মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়ে, ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য স্পৃহা"
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় একটি গ্রাম কাশিপুর। গ্রামজুড়ে জেলেদের বসবাস। প্রায় ৩০ বছর আগে বন্যা ও ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় এ গ্রাম। তারপর থেকেই বছরের প্রায় ৬-৭ মাস এ গ্রামটি পানিতে তলিয়ে থাকে। গ্রামে বসবাসকারী ৩১৫টি পরিবার কোনরকমে ঠাঁই নেয় আশেপাশের গ্রামে। এমনই এক অবস্থায় কাশীপুরের দুস্থ জেলে সম্প্রদায় ২০১৭ সালে সুদিনের দেখা পায়। আবারো কাশিপুর গ্রাম জেগে ওঠে। ধীরে ধীরে নিজেদের পেশায় ফিরতে শুরু করেন তারা । স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ‘হাওর অঞ্চলের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্প ভিটে ও পেশা হারানো মৎস্যজীবীদের ঘরে ফেরার স্বপ্ন পূরণে কাজ শুরু করে। গ্রামের ৩২ জন পুরুষ ও ১১ জন নারীসহ সর্বমোট ৪৩ সদস্য নিয়ে আঠারবেকি ফাইল্লা বিল ব্যবহারকারী সংগঠন (বিইউজি) গড়ে তোলা হয়। সদস্যরা ইজারা পরিশোধসহ বিলের সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা ও এলাকার উন্নয়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করায় আর্থিক স্বচ্ছলতা এসেছে কাশিপুরবাসীর।
২০১৭-১৮ অর্থ বছরে হাওর অঞ্চলের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের আর্থিক সহায়তায় আঠারবেকি ফাইল্লা বিল ও ৬৫০ মিটার বিল সংযোগ খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। খননকৃত মাটি দিয়ে কাশিপুর গ্রামটির প্রায় ৩ একর জায়গা উঁচু করে বসতভিটা করা হয়। ২০১৮ সালে গ্রামে ১২৫টি পরিবার নতুন করে ঘর বেঁধে বর্ষা মৌসুমেও বাস করে। বর্তমানে গ্রামে ১৫০টি পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। এখনও প্রায় ১২০-১৫০টি পরিবার আসার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু তাদের জায়গা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। গ্রামে ২টি মসজিদ ও বেসরকারি এনজিওর মাধ্যমে ১টি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যেখানে বর্তমানে অর্ধশতাধিক ছাত্র-ছাত্রী পড়াশুনা করছে।
বিলটিতে ২০১৭ সাল থেকে পুনরায় মাছ সংগ্রহ শুরু হয়। মাছ ধরা পড়ে ৭ হাজার ৮৩৯ কেজি, যার বিক্রয়মূল্য ১৬ লাখ ৫৬ হাজার ১১২ টাকা। গত ৬ বছরে মোট মৎস্য আহরণ হয় ৫৩ হাজার ৫৪৯ কেজি, যার বিক্রয়মূল্য ৯২ লাখ ৩৭ হাজার ৯৮২ টাকা। গত ৫ বছরে ২৯ লাখ ৪ হাজার ৯শ টাকা লভ্যাংশ বিতরণ করা হয় এবং ৬ বছরে ১৭ লাখ ৩৮ হাজার ৪শ টাকা মজুরী প্রদান করা হয়। প্রতিবছর সদস্যদের মাঝে লভ্যাংশ ও মজুরি বিতরণ করা হচ্ছে । বিইউজি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিলের ইজারামূল্য পরিশোধ করাসহ নিয়মিত সঞ্চয় জমা ও মাসিক সভায় বিল ও গ্রাম উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে থাকে। সংগঠনের একটি নিজস্ব ব্যাংক হিসেব রয়েছে, যেখানে সদস্যদের সঞ্চয় জমা করা হয়।

সংগঠনের ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে বিইউজি সদস্যরা বলেন, সমগ্র বিলে স্থায়ী হিজল-করচ বনায়ন করে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে গ্রামকে ঢেউ থেকে রক্ষায় কাজ করা হবে। বিইউজিকে সমবায় অধিদপ্তরের মাধ্যমে মৎস্য সমবায় সমিতি হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করানো হবে। শিশুদের জন্য ভাল মানের স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং স্থায়ী গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তারা। বিইউজি সদস্যসহ গ্রামবাসির দাবি বিলের বাকি অংশ খনন করে গ্রামের দক্ষিণ পাশ ভরাট করে দিলে আরও অন্তত ১৫০ পরিবার তাদের স্থায়ী ঠিকানা পাবে।