কবি বাঙ্গাল আবু সঈদের জন্মবার্ষিকীতে নিভৃতচারী সাহিত্যিকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা
আজ কবি বাঙ্গাল আবু সঈদের জন্মদিবস। ১৯১৫ সালের ২০ জুলাই অবিভক্ত বাংলার বৃহত্তর যশোর জেলার নড়াইলে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। নড়াইলের রত্নগর্ভা মাটিতে জন্ম নিয়েছেন অনেক খ্যাতিমান পুরুষ, যেমন পণ্ডিত রবিশংকর, পণ্ডিত উদয়শংকর, কথাশিল্পী নীহাররঞ্জন গুপ্ত, চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান, প্রখ্যাত চারণকবি বিজয় সরকার ও চারণকবি মোখলেসউদ্দিন প্রমুখ। অনেকে পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে এলেও অনেকেই চিরকাল রয়ে গেছেন অগোচরে ও নিভৃতে। এমনি একজন অসাধারণ প্রতিভাবান মানুষ হলেন কবি বাঙ্গাল আবু সঈদ, যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর প্রাপ্য যোগ্য স্বীকৃতি পাননি।
এক জীবনে যিনি প্রায় একশত বই রচনা করেছেন, তাঁর জীবন যে অত্যন্ত সৃজনশীল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটি ছিল তাঁর অন্তরালের জীবন, আর বহির্দুনিয়ায় তিনি ছিলেন একজন পরম রাজনীতি-সচেতন যোদ্ধা। রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংস্পর্শ পেয়েছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও ট্র্যাজিক নেতা মাওলানা ভাসানীর মতো দেশবরেণ্য রাজনীতিকদের। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সাথেও তাঁর পারিবারিক পর্যায়ে চমৎকার সম্পর্ক ছিল। সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ না করলেও তিনি দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন; আবার সমানতালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেও সরাসরি যোগ দিয়েছেন। এমন কর্মময় জীবন প্রমাণ করে বাঙ্গাল আবু সঈদ ছিলেন অসম্ভব এক প্রখর প্রাণশক্তির অধিকারী।
একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, তিনি যখনই তাঁর বহিঃস্থ রাজনৈতিক পৃথিবীতে চরম হতাশ হয়েছেন, রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষণে ক্ষণে ডিগবাজি ও প্রতিশ্রুতিভঙ্গ দেখেছেন, তখনই নিজের সেই অন্তর্দাহ ও হতাশা লুকাতে নিবিড়ভাবে মনোনিবেশ করেছেন সাহিত্য রচনায়। রাজপথের প্রতিবাদের সুর তিনি তুলে এনেছেন কলমের ধারালো নিবে; তীব্র শ্লেষে জড়িয়েছেন প্রতিবাদ ও অন্তরের ক্ষোভ। তিনি ছিলেন মূলত নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের পক্ষে এক আপসহীন কণ্ঠস্বর। সমাজ বদলের মহান ধ্যান নিয়ে কবি বাঙ্গাল আবু সঈদ কলম ধরেছিলেন। তাঁর ক্ষুরধার লেখনি তাঁকে গণআন্দোলনের এক নিভৃত নায়কে পরিণত করেছিল। আবু সঈদ রচিত গ্রন্থের সংখ্যা বিস্ময়কর ৮৭টি, যার ভেতরে উপন্যাসই সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া তাঁর অপ্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা আত্মজীবনীসহ পাঁচটি। এক জীবন ধরে তিনি একদিকে সমাজ পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি ও সমাজসেবা, অন্যদিকে অবিরাম সাহিত্য সাধনা করে গেছেন। শোষিত মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে এবং তৎকালীন শাসকদের জুলুম-অত্যাচারের জোর প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তিনি একাধিকবার কারাবরণও করেছেন।
