাড়া এই আচরণ ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ বা মিসকন্ডাক্ট হিসেবে গণ্য, যার চূড়ান্ত শাস্তি চাকরি থেকে স্থায়ী বরখাস্ত।

দ্বিতীয়ত, একজন সরকারি কর্মকর্তার পদায়ন বা দাপ্তরিক যোগাযোগের জন্য কোনো সাধারণ নাগরিক বা ব্যবসায়ীকে ‘অথরাইজ’ বা লিয়াজোঁ নিয়োগ করার কোনো আইনি সুযোগ বাংলাদেশের কোনো বিধিতে নেই। একজন ব্যবসায়ীকে মন্ত্রণালয়ের সাথে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে লিয়াজোঁর দায়িত্ব দেওয়া এবং এর বিনিময়ে ৪৫ কোটি টাকার অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের চেষ্টা চালানো ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭’ এবং ‘দণ্ডবিধি, ১৮৬০’-এর ১৬১ ও ১৬৫ ধারা অনুযায়ী সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ, যা ঘুষ বা অবৈধ পারিশ্রমিক গ্রহণের চেষ্টার শামিল। একই সাথে এটি সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৯৭-এর বিধি:৩০ এর পরিপন্থী, যা কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে বাহ্যিক কোনো ব্যক্তি বা মাধ্যমের দ্বারা নিজের চাকরিগত সুবিধা হাসিলের চেষ্টা করা থেকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, এই সম্মতি পত্রটি আমলাতান্ত্রিক শিষ্টাচার, পেশাদারিত্ব এবং দেশের প্রচলিত আইনের প্রকাশ্য অবমাননা। একজন দায়িত্বশীল উপসচিবের কাছ থেকে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এর পেছনে থাকা গভীর আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্ত হওয়া জরুরি।

এবিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (ভান্ডার রক্ষক বা  কন্ট্রোলার অব স্টোরস এর দায়িত্বপ্রাপ্ত) সালাহউদ্দিন আহমেদ তার সম্মতিপত্রের কথা স্বীকার করে বলেন, কয়েকজন লোকের একটি সিন্ডিকেট এসব কাজ করে থাকে, তাই আমিও ভালো কোন জায়গায় পোস্টিং পেতে চেষ্টা করেছি । 

উল্লেখ্য, সালাহউদ্দিন আহমেদ বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের ভান্ডার বিভাগের কন্ট্রোলার অব স্টোরস পদে কর্মরত আছেন। এর আগে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর তাকে চট্টগ্রাম বন্দরে বদলি করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বন্দরের এই লোভনীয় ও প্রভাবশালী পোস্টিং বাগিয়ে নেওয়ার পেছনেও মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হাত ছিল। বন্দরে যোগদানের পর থেকেই তিনি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা চট্টগ্রামের ডিসি হওয়ার জন্য কোটি কোটি টাকার এই মিশন শুরু করেন।

 

এমএসএম / এমএসএম

ভবদহ অধ্যুষিত মুক্তেশ্বরী নদীর বেড়িবাঁধ ধ্বসে গিয়ে নতুন করে ৫ গ্রাম প্লাবিত

লাকসামে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে জামায়াতের গণমিছিল ও সমাবশে

চরফ্যাশন-মনপুরাকে পরিবেশবান্ধব পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে : নুরুল ইসলাম নয়ন

জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে টালবাহানা সহ্য করা হবে না: মাওলানা আমিনুল ইসলাম

পাসওয়ার্ড জটিলতায় বন্দি কুড়িগ্রাম হাসপাতালের স্বাস্থ্য সেবা: কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম অচল, দুর্ভোগে রোগীরা

নাগেশ্বরী খাদ্যগুদামে বন্দি বানভাসীদের চাল, ফেরত গেছে টিসিবির চালও

পটিয়ায় ক্লার্ক নেতা তোহা হত্যা: ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামি গ্রেপ্তারের আল্টিমেটাম, মানববন্ধন

নড়াইল জেলা সমিতি, ঢাকার হস্তান্তর, দায়িত্ব গ্রহণ ও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত

দাগনভূঞায় জায়গা সংক্রান্ত বিরোধে প্রবাসী পরিবারের উপর হামলা

সাবেক মন্ত্রী হারুনার রশিদ খান মুন্নুর স্মরণে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল

সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ; তদন্তের অগ্রগতি জানতে চায় সাংবাদিক মহল

চট্টগ্রামের ডিসি পদের জন্য ৬৯ কোটির চুক্তি সালাহউদ্দিনের!

​সুন্দরবনে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে অবৈধ শুঁটকি পল্লিতে অভিযান: মাচা ধ্বংস