কুরিয়ারে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে জাল টাকা
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সারাদেশে কোরবানির পশুর হাট জমে উঠেছে। এসব পশুর হাটে কোটি কোটি টাকার লেনদেন করেন ক্রেতা ও বিক্রেতাগণ। আর এই লেনদেনকে পুঁজি করে মৌসুমী জাল নোটের ব্যবসায়ী ও কারীগররা সক্রিয় হয়েছে। জাল নোটের কারিগর ও ব্যবসায়ীরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বার বার গ্রেফতার হলেও ঈদের আগে আদালতের ফাঁক দিয়ে বেড়িয়ে আবারো পুরনো পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন।
রাজধানীর মিরপুর এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে জাল টাকার নোট ও জাল নোট তৈরির সরঞ্জামসহ এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ সময় তার কাছ থেকে ৯০ হাজার ১০০ টাকার জাল নোট উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতার ব্যক্তির নাম জিসান আলম। তিনি ঢাকার সাভারের কাউন্দিয়া এলাকার বাসিন্দা।
মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, শনিবার দিবাগত ভোররাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মিরপুরের ৬০ ফিট সড়কের বারেক মোল্লা মোড় এলাকায় একটি কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসে অভিযান চালানো হয়। মিরপুর মডেল থানার ওসির নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে জিসান আলমকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার কাছে থাকা একটি শপিং ব্যাগের ভেতর দুটি কার্টন বক্স থেকে বিভিন্ন মূল্যমানের মোট ৯০ হাজার ১০০ টাকার জাল নোট উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারকৃত যুবক পুলিশের প্রার্থমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তিনি পলাতক তৌফিক ইসলাম অর্ণব নামের আরেক সহযোগীকে নিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে জাল নোট অন্যত্র পাঠাতে এসেছিলেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অর্ণব পালিয়ে যান। আর জব্দ করা আলামতের মধ্যে রয়েছে, একটি সিপিইউ, একটি মনিটর ও একটি পেনড্রাইভ। এ ঘটনায় উপপরিদর্শক (এসআই) মামুন হোসেন বাদী হয়ে মিরপুর মডেল থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেছেন। পুলিশ পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
অপরদিকে কক্সবাজারের টেকনাফে জাদিমুড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে কোটি টাকার জালনোটসহ দুই যুবককে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ সময় জালনোট তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়। আটকরা হলেন- ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আলাউদ্দিনের ছেলে নাজমুল (২৮) এবং শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আবুল কালামের ছেলে আজিজুর রহমান (৩০)। ২৪ মে বিকালে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুড়া এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করে টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি)।
টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (২ বিজিবি) উপ-অধিনায়ক মেজর মুবাশ্বির নাকীব জানিয়েছেন, ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে জালনোট তৈরি চক্রের সদস্যরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন একটি বাড়িতে জালনোট তৈরি করছে- এমন তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়। পরে রোববার দুপুরে তাদের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে কোটি টাকার জালনোট ও টাকা তৈরির সরঞ্জামসহ দুইজনকে আটক করা হয়। নাজমুল ফেরিওয়ালার ছদ্মবেশে এই কার্যক্রম চালাতেন বলেও জানান তিনি। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে আট হাজার টাকা মূল্যের আসল বাংলাদেশি টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের আস্তানা থেকে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টিং মেশিন ও কাগজপত্র জব্দ করা হচ্ছে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
জানা গেছে, আসন্ন কোরবানি ঈদেও জাল টাকার মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনা বাড়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন ক্রেতা-বিক্রেতারা। পশুর ক্রেতা ও বিক্রেতারা বলছেন, প্রতিবছর কোরবানির মৌসুমে একটি সংঘবদ্ধ চক্র হাটগুলোকে টার্গেট করে জাল টাকার নোট বাজারে ছড়িয়ে দেয়। ঈদ সামনে রেখে গরুর হাট, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও গণপরিবহণে এই চক্রের তৎপরতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। সাধারণ প্রিন্টার, বিশেষ কাগজ, জলছাপ ও গাম ব্যবহার করে এমন সূক্ষ্মভাবে নোট তৈরি করছে চক্রের সদস্যরা, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা কঠিন। কিছু ক্ষেত্রে জাল নোট শনাক্তকারী সাধারণ মেশিনেও তা ধরা পড়ছে না বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সূত্র জানায়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গোপনে গড়ে উঠেছে জাল নোট তৈরির কারখানা। সারা বছর উৎপাদন করা নোটগুলো পশুর হাটসহ মার্কেটগুলোতে ছড়িয়ে দিতে মাঠে সক্রিয় থাকে কয়েকটি চক্র। এ চক্রের কথা চিন্তা করে রাজধানীর প্রতিটি পশুর হাটে জাল টাকা প্রতিরোধে তৎপরতা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এছাড়া পশুর হাটগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও পুলিশের পক্ষ থেকে জাল নোট শনাক্তকারী মেশিন বসানো হয়েছে। কোরবানির পশু কেনাবেচায় জাল নোটের বিস্তার ঠেকাতে প্রতিটি হাটে ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং লেনদেনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
গত ১৯ মে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের হাউজিং সোসাইটি এলাকা থেকে মো. সজিব হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে র্যাব-৪। এসময় তার কাছ থেকে ১৮ হাজার ৯০০ টাকার জাল নোট, একটি ল্যাপটপ ও জাল টাকা তৈরির মেশিন উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালে জাল নোট তৈরি ও সরবরাহের অভিযোগে র্যাব-২ মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।র্যাব-৪ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) কে এন রায় নিয়তি বলেছেন, মোহাম্মদপুরের হাউজিং সোসাইটি এলাকায় একটি বাড়িতে জাল টাকা তৈরির কার্যক্রম চলছিল, এমন তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব-৪ এর একটি আভিযানিক দল অভিযান চালায়। এসময় সজিব নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে ১৮ হাজার ৯০০ টাকার জাল নোট, একটি ল্যাপটপ ও জাল টাকা তৈরির মেশিন উদ্ধার করা হয়।
র্যাব জানায়, গ্রেফতারকৃত সজিব প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নিজেকে পেশাদার জাল টাকা প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ী হিসেবে স্বীকার করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি একটি বাসায় জাল নোট তৈরি করে বাজারজাত করছিলেন। ফেসবুকের মাধ্যমে বরিশালের চৌমাথা এলাকার এক ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি জাল নোট প্রিন্টের পিডিএফ কপি সংগ্রহ করতেন। সারাবছর জাল নোট সরবরাহ করলেও আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে নগদ টাকার লেনদেন বেশি হওয়ায় এই সময়কে টার্গেট করেছিলেন। এরইমধ্যে তিনি চট্টগ্রাম ও সাভারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ জাল নোট সরবরাহ করেছেন।’ গত ১৩ মে রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে জাল নোট তৈরির সরঞ্জামসহ কামরুল ইসলাম ও নিষাদ হোসেন নামে দুজনকে গ্রেফতার করে র্যাব-৩। এসময় তাদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা মূল্যমানের ৪০টি জালনোট (২০ হাজার টাকা) উদ্ধার করা হয়। এছাড়া জাল টাকা তৈরির কাজে ব্যবহৃত একটি সিপিইউ, মনিটর, স্ক্যানার, কালার প্রিন্টার, কি-বোর্ড, মাউস, সংযোগ ক্যাবল এবং এক রিম সাদা কাগজ জব্দ করা হয়।
র্যাব-৩ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মতিঝিল থানার কমলাপুর বাজার রোডের একটি সাইবার নেট ক্যাফেতে অভিযান চালানো হয়। এসময় জালনোট তৈরির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ওই দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃতরা দীর্ঘদিন ধরে জাল টাকা প্রস্তুত করে ঢাকা মহানগরীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছিল। তারা জালনোটকে আসল টাকা হিসেবে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। মূলত ঈদকে টার্গেট করে এসব জাল নোট বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
আর চলতি মাসের গত ১৪ মে রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানার সমবায় বাজার (বিডিআর) মার্কেটের সামনে থেকে মজিবুর রহমান নামে একজনকে চার লাখ জাল টাকা ও জাল টাকা বিক্রির নগদ ৪০ হাজার টাকাসহ গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন গাজীপুর মহানগর বাসন থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুলাল মৃধা ও মামুন নামে আরও দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে আরও ৩০ লাখ জাল টাকা, জাল টাকা তৈরির কাজে ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ, তিনটি কালার প্রিন্টার, এক রোল সোনালি রঙের ফয়েল পেপার, ২০০টি সিকিউরিটি ট্যাগ ও জলছাপ সংবলিত সাদা কাগজ, ১০০টি একপাশে ১০০০ টাকার প্রিন্ট করা কাগজ অপর পাশে সাদা, দুই লিটারের দুটি তরল জাতীয় গাম, একটি কাটার এবং জলছাপ বসানোর দুটি ডাইস উদ্ধার করা হয়।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেছেন, গ্রেফতারকৃতরা আন্তঃজেলা জাল টাকা তৈরি চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা দীর্ঘদিন ধরে জাল টাকা তৈরি করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক মামলা রয়েছে। কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে জাল টাকা চক্রের কারবারিদের ওপর বিশেষ নজর রাখা হয়েছে। এছাড়া গরুর হাট কিংবা অন্য কোথায়ও যে কেউ জাল টাকা সরবরাহ করতে না পারে, সেদিক নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছে।
#
এমএসএম / এমএসএম
কুরিয়ারে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে জাল টাকা
শুল্কফাঁকি দিয়ে অ’বৈধ বাজাজ সিএনজি আমদানির নামে শত কোটি টাকার মালিক এখন হাজী আব্দুর রশিদ বুলু
যৌন সহিংসতা - সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার তীব্র সংকটে বাংলাদেশ
প্রাণীসম্পদ খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপ দিতে কাজ করছে সরকার : শাহজামান খান
দলিল বাণিজ্যের অন্দরমহল
ঢাকার সড়কে "এআই নজরদারি": ডিজিটাল মামলার ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ট্রাফিক চিত্র
ব্লাডব্যাংকের নামে মরন ফাঁদ, মিছে বাঁচার আশা
জালিয়াতির মাধ্যমে বিআরটিএ’র দালাল রুবেল এখন কোটিপতি
পেঁয়াজ কেলেঙ্কারিতে স্টান্ড রিলিজের পর বহাল তবিয়তে বনি আমিন খান
জাগৃক এর প্রধান অফিস থেকে নথি গায়েব চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপে অভিযুক্তকে বাঁচানোর চেষ্টা
মোবাইল অ্যাপে ঋণের ফাঁদ এক সপ্তাহেই অস্বাভাবিক সুদ, দেরি হলেই হুমকি-হয়রানি
ড্রেজার ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীদের কাছে কয়েক হাজার কৃষক জিম্মি