ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

মানুষ হত্যা রোধে ইসলামের নির্দেশনা


ডেস্ক রিপোর্ট  photo ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২৪-১২-২০২৫ দুপুর ১০:৪৭

মহান আল্লাহ মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। প্রতিটি মানুষের জীবন মহান রবের পক্ষ থেকে আমানতস্বরূপ। পবিত্র ইসলাম ধর্মে নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলামি শরিয়তের পাঁচটি মৌলিক লক্ষ্যের (মাকাসিদে শরিয়াহ) অন্যতম হলো ‘হিফজুন নাফস’ বা জীবনের সুরক্ষা। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে তুচ্ছ কারণে কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে মানুষ হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ সমাজে ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। 
মানবজীবনের মর্যাদা ও পবিত্রতা 
ইসলামের দৃষ্টিতে একজন নিরপরাধ মানুষের প্রাণের মূল্য গোটা জগতের সব ধন-সম্পদের চেয়েও বেশি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আল আমিন অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করল, সে যেন পৃথিবীর সব মানুষকেই হত্যা করল। আর যে কারও প্রাণরক্ষা করল, সে যেন গোটা মানবজাতিকেই বাঁচাল’ (সুরা মায়েদাহ : ৩২)। এই আয়াতটি স্পষ্ট করে দেয় যে, একজন ব্যক্তিকে হত্যা করা সব মানবতার বিরুদ্ধে এক ঘৃণ্য যুদ্ধ। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন, ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান আজকের এই দিন, এই পবিত্র মাস এবং এই শহরের মতোই পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয়।’ (সহিহ বুখারি) 
পরকালে খুনি ব্যক্তির করুণ পরিণতি 
ইসলামি শরিয়তে শিরকের পরই সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ হলো অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা। যারা ক্ষমতার দম্ভে বা ব্যক্তিগত আক্রোশে অন্যের প্রাণ কেড়ে নেয়, তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা পরকালে চিরস্থায়ী শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার শাস্তি হবে জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তাকে অভিশপ্ত করেছেন এবং তার জন্য প্রস্তুত রেখেছেন মহাআজাব’ (সুরা নিসা : ৯৩)। কেয়ামতের বিচার দিবসে আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘনজনিত বিচারের আগে ফয়সালা করা হবে মানুষের রক্তপাতের (সহিহ বুখারি)। রক্তের ন্যায়সংগত হিসাব না দিয়ে কোনো খুনি সেদিন রেহাই পাবে না। 
ইসলামি দণ্ডবিধি ও কিসাসের দর্শন 
একটি অপরাধমুক্ত ও শান্তিময় সমাজ গঠনে ইসলাম অত্যন্ত ইনসাফপূর্ণ বিচারব্যবস্থা প্রবর্তিত করেছে। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হত্যা করে, তবে ইসলামি রাষ্ট্র তার ওপর ‘কিসাস’ বা সমপর্যায়ের শাস্তির বিধান জারি করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর নিহতদের ব্যাপারে কিসাস (প্রাণের বদলে প্রাণ) গ্রহণ করা ফরজ করা হয়েছে’ (সুরা বাকারা : ১৭৮)। কিসাসের এই বিধানকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে কঠোর মনে হলেও এটি মূলত জীবনের নিশ্চয়তা। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, ‘হে বুদ্ধিমানগণ! কিসাসের মধ্যেই তোমাদের জীবন নিহিত রয়েছে’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৭৯)। কারণ যখন একজন খুনি জানবে যে, তার কৃতকর্মের জন্য তাকেও প্রাণ দিতে হবে, তখন সে অন্যের রক্ত ঝরাতে শতবার ভাববে। 
প্রতিশোধ গ্রহণে সীমালঙ্ঘন ও কুরআনের বিধান 
