টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের টেন্ডারে নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ
টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। বিগত দলীয় সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মান, ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয় ও জনবল নিয়োগ'সহ প্রতিটি ক্ষেত্রে যেন দুর্নীতির মহোৎসব চলে। যা এখনো চলামান রয়েছে। সর্বশেষ মেডিকেল, সার্জিকেল এন্ড রিকোজিট (এমএসআর) টেন্ডারে নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সরকারের গচ্ছা গেছে পৌনে চার কোটি টাকা। টেন্ডার নিয়ন্ত্রনে গড়ে উঠা সিন্ডিকেট কোটি টাকার কার্যাদেশ দিয়েছে কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে। টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগে আদালতে মামলাও করেছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা। এসব কারনে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ কম এসেছে প্রায় চার কোটি টাকা। ফলে বিপুল ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জেলাবাসী। জানা গেছে, চলতি অর্থ বছরের জন্য গত অক্টোবরে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এমএসআর (মেডিকেল, সার্জিকেল ও রিকোজিট) টেন্ডার আহবান করে। এতে ওষুধ, যন্ত্রপাতি, গজ ব্যান্ডেজ তুলা, লিলেন, কেমিকেল রিএজেন্ট ও আসবাবপত্র গ্রুপে একাধিক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। ওষুধ গ্রুপে শামছুল হক এন্টারপ্রাইজ ৭৯ লাখ ৯৩ হাজার টাকা এবং যন্ত্রপাতি গ্রুপে ৭১ লাখ ৪১ হাজার টাকায় সর্বনিন্ম দরদাতা হয়। কিন্তু কার্যাদেশ দেয়া হয় ৫ম দরদাতা মক্কা টেডার্স নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি ১৩ লাখ ৫৮ হাজার টাকায়। এতে সরকারের গচ্ছা গেছে ৪২ লাখ ১৭ হাজার টাকা। গজ ব্যান্ডেজ তুলা গ্রুপে শামছুল হক ফার্মেসি ৫৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকায় সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও কার্যাদেশ দেয়া হয় ২য় দরদাতা মেডি স্কয়ারকে ৬২ লাখ ৩৮ হাজার টাকায়। ফলে সরকারের ক্ষতি হয় ৮ লাখ টাকা। মেডিস্কয়ার কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার কারনে মালামাল সরবরাহ করেও এখনো পর্যন্ত কোন বিল পায়নি। কেমিকেল রিএজেন্ট গ্রুপে ইমারত হোসাইন খান ৩৫ লাখ ৫৮ হাজার টাকায় সর্বনিন্ম দরদাতা হয়। তবে কার্যাদেশ দেয়া হয় ৪নং দরদাতা সিমাক ইন্টারন্যাশনালকে ৪৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকায়। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ১৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে টেন্ডারে অনিয়মের কারনে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ৬৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। এদিকে নজিরবিহীন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এমএসআর টেন্ডারে। এবছর ওষুধ গ্রুপে সর্বনিন্ম সাঈদ মেডিকেল হল এক কোটি ১৭ লাখ ৯১ হাজার টাকার টেন্ডার দাখিল করে সর্বনিন্ম দরদাতা হয়। কিন্তু কার্যাদেশ দেয়া হয় ৪নং দরদাতা জোয়ারিয়া ইন্টারন্যাশনালকে দুই কোটি ১৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকায়। ফলে ওষুধ গ্রুপে গচ্ছা যায় ৯৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। যন্ত্রপাতি গ্রুপে এক কোটি ৬৫ লাখ ৬৯ হাজার টাকায় সর্বনিম্ন দরদাতা হয় শামছুল হক ফার্মাসি। তবে কার্যাদেশ দেয়া হয় ৩য় দরদাতা জোয়ারিয়া ইন্টারন্যাশনালকে দুই কোটি ৩১ লাখ ৩৮ হাজার টাকায়। এর ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ৬৫ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। গজ ব্যান্ডেজ তুলা গ্রুপে ৭০ লাখ ৩৪ হাজার টাকায় সর্বনিম্ন দরদাতা হয় শামছুল হক ফার্মেসি। কার্যাদেশ দেয়া হয় ৩য় দরদাতা কালো তালিকাভুক্ত মেডি স্কয়ার প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি ৪৩ লাখ ৫১ হাজার টাকায়। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ৭৩ লাখ ১৭ হাজার টাকা।
