ঢাকা সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬

সত্যকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা: খানসামায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগ


জসিম উদ্দিন, খানসামা photo জসিম উদ্দিন, খানসামা
প্রকাশিত: ৮-৭-২০২৫ দুপুর ১:২২

দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার মধ্য সুবর্ণখুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জেবুন নেছা ফেরদৌসী সম্প্রতি চরম চাপ, অপবাদ ও ষড়যন্ত্রমূলক হামলার মুখে পড়েছেন। তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ এনে কয়েকজন শিক্ষক এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহল তাকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অপবাদ ও ষড়যন্ত্রের পেছনে রয়েছে একটি গভীর ও গুরুতর কারণ—একজন সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির অভিযোগ উত্থাপন।

ঘটনার সূত্রপাত ১ জুলাই ২০২৫ তারিখে, যখন প্রধান শিক্ষক লিখিতভাবে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন যে, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাখাল চন্দ্র রায় নিয়মিতভাবে ছাত্রীদের শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিচ্ছেন, অশালীন আচরণ করছেন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বলছেন। এ বিষয়ে একাধিক ছাত্রী তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে অভিযোগ জানায়। এমনকি কয়েকজন ছাত্রীর কণ্ঠে সেই অভিজ্ঞতার ভিডিও জবানবন্দিও ছড়িয়ে পড়ে, যা স্থানীয় সমাজে গভীর আলোড়ন তোলে। কিন্তু অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পরপরই ঘটতে থাকে উল্টো চিত্র। মূল অভিযুক্ত শিক্ষককে রক্ষার চেষ্টায় নেমে পড়ে বিদ্যালয়ের ভেতরের একটি গোষ্ঠী। অভিযোগ উঠেছে, এ গোষ্ঠীর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ফ্যাসিস্ট রাজনীতিকদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। খুব দ্রুতই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ, মানববন্ধন এবং একের পর এক ষড়যন্ত্র শুরু হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রধান শিক্ষক নিজের স্বার্থে সহকর্মীদের হেয় করছেন—যদিও মূলত তিনিই ভুক্তভোগীদের অভিযোগকে সামনে এনেছিলেন।

প্রতিবেদকের হাতে আসা তথ্য বলছে, বিদ্যালয়ের সহকারী কর্মচারী তরিকুল ইসলাম, যিনি নিজেও বেঞ্চ চুরি এবং সম্পত্তি আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্ত, তারই চাচাতো ভাই সাইয়েদুর রহমান ‘সামু’কে বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য বানানোর অপচেষ্টায় ব্যস্ত ছিল দীর্ঘদিন ধরে। প্রধান শিক্ষক বিধিমাফিক আবেদন বাতিল করায়, তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সাইয়েদুজ্জামান সামু, যিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের উপজেলা দপ্তর সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেন, তিনি ইতিপূর্বে একাধিকবার প্রধান শিক্ষককে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন, "আমি থানা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক, আপনি তো বুঝেনই না! আপনি আমার কথার বাইরে যাচ্ছেন কেন? আপনি আমাকে কমিটিতে না নিয়ে এইভাবে তাল-বাহানা করে টিকতে পারবেন??"

এই হুমকি কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এরপর থেকেই একের পর এক ষড়যন্ত্র শুরু হয় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক, যাদের অনেকেই সামুর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত, তারা গিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তার দপ্তরে স্বাক্ষর করে আনেন প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ ও অনিয়ম’-এর পাল্টা অভিযোগে। অথচ তাদের অনেকের স্বাক্ষর আদায়ের পেছনেও ছিল মোবাইল ফোনে ‘উপরের নির্দেশ’-এর প্ররোচনা।

প্রধান শিক্ষক জেবুন নেছা এই প্রতিবেদককে বলেন, "আমি আমার শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে যৌন হয়রানির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করি। কিন্তু তদন্ত তো হলো আমার বিরুদ্ধেই! রাখাল চন্দ্রের বিষয়ে কিছুই হলো না। বরং আমাকে বাদ দিয়ে শিক্ষা অফিস আমার শিক্ষকদের ডেকে নিয়ে জোর করে চিঠিতে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়।" এই বক্তব্যের প্রমাণস্বরূপ একটি অডিও কল রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে এসেছে যেখানে উপজেলা শিক্ষা অফিসার নিজেই বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে ফোন করে শিক্ষা অফিসে ডেকে নিয়েছেন বলে শিক্ষকরা স্বীকার করেছেন। তবে এই বিষয়টি অস্বীকার করে খানসামা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির তালুকদার বলেন, "আমি কোনো শিক্ষককে ডাকিনি। কেবলমাত্র রাখালের নামে অভিযোগ পাওয়ার পরে তাকেই অফিসে ডেকেছি।"

অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষা কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির তালুকদার প্রধান শিক্ষককে চাপ দিচ্ছেন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য করতে, যিনি অতীতে ফ্যাসিস্ট সংশ্লিষ্ট রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ আছে। সরকারের সাম্প্রতিক একাধিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিগত সরকারের বিতর্কিত ব্যক্তিদের নাম প্রতিষ্ঠান বা কমিটি থেকে বাদ দিতে হবে। তারপরও কেন এই নাম প্রতিষ্ঠায় চাপ, সে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। এই সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে এসেছে, যেখানে শোনা যায়—প্রধান শিক্ষক জেবুন নেছা ফ্যাসিস্ট সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার প্রেক্ষিতে একজন বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিকে দাতা সদস্য না করার যুক্তি তুলে ধরে বলেন, "স্যার, অধিদপ্তরের মেইলে এসেছে যে, ফ্যাসিস্ট সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দাতাদের বাদ দিয়ে কাজ করতে হবে। ওরা তো বিগত সরকারের পদবিধারী কর্মী ছিল—ওদেরকে কিভাবে...?" জবাবে শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, "বাংলাদেশে যারা দাতা আছে, ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে যারা জড়িত—আপনি তাহলে সবই চেঞ্জ করে দেন।" প্রধান শিক্ষক উত্তরে বলেন, "বিদ্যালয়ের মূল দাতা যাঁর জমিতে স্কুল হয়েছে, তিনি এবং তাঁর উত্তরাধিকার বৈধ দাতা হিসেবে আছেন।" তাতে শিক্ষা কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া ছিল, "দাতা কে কে আছে তালিকা নিয়ে আসেন, আমি বোঝাতে চাই না, আপনি নীতিমালা পড়ে দেখুন।"

প্রশ্ন উঠছে, যেখানে সরকারি নির্দেশনায় (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, ১৫ মে ২০২৫ এবং শিক্ষা অধিদপ্তর, ২ জুন ২০২৫) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ফ্যাসিস্ট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রকল্প, কমিটি, পুরস্কার বা স্থাপনায় রাখতে পারবে না, সেখানে এক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কিভাবে উল্টো ওইসব ব্যক্তিকে দাতা সদস্য রাখতে উৎসাহ দেন? এই ধরনের কথোপকথন প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কারণ, কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে যেখানে ফ্যাসিস্ট সংশ্লিষ্ট নাম বাতিলের নির্দেশনা রয়েছে, সেখানে উপজেলা পর্যায়ে একজন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে দাতা সদস্য করতে চাপ প্রয়োগ করা কতটা যুক্তিসঙ্গত—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষাবিদরা।

স্থানীয় অভিভাবকরা বলছেন, সাইয়েদুজ্জামান সামুর অব্যাহত চাপ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের জোরে প্রশাসনের একটি অংশ এখনো নীরব দর্শক হয়ে আছে। অপরদিকে, প্রধান শিক্ষক যে যৌন হয়রানির ঘটনায় অভিযোগ করেছিলেন, সেই সহকারী শিক্ষক রাখাল চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে আজও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্থানীয় অভিভাবকদের একটি বড় অংশ বলছে, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যারা এখন অভিযোগ করছেন—তারা সবাই সেই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত যারা চায় বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় নিজের প্রভাব বিস্তার করতে। তারা এ-ও বলছেন, যদি প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ মিথ্যা হতো, তবে তিনি লিখিত অভিযোগ করার ঝুঁকি নিতেন না, এবং অভিযোগে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থাকার সুযোগও নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজেই অভিযোগ করেছেন এবং ছাত্রীরাও সরাসরি ভিডিও জবানবন্দিতে ঘটনা বলেছে—এটা হালকাভাবে নেওয়া যায় না।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে খানসামা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির তালুকদার বলেন— "উভয় পক্ষের অভিযোগ পেয়ে আমরা পুরো বিষয়টি তদন্ত করছি। তদন্ত চলমান থাকায় বিস্তারিত মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত জানা যাবে।"

এমএসএম / এমএসএম

কক্সবাজারের চকরিয়ায় মৃত হাতিকে মাটিতে পুতে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা!

জাতীয় সুন্নী ওলামা মাশায়েখ পরিষদের ঈদ পুনর্মিলনী ও বিশ্ব শান্তি কামনা অনুষ্ঠান সম্পন্ন

আদমদীঘিতে হামীম পেট্রল পাম্পের ৩০ হাজার টাকা জরিমানা

হাটহাজারীতে অকটেন মজুদ থাকা সত্ত্বেও বিক্রয় বন্ধ রাখার অপরাধে জরিমানা। 

নরসিংদীতে ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত যুবক নিহত

আদমদীঘিতে ট্রাকচাপায় প্রাণ গেল শিশু হাবিবার

গোমতী নদীর তীর রক্ষায় সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযান

বগুড়ার গাবতলীতে শ্যালো মেশিন ঘর থেকে বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার

অভয়নগরে আইনশৃঙ্খলা সভা: দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাস দমনে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান

‎হত্যা মামলার আসামির ‘ক্ষোভ’: ৫০ নিরীহ চরবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা

শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কমিটির মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

মনপুরায় তরমুজে ভরা মাঠ, ঝড়ের আশঙ্কায় নির্ঘুম রাত চাষিদের

জ্বালানি তেলের নিরাপত্তা ও পাচার রোধে রাজশাহীতে বিজিবি মোতায়েন