তাঁর সামগ্রিক রচনায় একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন প্রতিফলিত হয়েছে। মানুষের সার্বিক মুক্তির জন্য তিনি কখনো প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন, আবার কখনো পরোক্ষ প্রতিবাদ হিসেবে তুলে নিয়েছেন কলম। তাঁর লেখায় একই সাথে তীব্র বিক্ষোভ ও তীক্ষ্ণ কৌতুকবোধের অসাধারণ সমন্বয় দেখা যায়। তাঁর লিখিত প্রবন্ধসমূহ সত্যবাদিতা ও নির্ভীকতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে। উপন্যাসসমূহে যেমন রোমান্টিকতা রয়েছে, তেমনি ফুটে উঠেছে সমাজের নানাবিধ অসঙ্গতির বাস্তব রূপ এবং এক শোষণহীন শান্তিময় পৃথিবীর স্বপ্ন। তিনি যে অত্যন্ত স্বশিক্ষিত ও আধুনিক মনের মানুষ ছিলেন, তার সুস্পষ্ট পরিচয় মেলে তাঁর রচনায়। তাঁর রচিত ‘বক্তৃতা শিক্ষা’ নামের বইটি পাঠ করলে যে কেউ বিস্মিত হবেন। আজ থেকে ৫০ বছর আগে রচিত সেই বইটিতে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার আমেরিকান পাঠ্যপুস্তকের (যেমন রেমন্ড ভি. লেসিকারের বই) যে সব বৈজ্ঞানিক পরামর্শ রয়েছে, তা অত্যন্ত চমৎকারভাবে সন্নিবেশিত হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে এটি ছিল তাঁর প্রজ্ঞার ফসল, কারণ তিনি নিজে ছিলেন এক প্রখ্যাত বাগ্মী।
পারিবারিক অ্যালবামে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর বিরল ছবি রয়েছে, কারণ তাঁরা একসঙ্গে রাজপথের রাজনীতি করতেন। তাঁর নামের ‘বাঙ্গাল’ অংশটি কোনো গালি নয়, এটি একটি সম্মানসূচক উপাধি, যা স্বয়ং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাঁকে প্রদান করেছিলেন। এ ছাড়া কবি বাঙ্গাল আবু সঈদ ছিলেন মাওলানা ভাসানীর অনুগত শিষ্য, যে কারণে তিনি নিজ নামের সাথে ‘ভাসানী’ যুক্ত করেছিলেন। জীবন সায়াহ্নে এসে এই নির্লোভ ও নিরহঙ্কারী মানুষটি কাফনের কাপড় গায়ে জড়িয়ে রাখতেন—মৃত্যুর অনিবার্যতা, জীবনের হ্রস্বতা ও নির্মোহ থাকার গভীর প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে। কবি বাঙ্গাল আবু সঈদের অমর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তাঁর সুযোগ্যা কন্যা মেরিনা সঈদ একটি ফাউন্ডেশন গড়ে তুলেছেন। এই মহান কীর্তিমানের স্মৃতি রক্ষার্থে নড়াইলে সরকারি পর্যায়ে একটি আধুনিক পাঠাগার ও জাদুঘর স্থাপন করা একান্ত প্রয়োজন, যা হবে এই যোগ্য মানুষকে যথাযথ সম্মান জানানোর এক স্থায়ী উদ্যোগ। জন্মদিবসে এই মহৎ মনীষীর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
এমএসএম / এমএসএম
তিস্তা নদী
ফুলি চাচির সম্ভাব্য রেডকার্ড
বাবার হুইল চেয়ার
কবি বাঙ্গাল আবু সঈদের জন্মবার্ষিকীতে নিভৃতচারী সাহিত্যিকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা
অপাঙ্ক্তেয়
“বীর তো আমার মা”
“ফলের গপ্পো (পুঁথি)”
“বহু ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ”
“বালিকা”
“রামিসার রক্তে সভ্যতার আত্মদহন”
“সৃষ্টিসুখের উল্লাসে”
“ এই শহর”