একইভাবে লিলেন গ্রুপে শামছুল হক ফার্মেসী ৬৬ লাখ ২১ হাজার টাকায় সর্বনিন্ম দরদাতা হলেও কার্যাদেশ পায় জোয়ারিয়া ইন্টারন্যাশনাল এক কোটি ৪০ লাখ ৮ হাজার টাকায়। অর্থাৎ লিলেন গ্রুপে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। আর আসবাবপত্র গ্রুপে শামছুল হক ফার্মেসি ৬৪ লাখ ১২ হাজার টাকায় সর্বনিন্ম দরদাতা হলে কার্যাদেশ দেয়া হয় ৫ম দরদাতা জোয়ারিয়া ইন্টারন্যাশনালকে ৭৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকায়। ফলে আসবাবপত্রে সরকারের গচ্ছা যায় ১৪ লাখ ২৭ হাজার টাকা। সবমিলিয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টেন্ডারে অনিয়মের কারনে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় তিন কোটি ২৩ লাখ ৭৬ হাজার টাকার বেশী। ক্ষতিগ্রস্থ ঠিকাদারদের অভিযোগ, টেন্ডারের কাগজপত্রে ত্রুটি ছিল- এমন ভুয়া অভিযোগে তাদেরকে কার্যাদেশ দেয়া হয়নি। টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ এনে অবশেষে আদালতে মামলা দায়ের করেন তারা। এদিকে অর্থ লোপাটের ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে গজ ব্যান্ডেজ তুলার ক্ষেত্রে। এক পরিসংখানে দেখা যায়, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বিগত চারটি অর্থবছরে গজ ব্যান্ডেজ তুলার জন্য পাঁচ কোটি ৭৯ লাখ ৩১ হাজার টাকার টেন্ডার আহবান ও কার্যাদেশ প্রদান করে। যা মোট দরপত্রের ৮ শতাংশ। একই সময়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশেই অবস্থিত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল এক কোটি ৯১ লাখ ৬৬ হাজার টাকার গজ ব্যান্ডেজ তুলার দরপত্র আহবান ও কার্যাদেশ দেয়। গত চার বছরে দুই হাসপাতালের রোগীর পরিসংখানে দেখা যায়, টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল প্রায় চার কোটি টাকা কম বরাদ্দ পেয়ে ১৩ লাখ ৮১ হাজার ৩২১ জন রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেয়। অপরদিকে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সেবা প্রদান করে ১১ লাখ ৮ হাজার ১৯ জন রোগীকে। উল্লেখ্য গজ ব্যান্ডেজ তুলার সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়ে থাকে অর্থপেডিক বিভাগে। কিন্তু এ হাসপাতালে এখনো পর্যন্ত বিভাগটি চালুই হয়নি। এক্ষেত্রে সচেতন মহলের প্রশ্ন- বরাদ্দের এই বিপুল অর্থ কোথায় কিভাবে ব্যয় হলো। এদিকে হাসপাতালের হিসাব বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কেমিকেল রিএজেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে সিন্ডিকেট সদস্যরা। চলতি অর্থবছরে কেমিকেল রিএজেন্টের ৯৩ লাখ ৬২ হাজার টাকার মালামাল ইতিমধ্যেই ফুরিয়ে গেছে। কেমিকেল কেনাকাটা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিজেদের মত বিল ভাউচার তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ লোপাট করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টেন্ডারে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্থ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান শামসুল হক এন্টারপ্রাইজ, শামছুল হক ফার্মেসি ও সাঈদ মেডিকেল হলের স্বত্বাধিকারী বাদি হয়ে আদালতে মামলা করেন। মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এ অবস্থায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জোয়ারিয়ার কয়েক কোটি টাকার বিল আটকে গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে টেন্ডারে দুর্নীতির আশ্রয় না নিলেও চলতি অর্থবছরে পুরোনো কায়দায় টেন্ডার নিয়ন্ত্রন করে সিন্ডিকেট সদস্যরা। এতে সরকারের বিপুল আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বরাদ্দ কমেছে প্রায় চার কোটি টাকা। ফলে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে বঞ্চিত হয়েছে টাঙ্গাইলবাসী।