ইসলাম কেবল হত্যার বিচারই নিশ্চিত করেনি বরং বিচারের নামে যেন নতুন কোনো জুলুম না হয়, সেই ভারসাম্যও রক্ষা করেছে। অনেক সময় দেখা যায়, একটি খুনের বদলা নিতে গিয়ে নিহতের স্বজনরা খুনি ছাড়াও তার আত্মীয়স্বজন বা নিরপরাধ ব্যক্তিদের ওপর চড়াও হয়। এই প্রতিহিংসার পথ বন্ধ করতে আল্লাহ তায়ালা সাবধান করে বলেছেন, ‘যাকে হত্যা করা আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না। যে অন্যায়ভাবে নিহত হয়, আমি তার উত্তরাধিকারীকে প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছি; তবে হত্যার ব্যাপারে সে যেন সীমালঙ্ঘন না করে। নিশ্চয়ই সে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছে’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৩৩)। অর্থাৎ প্রতিশোধের সময় মূল অপরাধী ছাড়া অন্য কাউকে হত্যা করা বা মৃতদেহ বিকৃত করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। 
অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে মৃত্যু ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা 
ইসলামি শরিয়ত কেবল চিহ্নিত অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করেই ক্ষান্ত হয় না বরং যেখানে হত্যাকারী অজ্ঞাত বা আততায়ী পলাতক থাকে, সেখানেও নিহতের পরিবারের অধিকার রক্ষায় অনন্য বিধান রেখেছে। ইসলামি ফিকহশাস্ত্রের একটি বিশেষ অধ্যায় হলো ‘কাসামাহ’। যদি কোনো জনপদে কারও মরদেহ পাওয়া যায় এবং ঘাতককে শনাক্ত করা সম্ভব না হয়, তবে তদন্তসাপেক্ষে ইসলামি রাষ্ট্রের বাইতুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) থেকে নিহতের পরিবারকে ‘দিয়ত’ বা রক্তপণ পরিশোধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি ইসলামের এক অপূর্ব সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, যা নিশ্চিত করে যেকোনো মানুষের রক্তই যেন বৃথা না যায়। 
নিহতের পরিবারের অধিকার ও মানবিক বিকল্প 
ইসলামি আইন অনুযায়ী খুনের ঘটনায় নিহতের উত্তরাধিকারীদের জন্য তিনটি মানবিক পথ খোলা রাখা হয়েছে- ১. কিসাস : আদালতের মাধ্যমে খুনিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের দাবি করা। ২. দিয়ত (রক্তপণ) : পরিবার চাইলে মৃত্যুদণ্ড মাফ করে দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে পারে। শরিয়াহর মানদণ্ড অনুযায়ী এর পরিমাণ ১০০টি উট বা তার সমমূল্য, যা নিহতের পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করে। ৩. নিঃশর্ত ক্ষমা : পরকালের অশেষ সওয়াবের আশায় খুনিকে কোনো বিনিময় ছাড়াই ক্ষমা করে দেওয়া। এটি ইসলামের সর্বোচ্চ উদারতার পরিচয়। 
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও উত্তরণের পথ 
রাসুলুল্লাহ (সা.) কেয়ামতের আলামত হিসেবে এক অস্থির সময়ের কথা বর্ণনা করে বলেছিলেন, ‘এমন এক সময় আসবে যখন হত্যাকারী জানবে না সে কেন মারছে, আর নিহত ব্যক্তিও জানবে না তাকে কেন প্রাণ দিতে হলো’ (সহিহ মুসলিম)। আজ আমরা সেই অরাজক পরিস্থিতির মুখোমুখি। তুচ্ছ রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণে যখন আমরা রক্ত ঝরাই, তখন সমাজ থেকে আল্লাহর বরকত উঠে যায়। মোটকথা- মানুষ হত্যা একটি আত্মিক ও সামাজিক বিপর্যয়। আল্লাহর দেওয়া প্রাণের সম্মান রক্ষায় প্রতিটি নাগরিককে সচেতন হতে হবে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে ন্যায়বিচার এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। আসুন, আমরা ইসলামের শান্তির বাণী প্রচার করি এবং নিরপরাধ মানুষের রক্ত ঝরানো বন্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আল্লাহ আমাদের সমাজকে রক্তপাতমুক্ত করুন। 

Aminur / Aminur