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাকিলা পারভিন বলেন, হাওর অঞ্চলের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ভিটেমাটি হারানো মৎস্যজীবীদের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এখন বর্ষা এলে তাদের বসতভিটা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে হচ্ছে না। এলজিইডির মাধ্যমে তারা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে। মৎস্যজীবীরা তাদের পুরোনো পেশায় ফিরে এসেছে। কৃষিকাজ ও গবাদি পশু পালনের মাধ্যমে তারা নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। হাওর অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সরকারের নানামুখি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে এক সময়ের অবহেলিত জনপদে এখন শান্তির সুবাতাস বইছে। আঠারবেকী ফাইল্লা বিলে বসবাসকারীরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তা নিরসনে এবং হাওরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে আগামীতে আরও টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. রায়হান সিদ্দীক বলেন, হাওরে বসবাসকারীদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘হাওর অঞ্চলের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে হাওর অঞ্চলে বসবাসকারীদের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। রাস্তাঘাটের উন্নয়নের ফলে তারা খুব সহজে যাতায়াত ও কৃষি পণ্য পরিবহন করতে পারছে। বর্ষায় হাওর অঞ্চল পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ফলে সেখানে বসবাসকারীরা বর্ষায় বসতভিটা ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যেতো, উঁচু করে বসতভিটা তৈরি করে দেয়ার ফলে এখন আর তাদের বিল ছেড়ে কোথাও যেতে হচ্ছে না। প্রকল্পের আওতায় মৎস্য সম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে সারা দেশে ১৩৯টি বিল ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। জলমহালগুলিকে প্রকৃত মৎস্যজীবিদের মাধ্যমে সমাজভিত্তিক জলমহাল ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। তাদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। প্রকল্পে হস্তান্তরিত জলমহালগুলিতে খনন কাজ, মাছের অভয়াশ্রম স্থাপন ও হিজল-করচ গাছ লাগানো হচ্ছে। পাশাপাশি বিল সংযোগ খালগুলোও খনন করা হচ্ছে। এতে জলমহালের পানি ধারণ ক্ষমতা, জীববৈচিত্র্য ও মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। জলমহালগুলি যেহেতু দরিদ্র মৎস্যজীবিদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, তারাই ইজারা মূল্য প্রদান করে সেহেতু উক্ত বিলের লভ্যাংশ ও তারাই ভোগ করবে। ফলে দরিদ্র মৎস্যজীবিদের দারিদ্র বিমোচন হবে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সেখ মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ‘হাওর অঞ্চলের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্প’প্রকল্পটি হাওর অধ্যুসিত পাঁচটি জেলায় নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, বাক্ষমবাড়িয়া বাস্তবায়িত হচেছ। এলজিইডির সুনামগঞ্জ কমিউনিটি ভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের অপরিসীম সফলতার ফলোআপ প্রকল্পই হচেছ ‘হাওর অঞ্চলের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্প 2014 সাল থেকে শুরু হয়ে চলতি বছর তথা 2023 সালে এই প্রকল্পটি শেষ হবে। এই প্রকল্প সবচেয়ে বড় দিকটি হলো মৎস ব্যবস্থাপনা- আপনারা নিশ্চয়ই জানেন আমাদের হাওড় অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন সম্পদ হলো বিল। সময়ের ব্যবধানে বিল গুলি কোন উন্নয়ন না হওয়াতে কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে দেখা যায় অর্ধেক বিল। নেই মাছের উৎপাদন, নেই মাছের কোন ধরনের অভয়আশ্রম। এছাড়া জীববৈত্রির জন্য আগে বিলগুলিতে যে সোআমট্রি বা হিজল-করজ গাছ ছিল তা আজ অনেকাংশে উছাড় হয়ে গেছে। সে গুলিকে পুনারায় আগের জাগায় নিয়ে যাওয়া, মাছের অভয়আশ্রম তৈরি করা, বিল গুলি পুন:খনন করা, মাছের অবাদ চলা-চলা নিশ্চিত করা, খাল খনন করে বিলের সাথে বিলের সংযোগ স্থাপন করা। এই সমগ্র কাজই এই প্রকল্পের মূল উদ্যোশ। এই সকল কাজ করা হয় মৎসজীবিদের মাধ্যমে তাদেরকে বিলের মালিকানা দেয়া হয়। ভুমি মন্ত্রণালয়ের সাথে এলজিইডি মন্ত্রণালয় একটি চুক্তির মাধ্যমে মৎসজীবিদেরকে বিলগুলিতে দীর্ঘমেয়াদী মাছ চাষের সুযোগ করে দেয়া হয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মৎজীবিদেরকে সংঘবদ্ধ করে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তা করা হয়। এর ফলে ইতিপুর্বে যেখানে বাৎসরিক 4-5লাখ টাকার মাছ আহরন করা হতো। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ডফিশের একটি গবেষণায় দেখা গেছে - এই বিল গুলিতে এখন বাৎসরিক 25-30 লাখ টাকার মাছ আহরিত হচেছ। হাওর অঞ্চলের গরীব মানুষের জীবন মান উন্নুয়নে আমাদের এই প্রকল্পটি খুবই গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করছে। আপনি এখন হাওর অঞ্চলে গেলে দেখতে পাবেন কি ধরনের পরিবর্তন এসেছে, বর্তমান সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়ন আরেকটি মাইলফলক হচেছ হাওয়র অঞ্চলের গরীব মানুষের এই অভাবনীয় উন্নয়ন।

এলজিইডির মাধ্যমে সারা দেশে ১০১টি প্রকল্পের কাজ চলছে। গ্রামীণ পর্যায়ে আমরা বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার কাজ করছি। রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির ও কবরস্থানের উন্নয়নসহ নানামুখি কার্যক্রমের ফলে গ্রামের চেহারা বদলে গেছে। বিশেষ করে থেকে পিছিয়ে থাকা হাওর এলাকা নিয়ে সরকারের মাস্টারপ্লানের ফলে সেখানে রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এতে হাওরবাসীর জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন খুব সহজে স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছে, শিশুরাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে স্বপ্ন দেখেন ‘গ্রাম হবে শহর’, আমরা প্রধানমন্ত্রীর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং সরকারের ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছি।
সরেজমিনে দেখা যায়, আঠারবেকি ফাইল্লা বিলের পাশেই মিঠামইনের কমলাপুর-শান্তিপুর-সিংপুর এলাকায় ৬ দশমিক ১২৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে মিঠামইন ও নিকলী উপজেলাবাসীদের যাতায়াত এবং মাছসহ উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বাজারজাত করা সহজ হয়েছে। জরুরি স্বাস্থ্য সেবাও পাচ্ছে তারা। বসতভিটা হারিয়ে যে জেলে সম্প্রদায় চরম দারিদ্রের মধ্যে পড়েছিল হাওর অঞ্চলের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের সহায়তায় তারা ফিরে পেয়েছে আপন পেশা ও ঠিকানা। এলজিইডির পানি সম্পদ কার্যক্রম ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখায় সন্তোষ প্রকাশ করেন হাওরবাসী।
Sunny / Sunny
নবীনগরে ইউপি চেয়ারম্যান ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি-মাদকের অভিযোগ
বাগেরহাটে গান গাইতে না পারায় শিক্ষকের লাঠির প্রহারে শিক্ষার্থী আহত, বিচার দাবি অভিভাবকের
পাঁচবিবিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিদায় সংবর্ধনা
পাঁচবিবিতে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ যৌন উত্তেজক সিরাপ জব্দ, আটক-১
"রাণীনগরে বিদ্যুৎতের যাওয়া আশাই উৎপাদনে ব্যাহত ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার আশঙ্কা চাষীদের
ঘোড়াঘাটে ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক
শ্রীপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল স্কুল শিক্ষকের
নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় অপহৃত রাকিবুলকে উদ্ধারের দাবিতে মানববন্ধন
ধামরাইয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীকে কুপিয়ে হত্যা
জাতীয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সংস্থার প্রশাসক নিয়োগ স্থগিত করে হাইকোর্টের রুল
সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্রের ২০০ একর বনভূমি উদ্ধার
আত্রাইয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দুইজন সাংবাদিক লাঞ্ছিত