টেন্ডারে দুর্নীতি অনিয়ম আর আদালতে মামলার বিষয়ে শামছুল হক ফার্মেসি ও শামছুল হক এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোঃ আমিনুর রহমান প্রতিবেদককে জানান, দরপত্রের নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ মানের নমুনা সিলগালা অবস্থায় জমা দিয়েছিলাম। অথচ নিন্মমানের নমুনার কারন দেখিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। এ ব্যপারে কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে কোন কিছু জানায়নি। উপায় না পেয়ে আদালতে মামলা করি। ক্ষতিগ্রস্থ অপর ঠিকাদার আবু সাঈদ চৌধুরী জানান, কেমিকেল রিএজেন্ট টেন্ডারে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় প্রথম দরদাতা কার্যাদেশ থেকে বাদ পড়ে। দ্বিতীয় দরদাতা হিসেবে আমার সকল কাগজপত্র বৈধ থাকার পরেও অনিয়মের মাধ্যমে কার্যাদেশ দেয়া হয় ৪র্থ দরদাতাকে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাসপাতালের টেন্ডারসহ সকল কিছুই নিয়ন্ত্রন করছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের সমন্বয়ের ভুমিকা পালন করছেন হাসপাতালের স্টোর কিপার মোজাম্মেল হক সেতু। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কালো তালিকাভুক্ত মেডি স্কয়ারকে এখনো পর্যন্ত কোন বিল পরিশোধ করা হয়নি।
এ ব্যপারে মেডি স্কয়ারের স্বত্বাধিকারী রাশেদুজ্জামানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিষ্ঠানের মালিক বলে স্বীকার করলেও সাংবাদিক পরিচয় জানার পর নিজেকে মেডি স্কয়ারের কর্মচারী বলে পরিচয় দেন। আর জোয়ারিয়া ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী হারুন অর রশীদ জানান, আদালতে মামলার কারনে ফান্ড চলে যায়। ফলে বিল ছাড় করানো যায়নি। এতে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বলে জানান তিনি।
টেন্ডারে অনয়িম-দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক আবদুল কুদ্দুস বলেন, টেন্ডারের সকল প্রক্রিয়া যথাযথ অনুসরণ করেই কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। ইচ্ছেমত কাউকে কাজ দেয়ার সুযোগ নেই। কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, টেন্ডারের সময়ে ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানটি তালিকাভুক্ত ছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি মালামাল সরবরাহ করলেও বিল পরিশোধ করা হয়নি। আদালতের মামলাগুলো নিস্পত্তি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল রোগী কল্যান সমিতির আজীবন সদস্য মমিনুল হক খান নিক্সন বলেন, বরাদ্দ কম আসায় হাসপাতলের ডাক্তার, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কোন ক্ষতি হয়নি। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে রোগীরা। এ ব্যপারে তদন্তপুর্বক ব্যবস্থার দাবি জানান তিনি। এদিকে সংশ্লিষ্টরা জানান, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক, স্টোর কিপার ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আরো কিছু গুরুতর দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এমএসএম / এমএসএম
গজারিয়ায় ৯ই মে গণহত্যা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল
পটুয়াখালী বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলে হুইলচেয়ার দিয়ে স্বর্গীয়া মা'র অসিহত পূরন...
ধুনটে অসহায়দের স্বপ্নে নতুন আলো, মিলল গবাদিপশু ও অর্থ সহায়তা
মনপুরায় কোস্ট গার্ডের অভিযানে মাছ জব্দ, বিক্রির অভিযোগে তোলপাড়
চুনারুঘাটে সেতুর অভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলছে পারাপার
শ্যামনগরে সুন্দরবন সুরক্ষায় আর্থস্কাউট স্কুল ক্যাম্পেইন
গাংনী পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে অ্যাডভোকেট সাকিল আহমাদের নাম ঘোষণা
শ্রীমঙ্গলে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ শুরু, বর্ণাঢ্য র্যালি ও চেকপোস্ট কার্যক্রম শুরু
উলিপুরে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন
ধামরাইয়ে গাঁজাসহ নারী মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
৫ বছরে দেশে ২০ কোটি গাছ রোপণ করা হবে ত্রানমন্ত্রী
তিস্তার চর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে কাউনের সবুজ মাঠ