ঢাকা রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

যৌন সহিংসতা - সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার তীব্র সংকটে বাংলাদেশ


আব্দুর রউফ photo আব্দুর রউফ
প্রকাশিত: ২৩-৫-২০২৬ দুপুর ৩:৪৬

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ও নারীদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, সামাজিক অস্থিরতা এবং নাগরিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আসন্ন ঈদুল আজহা উৎসবের প্রাক্কালে আইনশৃঙ্খলার এই গুরুতর অবনতি সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, সুরক্ষার এই অভাব কেবল মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি করছে না, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতার ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

 গত ১৯ মে ঢাকার পল্লবীতে আট বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে নির্যাতনের পর নৃশংসভাবে হত্যা এবং এর পরপরই ২১ মে চট্টগ্রামে চার বছরের আরেক শিশুকে যৌন নির্যাতনের ঘটনার পর দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রামে ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তকে পুলিশ ভ্যান থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে হয় এবং বিক্ষুব্ধ জনতা একটি সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে

দেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ২১ মে ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এক বিশেষ বুলেটিনে দেশের সামগ্রিক শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও আইনি প্রয়োগের দুর্বলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। তাদের সংকলিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী:

যৌন সহিংসতার শিকার: চলতি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত পাঁচ মাসেরও কম সময়ে দেশে অন্তত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

নৃশংসতা ও প্রাণহানি: নির্যাতনের পর অন্তত ১৪ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে এবং সামাজিক গ্লানি ও অপমানে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে ২ জন শিশু।

মামলার সংখ্যায় আশঙ্কাজনক ঊর্ধ্বগতি: সরকারি ও পুলিশি উপাত্তের বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা গত ফেব্রুয়ারি মাসে ছিল ১,১৮১টি, যা মার্চে ১,৪২৫টি এবং এপ্রিল মাসে লাফিয়ে বেড়ে ২,০১১টি-তে দাঁড়িয়েছে [সূত্র: এএফপি (রিপোর্ট, ২২ মে, ২০২৬)] ।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই পরিসংখ্যান কেবল নথিভুক্ত মামলার হিসাব মাত্র। লোকলজ্জা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে বহু ঘটনা এখনো আড়ালে থেকে যাচ্ছে, যা প্রকৃত পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একে অপরের পরিপূরক। যখন কোনো সমাজে নাগরিকেরা, বিশেষ করে পরিবার ও শিশুরা মৌলিক নিরাপত্তা হারাতে শুরু করে, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে।

 

১. বাজার গতিশীলতা হ্রাস: আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের তরল অর্থের প্রবাহ ঘটে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলার বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের রাতের বাজারে যাতায়াত এবং উৎসবকেন্দ্রিক কেনাকাটা সীমিত হয়ে পড়েছে।

২. ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় স্থবিরতা: উৎসবের এই সময়ে নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে নারী ও শিশুদের উপস্থিতি কমছে, যা খুচরা ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

৩. বিনিয়োগে অনীহা: দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও ক্ষোভের পরিবেশ দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস করে, যা অর্থনৈতিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে।

পল্লবীর ঘটনার পর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে এবং ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে কোনো নিবন্ধিত আইনজীবী এই আসামির পক্ষে আদালতে লড়বেন না। তবে সরকারি জোরালো আশ্বাস সত্ত্বেও অভিভাবক মহলে উদ্বেগ কমেনি। ঢাকার মিরপুর এলাকার একজন অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সামগ্রিক পরিবেশ এতটাই উদ্বেগজনক যে সন্তানদের একা বাইরে পাঠাতে বা স্কুলে পাঠাতেও আমরা প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকছি।"

সুপ্রিম কোর্ট এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক -এর একটি যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের আওতায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশের ক্ষেত্রে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয় এবং প্রায় ৭০ শতাংশ আসামিই তদন্তের দুর্বলতা, সাক্ষীর অভাব বা দীর্ঘসূত্রিতার কারণে খালাস পেয়ে যায়।

এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আইনি বিশেষজ্ঞরা ৫টি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন:

১. দ্রুত বিচার ও ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থার সংস্কার: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বিধান অনুযায়ী, বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করার বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে বজায় রাখতে হবে।

২. তদন্তের আধুনিকায়ন ও বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণ: মামলার রায় যেন কেবল মৌখিক সাক্ষীর ওপর নির্ভর না করে, সেজন্য ডিএনএ টেস্ট ও ফরেনসিক ল্যাবের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে এবং পুলিশি তদন্তকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।

৩. ভিকটিম ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে মামলার ভুক্তভোগী পরিবার এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য অবিলম্বে আইন পাস করা জরুরি।

৪. দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিতকরণ: অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে অপরাধীদের আইনানুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দ্রুত কার্যকর করা, যা সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমাতে 'ডিটারেন্ট' বা প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে।

৫. সামাজিক প্রতিরোধ ও নৈতিক শিক্ষা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিক শিক্ষা এবং লিঙ্গ সমতা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সিসিটিভি নজরদারি জোরদার করা।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের প্রধান শর্ত হলো অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) লিগ্যাল রাইটস কো-অর্ডিনেটর আবু আহমেদ ফয়জুল কবির আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, "বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং অতীতে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতিই বর্তমান গণ-অসস্তোষ ও জনমনে তীব্র ক্ষোভের মূল কারণ।" [সূত্র: রয়টার্স/সিএনএ, ২২ মে, ২০২৬] ।

আসন্ন ঈদুল আজহার আগে যদি রাষ্ট্র ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে আস্থার সংকট দূর করতে না পারে, তবে এই সামাজিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তাহীনতা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দীর্ঘ মেয়াদে এক অপূরণীয় ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে।

এমএসএম / এমএসএম

যৌন সহিংসতা - সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার তীব্র সংকটে বাংলাদেশ

প্রাণীসম্পদ খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপ দিতে কাজ করছে সরকার : শাহজামান খান

দলিল বাণিজ্যের অন্দরমহল

ঢাকার সড়কে "এআই নজরদারি": ডিজিটাল মামলার ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ট্রাফিক চিত্র

ব্লাডব্যাংকের নামে মরন ফাঁদ, মিছে বাঁচার আশা

জালিয়াতির মাধ্যমে বিআরটিএ’র দালাল রুবেল এখন কোটিপতি

পেঁয়াজ কেলেঙ্কারিতে স্টান্ড রিলিজের পর বহাল তবিয়তে বনি আমিন খান

জাগৃক এর প্রধান অফিস থেকে নথি গায়েব চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপে অভিযুক্তকে বাঁচানোর চেষ্টা

মোবাইল অ্যাপে ঋণের ফাঁদ এক সপ্তাহেই অস্বাভাবিক সুদ, ‎দেরি হলেই হুমকি-হয়রানি

ড্রেজার ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীদের কাছে কয়েক হাজার কৃষক জিম্মি

রায়ের কপি’ বেঁচে প্রতারকচক্র একেকজন কোটিপতি, প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকসা কল্যাণ সমিতির

কাস্টমস’র বন্ড এর যুগ্ম কমিশনার কামরুলের বিরুদ্ধে সাংবাদিক নির্যাতনে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অভিযোগ

চাকরির প্রলোভনে কোটি টাকার প্রতারণা