ঢাকার সড়কে "এআই নজরদারি": ডিজিটাল মামলার ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ট্রাফিক চিত্র
রাজধানীর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ এই আধুনিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা ৭ মে ২০২৬ থেকে কার্যকর করা শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে শহরের প্রধান এবং ব্যস্ততম কিছু ইন্টারসেকশনে বিশেষ এআই ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ ও "ই-প্রসিকিউশন" বা ডিজিটাল মামলা দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের সনাতন বা ম্যানুয়াল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর এই পদক্ষেপে সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং চালকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতায় একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ সূত্র এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এআই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা মূলত সিসিটিভি ক্যামেরা, উচ্চগতির প্রসেসিং সফটওয়্যার এবং বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের সমন্বিত সংযোগে পরিচালিত হচ্ছে। সড়কগুলোতে স্থাপিত পিটিজেড (প্যান-টিল্ট-জুম) ও বিশেষ এআই লেন্সযুক্ত ক্যামেরাগুলো সার্বক্ষণিকভাবে যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। যখন কোনো যানবাহন ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে বা নির্দিষ্ট লেন অতিক্রম করে, তখন সফটওয়্যারে পূর্বনির্ধারিত ভার্চুয়াল লাইন বা কোডিং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। আইন লঙ্ঘনের সাথে সাথে এআই সিস্টেম ব্যাক-এন্ডে নূন্যতম ২৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ এবং স্থিরচিত্র প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করে। এই স্বয়ংক্রিয় ডেটা সরাসরি ট্রাফিক বিভাগের কেন্দ্রীয় সার্ভারে স্থানান্তরিত হয় এবং সেখানে ডিজিটাল মামলার কাগজ বা প্রসিকিউশন কেস তৈরি করা হয়।
সার্ভারে মামলার কাগজ প্রস্তুত হওয়ার পর, গাড়ির নম্বর প্লেট বিশ্লেষণ করে বিআরটিএ-র ডেটাবেজ থেকে মালিকের নিবন্ধিত নাম, স্থায়ী ঠিকানা এবং মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করা হয়। এরপর প্রযুক্তির মাধ্যমে গাড়ির মালিক বা চালকের মোবাইল ফোনে একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা (এসএমএস) পাঠানো হয়। এই খুদে বার্তায় একটি নির্দিষ্ট ওয়েব লিংক সংযুক্ত থাকে, যেখানে ক্লিক করলে চালক বা মালিক কোন স্থানে, কোন সময়ে এবং কী ধরনের ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেছেন, তার বিস্তারিত বিবরণ এবং ভিডিও ও স্থিরচিত্রের প্রমাণ দেখতে পারেন। একই সাথে আইনগত বাধ্যবাধকতার অংশ হিসেবে ডাক বিভাগের মাধ্যমে অপরাধের বিবরণ ও জরিমানার চিঠি মালিকের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে ঢাকার সড়কগুলোতে এআই ক্যামেরা মূলত চার থেকে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ট্রাফিক নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করছে। এর মধ্যে রয়েছে লাল বাতি বা সিগন্যাল অমান্য করা, সিগন্যালে দাঁড়ানোর সময় পথচারী পারাপারের দাগ বা স্টপ লাইনের সীমানা অতিক্রম করে গাড়ি দাঁড়ানো (জেব্রা ক্রসিং লঙ্ঘন), সড়কের নির্ধারিত লেনের বিপরীতে উল্টো পথে গাড়ি চালানো, মোটরবাইক চালক বা আরোহীর মাথায় হেলমেট না থাকা এবং নির্ধারিত বাস স্টপেজ ছাড়া মূল সড়কে গাড়ি থামিয়ে বা বাম দিকের ফ্রি-লেন বন্ধ করে অবৈধ পার্কিংয়ের মাধ্যমে যানজট সৃষ্টি করা। এছাড়াও চালক বা সহযাত্রীর সিট বেল্ট বাঁধা আছে কিনা এবং মোটরসাইকেলে অতিরিক্ত যাত্রী বা ‘ট্রিপল রাইডিং’ হচ্ছে কিনা, তাও এই ক্যামেরার লেন্স নিখুঁতভাবে ধরতে সক্ষম।