শান্তিনগরে অনুমোদনহীন ১১ তলা ভবন
* রাজউকের নোটিশের পরও নির্মাণ চলার অভিযোগ
* ৬ জুলাইয়ের অভিযান নিয়েও প্রশ্ন
* সাংবাদিককে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ
রাজধানীর শান্তিনগরের ৩১, পীর সাহেবের গলি এলাকায় রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই ১১ তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে দি উইলস হোমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। ভবনটিতে রাজউক অনুমোদিত নকশার দৃশ্যমান সাইনবোর্ড না থাকার পাশাপাশি নির্মাণবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জায়গা না ছেড়েই ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ভবন মালিক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা আরও স্পষ্ট হবে।
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হিসেবে সামনে এসেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউকের ভূমিকা। সংশ্লিষ্ট নথিতে ভবনটির নির্মাণ নিয়ে আইন লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ থাকার পরও নির্মাণকাজ চলমান থাকার অভিযোগ উঠেছে। এতে রাজউকের নোটিশের কার্যকারিতা, নোটিশ-পরবর্তী পদক্ষেপ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রাজউকের পরিচালক (জোন-৬) কার্যালয় থেকে জারি করা একটি নোটিশে শান্তিনগরের পীর সাহেবের গলিতে শরিফুল ইসলামের ভবন নির্মাণের বিষয়ে অনুমোদিত নকশা দাখিল ও কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবন মালিক বা নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত জবাব প্রদান করেননি। একই সঙ্গে সরেজমিন পরিদর্শনের পর নোটিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করার বিষয়টিও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজউকের ওই নোটিশে আরও বলা হয়, ভবন মালিক ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় দণ্ডনীয় অপরাধ করেছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮ এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০২৫-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী ভবনটির ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অনুমোদনের কথা জানানো হয়। পাশাপাশি রাজউক অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী অবৈধ অংশ অপসারণের পর পুনঃসংযোগের জন্য আবেদন করার কথাও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু নোটিশে এমন নির্দেশনার পরও বাস্তবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ভবনটির নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে তা অব্যাহত রয়েছে। ফলে রাজউকের নথিতে থাকা সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, রাজউকের নোটিশ যদি নির্মাণকাজ বন্ধ করতে না পারে, তাহলে নোটিশ জারির পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছেন। অবৈধ অংশ অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্নের প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হয়েছে কি না এবং পরবর্তী সময়ে ভবনটির বিষয়ে কোনো নতুন আদেশ জারি করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। গত ৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে ৪১/৫ সিদ্ধেশ্বরী খন্দকার গলি এলাকায় রাজউকের একটি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকায় অনিয়মপূর্ণ নির্মাণের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হলেও পীর সাহেবের গলির আলোচিত ১১ তলা ভবনটির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, রাজউকের নিজস্ব নথিতে যেখানে ভবনটির বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ রয়েছে, সেখানে পরিদর্শন ও অভিযানের পরও নির্মাণকাজ বন্ধে কেন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এদিকে ভবনটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমারত পরিদর্শক মো. শফিকুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তার চাকরি ও কর্ম-সম্পর্কিত তথ্য জানতে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ধারা ৮ অনুযায়ী রাজউকের কাছে আবেদন করা হয়। ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখের রাজউকের জবাব অনুযায়ী, ওই আবেদনে ছয় ধরনের তথ্য চাওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল চাকরিতে প্রথম যোগদানের তারিখ ও নিয়োগপত্রের অনুলিপি, যোগদানের পর থেকে পদায়ন ও বদলির তথ্য, পদোন্নতির তথ্য, পদাবনতি, বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা সাময়িক বরখাস্তের চূড়ান্ত আদেশ এবং বর্তমানে তিনি কোন জোন বা সাব-জোনে কর্মরত ও সেখানে যোগদানের অফিস আদেশ।
রাজউক লিখিত জবাবে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ধারা ৭(জ) ও ৭(ঝ) উল্লেখ করে চাওয়া তথ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না বলে জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে, চাওয়া তথ্যের কোন অংশ ব্যক্তিগত তথ্যের আওতায় পড়ে এবং কোন অংশ সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত—তা কি পৃথকভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে আলোচিত ভবনের পরিদর্শন, নোটিশ, নির্মাণকাজ বন্ধে সুপারিশ এবং নোটিশ-পরবর্তী সরকারি পদক্ষেপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি থাকলে সেগুলো জনস্বার্থে কতটা প্রকাশযোগ্য, সেটিও পর্যালোচনার দাবি উঠেছে। অন্যদিকে, ভবনটির অনিয়মের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শকের কাছে সাংবাদিকের পক্ষ থেকে তথ্য জানানো হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ভবন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে ভবন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সাংবাদিককে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা এবং সংবাদ প্রকাশ না করার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত এবং ভবন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টির প্রকৃত সত্য আরও স্পষ্ট হবে।
ভবনটির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক ও জোনাল অথরাইজড অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা ভবন কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ দেওয়ার কথা জানান। তাদের বক্তব্যে নোটিশ দেওয়ার বিষয়টি সামনে এলেও নোটিশের পর নির্মাণকাজ বন্ধে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাধারণ কোনো ভবন নির্মাণে অনিয়ম পাওয়া গেলে রাজউকের অভিযান ও আইনি পদক্ষেপ দেখা গেলেও আলোচিত ভবনের ক্ষেত্রে লিখিত নোটিশ, কারণ দর্শানোর প্রক্রিয়া এবং আইন লঙ্ঘনের বিষয় নথিতে থাকার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ রহস্য তৈরি করেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
৩১, পীর সাহেবের গলির ওই ১১ তলা ভবনের নির্মাণ অনুমোদন, অনুমোদিত নকশা, ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র, নির্মাণবিধি অনুসরণ, রাজউকের নোটিশ, নোটিশ-পরবর্তী পদক্ষেপ, দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমারত পরিদর্শকের পরিদর্শন ও প্রতিবেদন এবং ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্নের কার্যক্রম তদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে সাংবাদিককে অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে ভবন মালিকের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে গাফিলতি বা অনিয়মে জড়িত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। কারণ, রাজউকের নোটিশের পরও যদি কথিত অননুমোদিত নির্মাণ অব্যাহত থাকে, তাহলে শুধু নোটিশ জারি নয়, সেটির বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা জরুরি।
Aminur / Aminur
শান্তিনগরে অনুমোদনহীন ১১ তলা ভবন
রোবটিক্স-অটোমেশনে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতি
বন মামলার নথি বদল: সংবাদ প্রকাশের পর তদন্তের নির্দেশ
বঙ্গোপসাগর ঘিরে ভুরাজনীতিঃ বাংলাদেশ কী করবে?
ডিএইতে পরিবর্তনের চেষ্টা করেছি : মহাপরিচালক আব্দুর রহিম
বেবিচকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরউদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়: পদ আঁকড়ে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ
নিরাপত্তা ঘাটতি, ক্ষতিপূরণহীন পরিবার আর অপূর্ণ সুপারিশ
সার সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ল বিএডিসির
নদী বন্দর শাখার সাবেক পরিচালক এ.কে এম আরিফ উদ্দিন নারী কেলেঙ্কারিতে বরখাস্ত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যেই অন্য বিভাগে পদায়ন
ই-জিপি ছাড়াই, মেট্রোরেলের টেন্ডার
প্রকৌশল বিভাগে ঘুষের বিনিময়ে পদোন্নতির অভিযোগ
রাজধানীর গুলশান-বনানী স্পা সেন্টারের আড়ালে ভয়ঙ্কর অপরাধীদের আখঁড়া