ঢাকা রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫

কুরআনের আলোকে মৌমাছি ও মধু


ডেস্ক রিপোর্ট  photo ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২৫-১১-২০২৫ দুপুর ১১:১১

পৃথিবীকে বৈচিত্র্যময় মাখলুকাতের মাধ্যমে সাজিয়েছেন মহান রাব্বুল আলামিন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছে মৌমাছি ও তার থেকে নিসৃত মধু। পবিত্র কুরআনে যেসব কীটপতঙ্গের বর্ণনা এসেছে তন্মধ্যে মৌমাছি অন্যতম। মৌমাছির নামে একটি সুরার নামকরণও করা হয়েছে, তা হলো ‘সুরা নাহল’। আরবি শব্দ ‘নাহল’ অর্থ মৌমাছি। এ সুরায় আল্লাহ তায়ালা মৌমাছি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। 
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমার রব মৌমাছির অন্তরে প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছেন যে, তোমরা গৃহ নির্মাণ করো পাহাড়, বৃক্ষ এবং মানুষ যে গৃহ নির্মাণ করে তাতে’ (সুরা নাহল : ৬৮)। 
পরের আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতঃপর তোমরা প্রত্যেক ফল থেকে কিছু কিছু আহার করো, অতঃপর তোমার রবের সহজ পথ অনুসরণ করো। ওর উদর হতে নির্গত হয় বিবিধ বর্ণের পানীয়, যাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিষেধক। অবশ্যই এতে রয়েছে নিদর্শন চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য।’ (সুরা নাহল : ৬৯)
আলোচ্য আয়াত দুটিতে আল্লাহ তায়ালা মৌমাছি সম্পর্কে আলোচনার পাশাপাশি তাদের দ্বারা সৃষ্ট মধুর গুণাগুণও বর্ণনা করেছেন। মধু সাদা, হলদে, লাল ইত্যাদি বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে। ফল, ফুল ও মাটির রঙের বিভিন্নতার কারণেই মধুর এই বিভিন্ন রং হয়ে থাকে। মধুর বাহ্যিক সৌন্দর্য ও চমকের সঙ্গে সঙ্গে ওর দ্বারা রোগ থেকেও আরোগ্য লাভ হতে থাকে। আল্লাহ তায়ালা এর দ্বারা বহু রোগ হতে আরোগ্য দান করেন। 
আয়াতে ‘তোমার রবের সহজ পথ অনুসরণ করো’ দ্বারা বোঝানো হয়েছে—কোনো নতুন বাগান বা ফুলের সন্ধান পাওয়ার পর একটি মৌমাছি আবার মৌচাকে ফিরে যায় এবং মৌমাছি নৃত্য আচরণের মাধ্যমে তার সহকর্মী মৌমাছিকে সেখানে যাওয়ার সঠিক গতিপথ ও মানচিত্র বলে দেয়। অন্যান্য শ্রমিক মৌমাছিকে তথ্য দেওয়ার লক্ষ্যে এ ধরনের আচরণ আলোকচিত্র ও অন্যান্য পদ্ধতির সাহায্যে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। 
মৌমাছি প্রত্যাবর্তনের সময় সরাসরি নিজেদের মৌচাকে পৌঁছে যায়। উঁচু পাহাড়ের চূড়া হোক, মরু প্রান্তর হোক, বৃক্ষ হোক, লোকালয় হোক, জনশূন্য স্থান ইত্যাদি যে স্থানই হোক না কেন ওরা পথ ভুলে না। যত দূরেই গমন করুক না কেন ওরা প্রত্যাবর্তন করে সরাসরি মৌচাকে নিজেদের বাচ্চা, ডিম ও মধুতে পৌঁছে যায়।
আলোচ্য আয়াত দুটিতে মহান আল্লাহ তায়ালা মৌমাছিকে নির্দেশ দেওয়ার জন্য স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যবহার করেছেন। আগে মানুষ ভাবত, কর্মী মৌমাছিরা পুরুষ এবং ঘরে ফিরে এসে তাদের একটি রাজা মৌমাছির কাছে জবাবদিহিতা করতে হয়। কিন্তু এটা সত্য নয়, কারণ আল্লাহ তায়ালা কুরআনে স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা প্রমাণ করে শ্রমিক মৌমাছিরা স্ত্রী এবং তারা রাজা নয়, বরং রানী মৌমাছির কাছে জবাবদিহিতা করে। 
আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যাতে রয়েছে মানুষের জন্য রোগের প্রতিষেধক। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মধুতে মানুষের জন্য আরোগ্য রেখেছেন। 
এ সম্পর্কে হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বলল, আমার ভাইয়ের পেট ছুটে গিয়েছে (অর্থাৎ খুব পায়খানা হচ্ছে)। 
নবীজি (সা.) বললেন, তাকে মধু পান করিয়ে দাও। সে গেল এবং তাকে মধু পান করাল। আবার সে এলো এবং বলল, হে আল্লাহর রাসুল, তার রোগ তো আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি এবারও বললেন, যাও, তাকে মধু পান করাও। সে গেল এবং তাকে মধু পান করাল। পুনরায় এসে সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, তার পায়খানা তো আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। 
তিনি বললেন, আল্লাহ সত্যবাদী এবং তোমার ভাইয়ের পেট মিথ্যাবাদী। তুমি যাও এবং তাকে মধু পান করাও। সে গেল এবং তাকে মধু পান করাল। এবার সে সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করল। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
মৌমাছি আমাদের জন্য উৎকৃষ্ট মধু আহরণ করে। প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মধু খেতে খুব ভালোবাসতেন (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ১২১)। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিনটি জিনিসে শিফা বা রোগ মুক্তি রয়েছে। শিঙা লাগানো, মধুপান এবং (গরম লোহা দ্বারা) দাগ দিয়ে নেওয়া। কিন্তু আমার উম্মতকে আমি দাগ নিতে নিষেধ করছি (সহিহ বুখারি)। মৌমাছি দেখতে খুব ছোট একটি প্রাণী। তবে এরা খুবই পরিশ্রমী হয়। 
পবিত্র কুরআনে এই প্রাণীকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এই প্রাণীটি ফুলের রস মুখে নিয়ে, সেটা থেকে জলীয় অংশ দূর করে শতভাগ ভেজালমুক্ত এক ফোঁটা মধু তৈরি করতে যে শ্রম ও সময় ব্যয় করে, সেটা বিস্ময়কর। এক পাউন্ড মধু বানাতে ৫৫০ মৌমাছিকে প্রায় ২০ লাখ ফুলে ভ্রমণ করতে হয়। আবার এক পাউন্ড মধু সংগ্রহ করতে একটি কর্মী মৌমাছিকে প্রায় ১৪.৫ লাখ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়, যা দিয়ে পৃথিবীকে তিনবার প্রদক্ষিণ করা সম্ভব। 
মহান আল্লাহর সৃষ্টি এই ক্ষুদ্র পতঙ্গ মৌমাছির সৃষ্ট ঘরটি দেখলেও বিস্মিত হতে হয়। ওটা কতই না মজবুত! কতই না সুন্দর এবং কতই কারুকার্য খচিত! আল্লাহ আমাদের তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার তওফিক দান করুন।

Aminur / Aminur