কুমিল্লা অঞ্চলের টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প
মাটির অম্লতা দূর করে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা
কুমিল্লা অঞ্চলের কৃষিতে মাটির অম্লতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সেচসংকট ও আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা মোকাবিলা করে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, চাষাবাদের খরচ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে ২০৪ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। 'কুমিল্লা অঞ্চলের টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প'-এর আওতায় কুমিল্লা, চাঁদপুর
ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৩৪টি উপজেলায় ১৭ধরনের আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে সরাসরি ১ লাখ ২ হাজার ৯৬০ জন কৃষককে উপকৃত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৫০ হাজার প্রযুক্তি প্রদর্শনীর মাধ্যমে কৃষকদের কাছে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে উন্নত জাতের ফসল, আধুনিক কৃষিযন্ত্র, পানি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, মাটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত
বালাই ব্যবস্থাপনা উল্লেখযোগ্য। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কৃষকের মাঠে সম্প্রসারণ এবং সম্ভাব্য ফলন ও বাস্তবে অর্জিত ফলনের মধ্যকার ব্যবধান কমানোই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।
সম্প্রতি প্রকল্পের কার্যক্রম, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদ হাসনাত বলেন, কুমিল্লা অঞ্চলের কৃষিতে মাটির অম্লতা অন্যতম বড় সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে মাটির অম্লত্ব পরীক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী ডলোচুন বা ডলোমাইট প্রয়োগ এবং মাটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা জেলার প্রায় ৬২ শতাংশ, চাঁদপুরের ২২ শতাংশ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৩৬ শতাংশ জমি অম্লীয় মাটির সমস্যায় আক্রান্ত। জমির অম্লতা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মাটির উর্বরতা ও ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
১৭ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ: প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের শুধু আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করানো নয়, বরং সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার শেখানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ জন্য মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি প্রদর্শনী, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও কৃ ষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উন্নত জাতের বীজ, কৃষিযন্ত্র এবং আধুনিক উৎপাদন কৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদ হাসনাতের মতে, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা ফসলের যে সম্ভাব্য ফলন নির্ধারণ করেন, কৃষকের মাঠে অনেক সময় তার চেয়ে কম ফলন পাওয়া যায়। উন্নত প্রযুক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান, মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা এবং সঠিক পরিচর্যার অভাব এ ব্যবধানের কারণ হতে পারে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে কৃষকদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বীজ ও প্রযুক্তি প্রাপ্তিতে সীমাবদ্ধতা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় তা কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বালুচরেও চাষাবাদের সম্ভাবনা: কুমিল্লা অঞ্চলের চরাঞ্চল ও বালুময় জমিকে কৃ ষি উৎপাদনের আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে প্রকল্পে। সাধারণত বালুময় জমিতে পানি ধরে রাখা কঠিন হওয়ায় চাষাবাদ ব্যাহত হয়। এ সমস্যা মোকাবি-লায় বালুচরে গর্ত তৈরি করে কম্পোস্ট ব্যবহার, প্লাস্টিকের মাধ্যমে পানি ধরে রাখা এবং মিনি পুকুরের মতো কৌশল কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদ্ধতি ব্যবহার করে কুমড়াজাতীয় ফসল ও কালিজিরা চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের প্রত্যাশা, জমির ধরন ও পরিবেশের উপযোগী প্রযুক্তি প্রয়োগ করা গেলে অনাবাদি বা কম উৎপাদনশীল জমিতেও কৃষি উৎপাদনের নতন সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে কৃষিজমির কার্যকর ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি কৃষকের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। নারীদের আয়বর্ধক কৃষি উদ্যোগ
প্রকল্পে বসতবাড়িতে পুষ্টিবাগান ও ছাদবাগান তৈরি, মাশরুম চাষ সম্প্রসারণ এবং নারীদের কৃষিভিত্তিক আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মাশরুম চাষের মাধ্যমে নারীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে স্পন, স্পোর ও মাদার কালচারসহ প্রয়োজনীয় চাষ উপকরণ সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাড়ির আঙিনা ও ছাদে পুষ্টিবাগান এবং স্বল্প পরিসরে মাশরুম চাষের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের পথ তৈরি হবে। তবে এসব উদ্যোগের স্থায়ী সুফল নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ, মানসম্মত উপকরণের সরবরাহ এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণে সহ-ায়তা প্রয়োজন।
