ঢাকা শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সাড়ে তিন বছর আগে মৃত হেফাজের নামে দাফন হলো কার?


শাহিনুর রহমান সোনা, রাজশাহী ব্যুরো প্রধান  photo শাহিনুর রহমান সোনা, রাজশাহী ব্যুরো প্রধান
প্রকাশিত: ৫-৯-২০২৬ বিকাল ৫:২৫

সাড়ে তিন বছর আগে মারা যাওয়া এক ব্যক্তির নামে রাজশাহীর একটি গোরস্থানে সম্প্রতি দাফন করা হয়েছে একটি মরদেহ। কাগজপত্রে মৃত ব্যক্তির নাম হেফাজ উদ্দিন। তবে তার স্বজন, প্রতিবেশী ও সাবেক সহকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যু হয়েছিল ২০২৩ সালের মার্চে। তাহলে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দাফন করা মরদেহটি কার—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

ঘটনাটি ঘটে গত ২৮ জুলাই রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে রাজশাহী নগরীর টিকাপাড়া গোরস্থানে। মধ্যরাতে একটি অ্যাম্বুলেন্স ও দুটি দামি গাড়ি গোরস্থানের সামনে এসে থামে। অ্যাম্বুলেন্স থেকে কফিন নামিয়ে কয়েকজন গোরস্থানের ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় সেখানে ছিলেন নাইটগার্ড করিম ও স্থানীয় চায়ের দোকানি সিকান্দার আলী।

সিকান্দার আলীর বর্ণনা অনুযায়ী, এত রাতে দাফনের বিষয়ে জানতে চাইলে সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা জানান, মরদেহটি ভারতের কলকাতা থেকে এসেছে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই ব্যক্তি মারা যান। পথে দেরি হওয়ায় রাতে দাফন করতে হচ্ছে।

তার দাবি, অ্যাম্বুলেন্সসহ তিনটি গাড়িতে মোট চারজন ছিলেন। গোরস্থানের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, বাদশা নামে এক ব্যক্তি আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ে কবর খুঁড়ছেন।

কবর খোঁড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাদশা বলেন, তিনি বিষয়টি বিস্তারিত জানেন না। তাকে কবর খুঁড়তে বলা হয়েছে, তাই তিনি কবর খুঁড়ছেন। এর আগেও আরও দুটি কবর খোঁড়া হয়েছিল, কিন্তু সেদিন মরদেহ আসেনি।

পরে গোরস্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বারেক নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, মরদেহটি ভারতের কলকাতা থেকে আসার কথা ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা রিপনের ভাই সুলতানাবাদ জামে মসজিদের পানির পাম্পচালক মামুন এবং তার জামাই তমাল কয়েকদিন আগে এসে একটি মরদেহ দাফনের জন্য কবর প্রস্তুতের অনুরোধ করেন।

বারেকের ভাষ্য, প্রথমে নির্ধারিত সময়ে মরদেহ না আসায় কবর খোঁড়ার কাজ বন্ধ রাখা হয়। পরে ২৭ জুলাই রাতে মরদেহ আসবে বলে জানানো হলে পুনরায় কবর খোঁড়া হয়। শেষ পর্যন্ত রাত প্রায় ২টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহটি গোরস্থানে পৌঁছায়।

বারেক আরও জানান, দাফনের সময় তিনি কফিন ধরে সহযোগিতা করেন এবং মাটি দেন। তবে মরদেহের সঙ্গে আসা ব্যক্তিদের কেউ কফিনে হাত দেননি, মাটিও দেননি কিংবা কোনো দোয়া পড়তেও দেখা যায়নি। বিষয়টি তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।

কাগজপত্রে মৃতের নাম হেফাজ উদ্দিন
ঘটনার পর গোরস্থান কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দাফন করা মরদেহের পরিচয় হিসেবে হেফাজ উদ্দিনের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), সিটি করপোরেশনের তথ্য ফর্ম এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের সনদ জমা দেওয়া হয়েছে।

সিটি করপোরেশনের তথ্য ফর্মে হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যুর তারিখ ১০ জুলাই ২০২৬ এবং মৃত্যুর স্থান হিসেবে ভারতের কলকাতার মনিপাল হাসপাতাল উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তার ছেলে তৌফিক তানভীর এবং আবু জাফর তমালকে ‘নাতি’ হিসেবে সনাক্তকারী উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে তৌফিক তানভীরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বলেন, “এটা আমাদের পারিবারিক বিষয়। আপনাকে এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে আমি বাধ্য নই।”

অন্যদিকে, তথ্য ফর্মে সনাক্তকারী হিসেবে উল্লেখ থাকা আবু জাফর তমাল বলেন, তিনি ওই রাতে উপস্থিত ছিলেন এবং তৌফিক তানভীর তার বন্ধু। এর বাইরে তিনি আর কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি।

বাড়ির লোকজন বলছেন, হেফাজ মারা গেছেন কয়েক বছর আগে
কাগজপত্রে হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যুর তারিখ ১০ জুলাই ২০২৬ উল্লেখ থাকলেও তার এনআইডিতে থাকা ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যায় ভিন্ন তথ্য।

বাড়ির গার্ড সাইফুল জানান, হেফাজ উদ্দিন প্রায় তিন-চার বছর আগে মারা গেছেন। তার পেটে ঘা হয়েছিল। ঢাকায় চিকিৎসা চলছিল এবং পরে তাকে ভারতে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারতে নেওয়ার আগেই তিনি মারা যান।

