তীব্র শীতে মসজিদের পথে : ত্যাগ ও প্রাপ্তি
প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে শীত আসে আল্লাহর এক বিশেষ নিদর্শন হয়ে। তবে হাড় কাঁপানো এই ঠাণ্ডা আর কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে উষ্ণ বিছানা ছেড়ে মসজিদের পথে পা বাড়ানো নিশ্চয়ই স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির এক গভীর প্রেমের পরীক্ষা। যখন চারপাশ হিম শীতল স্তব্ধতায় ঢেকে থাকে, তখন ওজুর পানির স্পর্শে মুমিনের ঈমানি উষ্ণতা প্রকাশ পায়। এই ত্যাগের প্রতিটি মুহূর্তকে ইসলাম অত্যন্ত মহিমান্বিত করেছে।
শয্যা ত্যাগের মর্যাদা
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা সেসব মুমিনের প্রশংসা করেছেন, যারা আরামের ঘুম বিসর্জন দিয়ে মহান রবের সান্নিধ্য খোঁজেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা থাকে (অর্থাৎ তারা ইবাদতে মগ্ন হয়), তারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় ও আশা নিয়ে ডাকে’ (সুরা সেজদা, আয়াত : ১৬)। শীতের দীর্ঘ রাতে যখন পৃথিবী নিস্তব্ধ থাকে, তখন একজন মুমিনের মসজিদের পথে যাত্রা প্রমাণ করে যে, তার কাছে নফসের আরামের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির মূল্য অনেক বেশি।
কষ্টের ওজুতে পাপ মুক্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি
কনকনে ঠাণ্ডায় ওজু করা বেশ কষ্টসাধ্য। কিন্তু এই শারীরিক কষ্টই জান্নাতে উচ্চ মর্যাদার সোপান। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন কিছু জানাব না, যার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের গুনাহগুলো মুছে দেবেন এবং জান্নাতে তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন? সাহাবিগণ বললেন, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেনÑ ১. কষ্ট সত্ত্বেও পূর্ণাঙ্গরূপে ওজু করা। ২. মসজিদের দিকে বেশি পদচারণ করা এবং ৩. এক নামাজের পর অন্য নামাজের জন্য অপেক্ষা করা’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫১)। এখানে ‘কষ্ট সত্ত্বেও ওজু’ বলতে মুহাদ্দিসগণ শীতের তীব্রতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। এই পানি বান্দার শরীর যেমন পরিষ্কার করে, তেমনি বান্দার গুনাহকেও ধুয়ে মুছে দেয়।
অন্ধকারের যাত্রী ও কেয়ামতের আলোকবর্তিকা
শীতকালে ফজর ও এশার সময় চারপাশ ঘন অন্ধকারে ছেয়ে থাকে। এই প্রতিকূলতায় যারা মসজিদের দিকে পা বাড়ায়, তাদের জন্য রয়েছে এক অভাবনীয় সুসংবাদ। হাদিসে এসেছে, ‘অন্ধকারে মসজিদের দিকে হেঁটে গমনকারীদের কেয়ামতের দিন পূর্ণাঙ্গ নুরের সুসংবাদ দাও’ (সুনানে আবু দাউদ : ৫৬১; তিরমিজি : ২২৩)। দুনিয়ার এই অন্ধকার ও শীত সহ্য করার বিনিময়ে পরকালের বিভীষিকাময় অন্ধকারে আল্লাহ তাদের পথকে জ্যোতির্ময় করে দেবেন।
জান্নাতের মেহমানদারি ও আত্মিক বসন্ত
শীতকালকে হাদিসে মুমিনের জন্য ‘বসন্তকাল’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘শীতকাল হচ্ছে মুমিনের বসন্তকাল। এর রাত দীর্ঘ হওয়ায় মুমিন তাতে কিয়ামুল লাইল (রাতের নামাজ) পড়তে পারে এবং দিন ছোট হওয়ায় রোজা রাখতে পারে’ (মুসনাদে আহমাদ : ১১৬৫৬)। এ ছাড়া মসজিদে প্রতিবার যাতায়াতের বিনিময়ে জান্নাতে বিশেষ আপ্যায়নের কথা বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি সকালে বা সন্ধ্যায় মসজিদে যায়, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাতে ততবার মেহমানদারির সামগ্রী প্রস্তুত করেন।’ (সহিহ বুখারি : ৬৬২)
মানবিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা
শীতের এই কষ্ট মুমিনকে ধৈর্য এবং সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। যখন একজন মুসল্লি ঠাণ্ডায় কষ্ট পেয়ে মসজিদে যান, তখন তিনি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও গৃহহীন মানুষের কষ্টের কথা অনুভব করতে পারেন। এটি নফসের বিরুদ্ধে এক নিরন্তর সংগ্রাম, যা মানুষের আত্মিক শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মসজিদের মিনার থেকে যখন ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ (কল্যাণের দিকে এসো) ধ্বনি ভেসে আসে, তখন সেই আহ্বান মুমিনের হৃদয়ে হিমালয়সম হিম জয় করার সাহস জোগায়। শীতের তীব্রতা প্রতিদান বৃদ্ধির এক অনন্য সুযোগ। কষ্টের তীব্রতা যত বেশি হয়, পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে তার বিনিময় তত বিশাল হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই হাড়কাঁপানো শীতেও জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে আত্মিক প্রশান্তি লাভের তওফিক দান করুন।
Aminur / Aminur
নতুন বছর শোভিত হোক পুণ্যে
মৃত্যুর ঘটনায় জীবিতদের কর্তব্য
তীব্র শীতে মসজিদের পথে : ত্যাগ ও প্রাপ্তি
মাদক থেকে পাপ ও অপরাধের সূচনা
আমানতদার ব্যক্তির মর্যাদা ও পুরস্কার
সাহাবিদের জীবনী চর্চার সুফল
সুন্নত মেনে বিয়ে করলে শান্তি মেলে
মানুষ হত্যা রোধে ইসলামের নির্দেশনা
ফরজে আইন ইলম অর্জনের নির্দেশনা
অসৎ সঙ্গ এড়িয়ে চলার সুফল
কুরআন-হাদিসে বর্ণিত দশ প্রকার সুন্দর মৃত্যু
অবৈধ সম্পদে জীবনের যত ক্ষতি