ঢাকা রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬

দলিল বাণিজ্যের অন্দরমহল


নিজস্ব প্রতিবেদক photo নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৬-৫-২০২৬ বিকাল ৬:১২

দেশের বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দীর্ঘদিন ধরেই ঘুষ, দালালচক্র, জালিয়াতি, অতিরিক্ত ফি আদায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভূমি ও দলিল নিবন্ধন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটি এখনো নানা ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মে জর্জরিত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান, মামলা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমছে না।

‎বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে স্বচ্ছতা, ডিজিটাল মনিটরিং এবং দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিত না হলে ভূমি নিবন্ধন খাতের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

‎অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও ঘুষের অভিযোগ: চলতি বেছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ফরিদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সাবেক সাব-রেজিস্ট্রারসহ পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। অভিযোগে বলা হয়, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দলিল নিবন্ধনের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং ঘুষ গ্রহণ করা হতো। জাতীয় দৈনিক এনটিভি অনলাইনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দলিলপ্রতি নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়াও বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হতো।

‎স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দলিল নিবন্ধনের প্রতিটি ধাপে ‘অনানুষ্ঠানিক ফি’ না দিলে ফাইল আটকে রাখা হতো। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে দালাল বা অফিস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করতেন।

‎অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ: গত বছরের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত ঢাকা পোস্টের এক প্রতিবেদনে গাজীপুরের টঙ্গীর সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মো. নুরুল আমীন তালুকদারের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তার পরিবারের নামে প্রায় ১১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে এবং প্রায় ৩২ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগ ওঠে, সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে বৈধ আয়ের সঙ্গে তার সম্পদের অসামঞ্জস্য রয়েছে। এ ঘটনায় ভূমি নিবন্ধন খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির চিত্র নতুন করে সামনে আসে।

‎বিশ্লেষকরা বলছেন, সাব-রেজিস্ট্রারদের একটি অংশের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থাকলেও কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহির অভাবের কারণে এসব অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে না।

‎সরকারি জমি জালিয়াতির অভিযোগ: চট্টগ্রামে সরকারি লিজকৃত জমি অবৈধভাবে বিক্রি ও ব্যাংকে বন্ধক রাখার অভিযোগে চলতি বছরের মার্চ মাসে এক সাব-রেজিস্ট্রারসহ দুইজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি জমির দলিল প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

‎ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, দলিল যাচাই ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় যথাযথ মনিটরিং না থাকলে সরকারি জমিও জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যক্তিমালিকানায় চলে যেতে পারে। এতে রাষ্ট্রের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়।

‎প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও প্রত্যাহার: সম্প্রতি সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। যুগান্তর ও কালবেলার প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

‎স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, দালালনির্ভর কার্যক্রম এবং ঘুষ ছাড়া কাজ না হওয়ার সংস্কৃতি সেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল একজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; পুরো ব্যবস্থাকে সংস্কার করতে হবে।

‎দালালচক্র ও ঘুষের হাটবাজার: এর আগে দেশের ৩৫টি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে অভিযান চালিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন নানা অনিয়মের প্রমাণ পায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দলিল নিবন্ধন, নকল উত্তোলন ও তল্লাশিসহ বিভিন্ন সেবায় ঘুষ ছাড়া কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

‎দুদকের অভিযানে কোথাও দালালদের মাধ্যমে টাকা আদায়ের প্রমাণ, কোথাও অফিস সহকারীদের মাধ্যমে ঘুষ লেনদেন, আবার কোথাও সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির তথ্য উঠে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘অঘোষিত সিন্ডিকেট’ কাজ করছে। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে কিছু অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং স্থানীয় দালালচক্র জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

‎সাধারণ মানুষের ভোগান্তি: ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, জমি ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল নিবন্ধনে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ধরা, ফাইল আটকে রাখা বা অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়ার মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের চাপ সৃষ্টি করা হয়। অনেকে জানান, সরকারি ফি পরিশোধের পরও দালাল ছাড়া দ্রুত সেবা পাওয়া কঠিন। এতে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মানসিক হয়রানিরও শিকার হন।

‎বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্পূর্ণ ডিজিটাল দলিল নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা, অনলাইন ফি পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা, দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা, প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে সিসিটিভি ও কেন্দ্রীয় মনিটরিং চালু করা, সম্পদের হিসাব নিয়মিত যাচাই করা এবং দুর্নীতির অভিযোগে দ্রুত বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভূমি নিবন্ধন খাতে দুর্নীতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে। তারা বলছেন, ভূমি ও দলিল নিবন্ধন খাত দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এই খাতে দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে।

‎গত ছয় মাসে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্র ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে যে, দেশের বহু সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে এখনো ঘুষ, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দালালনির্ভর সেবা কার্যক্রম বিদ্যমান। যদিও দুদক ও প্রশাসনের কিছু পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে, তবে টেকসই সংস্কার ছাড়া এই দুর্নীতির চক্র ভাঙা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বচ্ছতা

এমএসএম / এমএসএম

দলিল বাণিজ্যের অন্দরমহল

ঢাকার সড়কে "এআই নজরদারি": ডিজিটাল মামলার ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ট্রাফিক চিত্র

ব্লাডব্যাংকের নামে মরন ফাঁদ, মিছে বাঁচার আশা

জালিয়াতির মাধ্যমে বিআরটিএ’র দালাল রুবেল এখন কোটিপতি

পেঁয়াজ কেলেঙ্কারিতে স্টান্ড রিলিজের পর বহাল তবিয়তে বনি আমিন খান

জাগৃক এর প্রধান অফিস থেকে নথি গায়েব চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপে অভিযুক্তকে বাঁচানোর চেষ্টা

মোবাইল অ্যাপে ঋণের ফাঁদ এক সপ্তাহেই অস্বাভাবিক সুদ, ‎দেরি হলেই হুমকি-হয়রানি

ড্রেজার ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীদের কাছে কয়েক হাজার কৃষক জিম্মি

রায়ের কপি’ বেঁচে প্রতারকচক্র একেকজন কোটিপতি, প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকসা কল্যাণ সমিতির

কাস্টমস’র বন্ড এর যুগ্ম কমিশনার কামরুলের বিরুদ্ধে সাংবাদিক নির্যাতনে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অভিযোগ

চাকরির প্রলোভনে কোটি টাকার প্রতারণা

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে নিয়োগ বাণিজ্যের কেলেঙ্কারি: খাতা রাখা হলো থানা হেফাজতে

ঢাকা দক্ষিণ ও পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেটে বহিরাগতদের নেতা সুকান্ত হালদার দৌরাত্ম্য