সাইফুল জানান, হেফাজ উদ্দিনের স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে-জামাই বর্তমানে ঢাকায় থাকেন। হেফাজ উদ্দিনের ব্যবহৃত একটি মোবাইল নম্বরও তিনি দেন, যা বর্তমানে তার স্ত্রী ব্যবহার করেন। তবে ওই নম্বরে পরপর দুই দিন একাধিকবার ফোন করা হলেও কেউ কল রিসিভ করেননি।

হেফাজ উদ্দিনের একাধিক প্রতিবেশী ও স্থানীয় দোকানদারও জানান, তিনি আনুমানিক চার থেকে পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ২০২৩ সালে মৃত্যুর তথ্য
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি পোস্টে হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যুর তারিখ ১৭ মার্চ ২০২৩ বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। বিষয়টি নিশ্চিত করতে তার পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সহকর্মী এবং রাজশাহীতে তার বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মিন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

মিন্টু এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি। বরং তিনি বলেন, “এ বিষয় নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলে আপনার বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।”

এর কারণ হিসেবে তিনি রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতা জামাত খানের সঙ্গে হেফাজ উদ্দিনের পারিবারিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। পরে জামাত খানের সঙ্গে যোগাযোগ করে হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যুর সময় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অনেকদিন আগে তিনি মারা গেছেন। আমি তার জানাজায় উপস্থিত ছিলাম।”

হেফাজ উদ্দিন তার আত্মীয় কি না জানতে চাইলে জামাত খান বলেন, “ঐরকমই কিছুটা।”

কে ছিলেন হেফাজ উদ্দিন?
হেফাজ উদ্দিন রাজশাহীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী ছিলেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি মারা যান বলে তার সাবেক সহকর্মী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—যদি হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যু ২০২৩ সালে হয়ে থাকে, তাহলে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে তার নামে ভারতের কলকাতার একটি হাসপাতাল থেকে মরদেহ আসার তথ্য কীভাবে সরকারি তথ্য ফর্মে এলো?

আর যদি ২০২৬ সালের ১০ জুলাই হেফাজ উদ্দিন সত্যিই কলকাতার মনিপাল হাসপাতালে মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে তার প্রতিবেশী, বাড়ির গার্ড ও সাবেক সহকর্মীরা কয়েক বছর আগেই তার মৃত্যুর কথা বলছেন কেন?

কফিনে আসলে কার মরদেহ?
ঘটনার সবচেয়ে রহস্যজনক দিক হলো—মরদেহ বহনকারী কফিনটির আকৃতি নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যেও সন্দেহ তৈরি হয়। চায়ের দোকানি সিকান্দার আলীর ভাষ্য, কফিনটি অনেকটা চা পাতার বাক্স বা মুরগির বাক্সের মতো দেখতে ছিল। মাঝেমধ্যে ফাঁকা অংশ দিয়ে সাদা কাফনের কাপড় দেখা যাচ্ছিল।

দাফনের সময় মরদেহের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের আচরণও তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। কেউ কফিনে হাত দেননি, মাটিও দেননি কিংবা দোয়া করেননি বলে দাবি করেন তিনি।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সাড়ে তিন বছর আগে মারা যাওয়া হেফাজ উদ্দিনের নামে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে টিকাপাড়া গোরস্থানে দাফন হওয়া মরদেহটি আসলে কার?

ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, গোরস্থান কর্তৃপক্ষ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে মরদেহের পরিচয় ও দাফন সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, ঘটনার বিষয়ে একাধিকবার তৌফিক তানভীরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি মূল বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেননি। তবে সর্বশেষ যোগাযোগে তিনি দাবি করেন, কফিনে তার বাবা হেফাজ উদ্দিনের মরদেহই ছিল।

তার এই দাবির সঙ্গে হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যুর পূর্ববর্তী তথ্য ও স্থানীয়দের বক্তব্যের অসঙ্গতিই এখন তৈরি করেছে নতুন রহস্য।

এমএসএম / এমএসএম

লাকসামে বিএনপি’র ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত

রৌমারীতে সমাজকলাণ সমিতির জমিতে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন

বাগেরহাটের ফকিরহাটে বসত বাড়ীতে ডাকাতি ককটেল ফাটিয়ে এলাকা ত্যাগ ডাকাত দলের

শার্শায় বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী পালিত

স্বাস্থ্য কর্মকর্তার মৃত্যুতে শূন্যপদসহ হাসপাতালে আসেন না ৫ চিকিৎসক, সেবাবঞ্চিত রোগীরা

ত্রিশালে জিপিএ ফাইভ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ছাত্রদলের সংবর্ধনা

অসহায় পরিবারের একমাত্র সম্বল পুকুরের মাছ বি/ষ ঢেলে ১০ লাখ টাকার ক্ষ/তি/র অভিযোগ

সাভা‌রে এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগে মাদ্রাসার শিক্ষকসহ পাঁচজন গ্রেপ্তার

তজুমদ্দিনে বজ্রপাতের আঘাতে কৃষকের মৃত্যু

সাড়ে তিন বছর আগে মৃত হেফাজের নামে দাফন হলো কার?

টঙ্গীর সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়

বাবুগঞ্জে বিএনপি নেতার হামলায় বৃদ্ধ আহত

কুড়িগ্রাম কেন্দ্রীয় বাজার ব্যবসায়ী সমিতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত