মাঠের ফসলেই লুকিয়ে আছে আমাদের পরবর্তী বড় গল্প
রাজশাহীর একটা আমবাগানে একবার দাঁড়িয়েছিলাম মৌসুমের ঠিক শুরুতে। গাছভর্তি আম, বাতাসে মিষ্টি একটা গন্ধ, আর চাষির মুখে সেই চিরচেনা দুশ্চিন্তা— এবার দাম পাওয়া যাবে তো? মনে মনে ভাবছিলাম, এই একই আম যদি দুবাইয়ের কোনো সুপারশপের তাকে গিয়ে ওঠে, দামটা তখন কেমন হতে পারে। দূরত্বটা আসলে খুব বেশি না, শুধু মাঝখানের রাস্তাটা এখনো পুরোপুরি বানানো হয়নি।সংখ্যা দিয়েই শুরু করি, কারণ সংখ্যাগুলো সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো। বিশ্বে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়, ফল ষষ্ঠ, আর আলুতে অষ্টম। বছরে ১৬৫ লাখ টন সবজি, ১২১ লাখ টন ফল ফলে এই মাটিতে— আম একাই ২৪ লাখ টনের বেশি। লিচু, আনারস, পেয়ারা মিলিয়ে আরও লাখ তেরো টনের কাছাকাছি। অথচ এত কিছুর পরও দেশের বাইরে এই ফসলের নাম খুব একটা শোনা যায় না, তাই না? সমস্যাটা উৎপাদনে না, সমস্যাটা কাঠামোয়। এখানেই আসল মজার তথ্যটা। ইপিবির হিসাব ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে ফল রপ্তানি থেকে আয় ছিল মোটে সাড়ে পাঁচ লাখ ডলার— প্রায় কিছুই না বলা চলে। তিন, বছর পর, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই সংখ্যাটা দাঁড়ায় সাড়ে সাতষট্টি মিলিয়ন ডলারে। হিসাব করলে ১১৬ গুণ বৃদ্ধি। আর চলতি অর্থবছরের এগারো মাসেই ফল-ফুল রপ্তানি ছুঁয়ে ফেলেছে ১২৭ মিলিয়ন ডলার, যা গত পুরো বছরের চেয়েই ৮৯ শতাংশ বেশি। সবজি বেড়েছে ৯ শতাংশের মতো, মসলা প্রায় ১৫ শতাংশ। আরব আমিরাত, বেলজিয়াম, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য— এসব বাজারে আমাদের কৃষিপণ্যের নিয়মিত ক্রেতা এখন আছে। মানে পথটা কল্পনা নয়, ইতিমধ্যে হাঁটা হয়ে গেছে খানিকটা। এই তিনটা উপখাত — ফল, সবজি আর মসলা একসাথে যোগ করলে চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয় দাঁড়ায় বছরে মোটামুটি ৩০৫ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। কিন্তু এটাকে পুরো কৃষি রপ্তানির সাথে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। চা, মসলার বাল্ক রপ্তানি, তেলবীজ, আরও নানা উপখাত মিলিয়ে সামগ্রিক কৃষিপণ্য রপ্তানির মোট অঙ্কটা অনেক বড়— প্রায় ৯৯০ মিলিয়ন ডলার, আর সেটা গত কয়েক বছর ধরে প্রায় স্থবির, এবার বরং সামান্য কমারও শঙ্কা আছে। অর্থাৎ ৯৯০ মিলিয়নের মধ্যে ফল-সবজি-মসলার ভাগ মোটে তিন ভাগের এক ভাগের মতো, কিন্তু ঠিক এই তিন ভাগের এক ভাগই সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে। বাকি বড় অংশটা যেখানে থমকে, সেখানে এই ছোট অংশটা লাফিয়ে বাড়ছে কী করে? উত্তরটা সহজ— এই উপখাতগুলোতে আলাদা করে মনোযোগ দিলে ফল মেলে দ্রুতই, বাকি কৃষিপণ্যের ভারী বহর টেনে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। নীতিনির্ধারকদের জন্য এটাই আসল শিক্ষা— বন্দুক দিয়ে সব পাখি না মেরে, ঠিক জায়গায় গুলি করলেই কাজ হয়। এই কথাগুলো বলছি টেবিলে বসে পরিসংখ্যান পড়ে না, বরং একটু মাটি ঘেঁটে দেখা অভিজ্ঞতা থেকে। আমাদের পরিবার ১৯৯৫ সাল থেকে সার-বীজ-কীটনাশকের ব্যবসায় আছে। বাবাকে দেখেছি, কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে আসলে বেশি কিছু লাগে না— ঠিক সময়ে সার পেলে, ন্যায্য দাম পেলে, আর বিক্রির একটা নিশ্চিত জায়গা থাকলেই কৃষক খুশি। সময়মতো কৃষকের হাতে সার তুলে দেওয়া আর তার ফসলকে বিশ্ববাজার পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া দুটোই আসলে একই দায়িত্বের দুই প্রান্ত। এই ছোট ছোট নিশ্চয়তাগুলোই বদলে দিতে পারে একটা গোটা গ্রামের ভাগ্য। তুলনা করতে চাইলে ভিয়েতনামের দিকে তাকানো যায়। কৃষিজমির দিক থেকে তারা আমাদের চেয়ে খুব একটা এগিয়ে নেই, তবু নির্দিষ্ট কয়েকটা অঞ্চলে সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ করে গত দশ বছরে বিশ্ববাজারে ফল-সবজির নিজস্ব জায়গা বানিয়ে নিয়েছে। তারা পারলে আমরা কেন পারব না— মাটি, পরিশ্রম, তরুণ জনশক্তি, কোনোটাতেই তো আমরা পিছিয়ে নেই। এবার একটু সামনে তাকাই। উপরে বলা সেই ৩০৫ মিলিয়ন ডলার— অর্থাৎ শুধু ফল-সবজি-মসলার ভাগ, মোট কৃষি রপ্তানির পুরোটা নয়— এটা যদি বর্তমান গতিতেই (বছরে গড়ে ধরুন ১৫ শতাংশ) বাড়তে থাকে, বাড়তি কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই, তাহলে ২০২৮-২৯ নাগাদ এই অঙ্ক ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু প্রস্তাবিত রপ্তানি অঞ্চলের মতো পরিকল্পিত অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করলে, ফল রপ্তানিতে যেমন বছরে ৮০-৯০ শতাংশ হারে বাড়তে দেখা গেছে, সেই গতি খানিকটা সবজি-মসলাতেও ছড়িয়ে দেওয়া গেলে তিন বছরে এই ফল-সবজি-মসলার সম্মিলিত আয় ৬৫০-৭০ কোটি বা ৭০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত যেতে পারে— যা তখন হয়তো সামগ্রিক কৃষি রপ্তানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ছুঁয়ে ফেলবে। এটা কোনো সরকারি পূর্বাভাস নয়, স্রেফ ইপিবির নিজস্ব প্রবণতা টেনে দেখা একটা হিসাব— তবু বলে দেয়, লক্ষ্যটা বড়সড় হলেও দিবাস্বপ্ন নয়। তবে ৩০৫ থেকে ৭০০ মিলিয়নে যাওয়াটা একটা ধাপ মাত্র। প্রশ্ন যদি হয়— সবজি-ফল-মসলা মিলিয়ে রপ্তানি সত্যিই ২ বিলিয়ন ডলার ছুঁতে পারে কিনা— উত্তরটা হ্যাঁ, তবে সেটা তিন বছরের পাইলট দিয়ে হবে না, লাগবে অন্তত সাত-আট বছরের একটা রূপকল্প, আর বেশ কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন। প্রথমেই তিনটা পাইলট অঞ্চলে আটকে না থেকে একই মডেল ছড়িয়ে দিতে হবে সারা দেশে— যশোর-ঝিনাইদহের সবজি বলয়, পার্বত্য অঞ্চলের আনারস-কাঁঠাল, সিলেটের ফল বলয়, এভাবে অন্তত দশ-বারোটা অঞ্চলে। তারপর আসে মূল্য সংযোজনের প্রশ্ন— কাঁচা ফসল পাঠানোর বদলে হিমায়িত সবজি, ফলের পাল্প-জুস, শুকনো ফল, রেডি-টু-ইট প্যাকেজিং তৈরি করতে পারলে একই পরিমাণ ফসলেই আয় তিন-চারগুণ বাড়ানো সম্ভব। রাজশাহীর আমের মতো নির্দিষ্ট পণ্যের ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে একটা "ব্র্যান্ড বাংলাদেশ" দাঁড় করানো গেলে প্রিমিয়াম দামও পাওয়া সম্ভব। ইউরোপ-আমেরিকার পাশাপাশি চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় বাজারে ঢুকতে দ্বিপাক্ষিক ফাইটোস্যানিটারি চুক্তি দরকার, দরকার বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় হিমাগার আর প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্টে বিনিয়োগের সহজ পথ। আর সবশেষে দরকার একটা একক কর্তৃপক্ষ, যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ফাইল আটকে থাকা জটিলতা দূর করে পুরো প্রক্রিয়াটাকে এক ছাদের নিচে আনবে। এই তুলনাটা একটু বড় করেই করি। ভিয়েতনাম গত বছর শুধু ফল-সবজি রপ্তানি করেই আয় করেছে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার, আর তাদের লক্ষ্য ২০৩০ নাগাদ পনেরো বিলিয়নে পৌঁছানো। সেই তুলনায় আমাদের দুই বিলিয়নের স্বপ্নটা আসলে বিনয়ী একটা লক্ষ্য, অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী কিছু না। পার্থক্য শুধু এটুকু— তারা এই কাজ শুরু করেছিল আমাদের অনেক আগে। দেরি যেটুকু হয়েছে, সেটা আর বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। এই লক্ষ্য ছুঁতে শুরুর ধাপে খুব জটিল কিছু করতে হবে না। বগুড়া-জয়পুরহাটে একটা সবজি অঞ্চল, রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ-নওগাঁয় আম অঞ্চল, আর গাজীপুর-টাঙ্গাইলে বিমানবন্দরের কাছে একটা কেন্দ্রীয় কার্গো হাব— এই তিন জায়গায় প্যাক হাউজ, কোল্ড স্টোরেজ আর মান-সনদায়নের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই কাজ অনেকখানি এগিয়ে যায়। খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকা, যা জাতীয় বাজেটের তুলনায় সত্যিই সামান্য। আর এই পুরো উদ্যোগের সবচেয়ে ভালো দিকটা হলো তরুণদের জন্য সুযোগ তৈরি হওয়া। প্যাক হাউজ আর কোল্ড চেইনে সরাসরি কাজ পাবেন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। চাষাবাদ সম্প্রসারণের কারণে কৃষি-শ্রমিকের চাহিদা বাড়বে আট-দশ হাজার। আর যে পাঁচ হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে, তাদের মধ্য থেকে যারা নিজেরাই ছোটখাটো ব্যবসা দাঁড় করাবেন, তারাও নেবেন আরও কয়েক হাজার কর্মী। সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ সতেরো-আঠারো হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে এই প্রাথমিক পর্যায়েই— আর জাতীয়ভাবে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে সেই সংখ্যা বহুগুণ বাড়বে। প্রতিটা সংখ্যার পেছনে একটা মুখ আছে, একটা পরিবার আছে। আর এই পুরো আলোচনাটা আসলে একটা জায়গায় এসে মিলে যায়— সবার আগে বাংলাদেশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাম্প্রতিক অধিবেশনে যে কথাগুলো বলেছেন— দেশের কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা, ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, বাংলাদেশকে একটা উৎপাদন-কেন্দ্রে পরিণত করা— কৃষি রপ্তানি অঞ্চল আসলে সেই কথাগুলোরই একটা হাতে-কলমে প্রয়োগ। মাটি আমাদের, কৃষক আমাদের, তরুণও আমাদের— বাইরের কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেদের এই তিনটা সম্পদকে কাজে লাগানোটাই তো সবচেয়ে সহজ আর সবচেয়ে বাস্তব একটা পথ, যেটা ঠিক ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিরই মূল কথা। সময় খুব বেশি নেই হাতে, কিন্তু সুযোগও কম নেই। মাটিতে বীজ তো বোনাই আছে— এখন শুধু একটু যত্ন আর সেচের অপেক্ষা। যে মাটি আমাদের বিশ্বে তৃতীয় স্থান এনে দিয়েছে, সেই মাটির ফসলই একদিন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের নাম লিখে দেবে। আর সেই গল্পের নায়ক হবেন কৃষক, তরুণ— আমরা সবাই মিলে। সবার আগে বাংলাদেশ, কথাটা তখন শুধু স্লোগান থাকবে না, মাঠের ফসলে আর কৃষকের হাসিতে সত্যি হয়ে উঠবে।
এমএসএম / এমএসএম
মাঠের ফসলেই লুকিয়ে আছে আমাদের পরবর্তী বড় গল্প
অ্যাসাইনমেন্টের পণ্য নিয়ে এখন ব্যবসা করছেন কুবির তিন শিক্ষার্থী
সঙ্গী হারানোর বেদনায় নিথর দেহের পাশে কুকুরটি
কাশফুলের দোলায় কুবিতে শরতের আত্মপ্রকাশ
ক্যাম্পাসে গায়ে হলুদ করে ব্যাচমেটকে বিয়ে করলেন কুবি শিক্ষার্থী
করাতকলের জীবন
শরীরচর্চায় আইসোমেট্রিক ও মাইক্রো ওয়ার্কআউট
মন খারাপের দিনগুলোয় ত্বকের যত্ন যেভাবে নেবেন
শালবন বিহার: বাংলার বৌদ্ধ ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক
গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় WUB-এর অগ্রণী ভূমিকা
ইরানের পরমাণু অস্ত্র ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন দাপটের পতন
১৪০ বছরের রেকর্ড ভাঙার পথে "সুপার এল নিনো": ২০২৬ হতে পারে ইতিহাসের উষ্ণতম বছর