২০৪ কোটি টাকার প্রকল্প: প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ২০৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে চার কোটি টাকা আপৎকালীন বা কন্টিনজেন্সি খাতে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক। প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৫ সালের জুলাই থেকে। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত।
প্রকল্পের আওতায় সরাসরি ১ লাখ ২ হাজার ৯৬০ জন কৃষককে উপকৃত করার লক্ষ্য রয়েছে। এর পাশাপাশি আরও কৃষককে আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। তবে অতিরিক্ত উপকারভোগীর সংখ্যা এবং প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে সর্বশেষ সরকারি প্রতিবেদন যাচাই করা প্রয়োজন। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো ও কৃষিকাজে শ্রমিকসংকট মোকাবিলায় প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র ও উপকরণ বিতরণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র, সেচের পাইপসহ অন্যান্য কৃষি সরঞ্জাম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কৃষক গ্রুপ ও সংগঠনের মাধ্যমে কৃষিযন্ত্র সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, যন্ত্রপাতি ব্যক্তিগত মালিকানায় ব্যবহারের জন্য নয়; সংশ্লিষ্ট কমিটি ও বিধিবিধান অনুসরণ করে বিতরণ এবং ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে। কৃষকের প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করা, সুষম বণ্টন এবং অপব্যবহার রোধ করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
উৎপাদন ব্যয় কমানো ও জলবায়ু সহনশীল কৃষিতে জোর: আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ফসলের ফলন বাড়াতে সহায়তা করছে বলে দাবি করেছেন প্রকল্প পরিচালক। বিশেষ করে মরিচ ও টমেটোর মতো ফসল উৎপাদনে প্রযুক্তির সুফল পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ফলন বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের হার এবং কৃ ষকপ্রতি আর্থিক সুবিধা নির্ধারণে মাঠপর্যায়ের যাচাইকৃত তথ্য প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পানি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ, প্রিসিশন এগ্রিকালচার বা নির্ভুল কৃষিপদ্ধতি এবং বৃক্ষরোপণের মতো কার্যক্রমেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগে পানির অপচয় কমানো, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং পরিবেশের ওপর কৃষির চাপ কমানোর সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার সম্প্রসারণের মাধ্যমে শ্রমিকসংকট মোকাবিলা ও কৃষিকাজের সময় কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। কৃষকদের সমবায় বা দলভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো গেলে ছোট ও মাঝারি কৃ ষকেরাও তুলনামূলক কম খরচে যান্ত্রিক কৃষির সুবিধা পেতে পারেন।
বাস্তবায়ন ও সুফল নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ: কুমিল্লা অঞ্চলের কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, লাভজনক ও জলবায়ু সহনশীল করে তোলার ক্ষেত্রে প্রকল্পটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে সময়মতো কার্যক্রম বাস্তবায়ন, বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার, প্রযুক্তির সুষম বণ্টন এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে কৃষি প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়নে শুধু প্রদর্শনীর সংখ্যা, প্রশিক্ষণ আয়োজন বা যন্ত্রপাতি বিতরণের হিসাব যথেষ্ট নয়। প্রকল্পের আগে ও পরের ফলন, কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, আয়, মাটির গুণগত পরিবর্তন এবং পানি ব্যবহারের দক্ষতার তুলনামূলক চিত্রও গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্যের ভিত্তিতে কোন প্রযুক্তি কোন ধরনের জমিতে বেশি কার্যকর, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
বিশেষ করে মাটির অম্লতা দূর করার ক্ষেত্রে জমির প্রকৃত অবস্থা পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী ডলোচুন বা ডলোমাইট প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে, যাতে প্রকল্পের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরও তাঁরা এসব পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন।
এমএসএম / এমএসএম
মাটির অম্লতা দূর করে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা
মাঠের ফসলেই লুকিয়ে আছে আমাদের পরবর্তী বড় গল্প
অ্যাসাইনমেন্টের পণ্য নিয়ে এখন ব্যবসা করছেন কুবির তিন শিক্ষার্থী
সঙ্গী হারানোর বেদনায় নিথর দেহের পাশে কুকুরটি
কাশফুলের দোলায় কুবিতে শরতের আত্মপ্রকাশ
ক্যাম্পাসে গায়ে হলুদ করে ব্যাচমেটকে বিয়ে করলেন কুবি শিক্ষার্থী
করাতকলের জীবন
শরীরচর্চায় আইসোমেট্রিক ও মাইক্রো ওয়ার্কআউট
মন খারাপের দিনগুলোয় ত্বকের যত্ন যেভাবে নেবেন
শালবন বিহার: বাংলার বৌদ্ধ ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক
গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় WUB-এর অগ্রণী ভূমিকা
ইরানের পরমাণু অস্ত্র ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন দাপটের পতন