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে হওয়া এসব মামলার জরিমানা অনলাইনের মাধ্যমে বা সরাসরি ট্রাফিক অফিসে গিয়ে পরিশোধ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যদি কোনো গাড়ির মালিক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই স্বয়ংক্রিয় জরিমানা পরিশোধ না করেন, তবে বিআরটিএ-র সার্ভারে গাড়িটি কালো তালিকাভুক্ত বা ব্লক হয়ে যাবে, যার ফলে পরবর্তীতে ওই গাড়ির ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন নবায়ন বা অন্য কোনো আইনি সেবা পাওয়া যাবে না। ট্রাফিক বিভাগের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় রয়েছে অপরাধীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি জরিমানা কেটে নেওয়ার ব্যবস্থা এবং চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পয়েন্ট কাটার (ডিমেরিট পয়েন্ট) পদ্ধতি চালু করা।
রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করার লক্ষ্যে ডিএমপি একটি ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। প্রাথমিক পাইলট প্রকল্পের আওতায় ঢাকার অত্যন্ত ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ আটটি সিগন্যাল পয়েন্টকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যেই ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, শাহবাগ, বাংলা মোটর, কারওয়ান বাজার, সোনারগাঁও এবং বিজয়সরণী মোড়ে এই ক্যামেরাগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ করছে। বাকি পয়েন্টগুলোর কারিগরি কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। ট্রাফিক বিভাগের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই প্রযুক্তি মহানগরের আরও ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ স্পটে সম্প্রসারিত করা হবে এবং আগামী এক বছরের মধ্যে পুরো ঢাকা শহরের ১২০টি প্রধান ট্রাফিক সিগন্যাল পয়েন্টকে এই এআই ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা হবে। দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার প্রায় ৫০০টি গুরুত্বপূর্ণ রোড জাংশন বা মোড়কে এই প্রযুক্তির অধীনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে শহরের সামগ্রিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ডিজিটাল রূপ নেবে।
চলতি মে ২০২৬-এর প্রথম দুই সপ্তাহেই এই সিস্টেমের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। প্রাথমিক নজরদারিতেই প্রায় ৩,০০০-এর বেশি গাড়ি ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করার দৃশ্য সার্ভারে ভিডিও আকারে জমা হয়েছে। ট্রাফিক বিভাগ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে এই ফুটেজগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করছে। এর মধ্যে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে ইতিমধ্যেই ৪০০ থেকে ৫০০টি সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল মামলার নোটিশ চূড়ান্ত করে গাড়ির মালিকদের কাছে পাঠানো শুরু হয়েছে।
নতুন এই প্রযুক্তি চালুর ফলে ঢাকার সড়কগুলোতে চালকদের আচরণে একটি দৃশ্যমান মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে অনেক চালকই ফাঁকা রাস্তা পেলে বা ট্রাফিক সার্জেন্টের অনুপস্থিতি অনুধাবন করলে সিগন্যাল অমান্য করে চলে যেতেন। কিন্তু এখন সড়কের ওপরে দৃশ্যমান এআই ক্যামেরার উপস্থিতি চালকদের মধ্যে এক ধরনের সচেতনতা এবং আইনি ভয় তৈরি করেছে। বিজয়সরণী বা বাংলা মোটরের মতো ব্যস্ত মোড়গুলোতে দেখা যাচ্ছে, গভীর রাতে বা রাস্তা সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকলেও চালকরা স্বউদ্যোগে লাল বাতি দেখে স্টপ লাইনের পেছনে গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষা করছেন। চালকদের একাংশের মতে, এই সিস্টেমে ভিডিও ক্লিপ ও প্রমাণ সংরক্ষিত থাকায় অপরাধ না করে মামলার শিকার হওয়া বা ট্রাফিক পুলিশের সাথে অনর্থক বাগবিতণ্ডার কোনো সুযোগ নেই। প্রযুক্তির এই স্বচ্ছতার কারণে চালকরা নিজেদের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে, মাঠপর্যায়ে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশ এবং সার্জেন্টরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একটি গাড়িকে থামিয়ে মামলার কাগজ তৈরি করতে যেখানে পাঁচ থেকে দশ মিনিট সময় লাগত এবং পেছনের লেনে দীর্ঘ যানজট তৈরি হতো, এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে সেই ভোগান্তি দূর হচ্ছে। একই সাথে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আসা আইনি তদবির, সুপারিশ বা অনৈতিক প্রভাব খাটানোর সুযোগ বন্ধ থাকায় পুলিশ সদস্যরাও মানসিক স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
এআই ট্রাফিক সিস্টেমের এই আধুনিক সূচনাকে সাধুবাদ জানালেও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও ব্যবহারকারীরা কিছু বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথম এবং প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ঢাকার সড়কগুলোতে চলাচলকারী বহু যানবাহনের অস্পষ্ট, ভাঙা বা অনুমোদিত নকশাবহির্ভূত নম্বর প্লেট। এআই সিস্টেমের নিখুঁতভাবে কাজ করার জন্য স্পষ্ট নম্বর প্লেট এবং রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (আরএফআইডি) ট্যাগ থাকা আবশ্যিক। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই নম্বর প্লেট জালিয়াতি করে একাধিক গাড়িতে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ডিজিটাল মামলার ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করার কাজে বড় জটিলতা তৈরি করতে পারে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলালায় ডিএমপি এবং বিআরটিএ আগামী সপ্তাহ থেকেই অনুমোদিত ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ ছাড়া চলাচলকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ঢাকার মূল সড়কগুলোতে রিকশা, অটোরিকশা এবং লেগুনার মতো ধীরগতির ও অননুমোদিত যানবাহনের আধিক্য রয়েছে, যেগুলোর কোনো ডিজিটাল ডেটাবেজ নেই। এই মিশ্র ট্রাফিক ব্যবস্থার মধ্যে এআই ক্যামেরার শতভাগ কার্যকারিতা বজায় রাখা একটি বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেভাবে সুপরিকল্পিতভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্রাফিক ব্যবস্থার সুফল নিশ্চিত করছে, আমাদের দেশেও তেমন সুনির্দিষ্ট পলিসিগত সংস্কার প্রয়োজন। যথাযথ কারিগরি প্রস্তুতি ও বিআরটিএ সার্ভারের সক্ষমতা পুরোপুরি না বাড়িয়ে তড়িঘড়ি করে কাটিং-এজ প্রযুক্তি মাঠে নামালে তা দীর্ঘমেয়াদে ভেস্তে যেতে পারে। এছাড়াও, সাধারণ চালকদের একটি বড় অংশ এখনো এই ডিজিটাল মামলার আইনি প্রক্রিয়া, জরিমানা পরিশোধের নিয়ম এবং ক্যামেরার আওতাধীন অপরাধগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না, কারণ এই বিষয়ে ব্যাপক ও প্রচার-প্রচারণার অভাব রয়েছে। তবে ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ এই সীমাবদ্ধতাগুলো স্বীকার করে জানিয়েছে, নতুন প্রযুক্তির প্রবর্তনে কিছু প্রাথমিক ভুলত্রুটি বা সমন্বয়হীনতা থাকা স্বাভাবিক এবং গণমাধ্যমের সহায়তায় সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে এই মেগাসিটির ট্রাফিক ব্যবস্থাকে একটি আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডে নিয়ে যেতে তারা বদ্ধপরিকর।
এমএসএম / এমএসএম
দলিল বাণিজ্যের অন্দরমহল
ঢাকার সড়কে "এআই নজরদারি": ডিজিটাল মামলার ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ট্রাফিক চিত্র
ব্লাডব্যাংকের নামে মরন ফাঁদ, মিছে বাঁচার আশা
জালিয়াতির মাধ্যমে বিআরটিএ’র দালাল রুবেল এখন কোটিপতি
পেঁয়াজ কেলেঙ্কারিতে স্টান্ড রিলিজের পর বহাল তবিয়তে বনি আমিন খান
জাগৃক এর প্রধান অফিস থেকে নথি গায়েব চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপে অভিযুক্তকে বাঁচানোর চেষ্টা
মোবাইল অ্যাপে ঋণের ফাঁদ এক সপ্তাহেই অস্বাভাবিক সুদ, দেরি হলেই হুমকি-হয়রানি
ড্রেজার ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীদের কাছে কয়েক হাজার কৃষক জিম্মি
রায়ের কপি’ বেঁচে প্রতারকচক্র একেকজন কোটিপতি, প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকসা কল্যাণ সমিতির
কাস্টমস’র বন্ড এর যুগ্ম কমিশনার কামরুলের বিরুদ্ধে সাংবাদিক নির্যাতনে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অভিযোগ
চাকরির প্রলোভনে কোটি টাকার প্রতারণা
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে নিয়োগ বাণিজ্যের কেলেঙ্কারি: খাতা রাখা হলো থানা হেফাজতে