এমন একটা সরকার চাই
দেশের বেশিরভাগ মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতি তেমন আগ্রহ নেই বললেই চলে। সাধারণ মানুষ প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠে জীবিকার তাগিদে, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায়, সংসারের খরচ মেটানোর সংগ্রামে। তাদের কাছে কে ক্ষমতায় এলো, কে গেলো, এই প্রশ্নের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় বাজারে চালের দাম কত, বাসাভাড়া বাড়লো কিনা, চিকিৎসার খরচ জোগাড় হবে কি না, কিংবা পথে-ঘাটে নিরাপদে চলাফেরা করা যাবে কিনা। রাজনীতির রঙ নয়, তারা চায় স্বস্তির জীবন; দলীয় স্লোগান নয়, তারা চায় নির্ভরতার আশ্বাস। তাই আমরা এমন একটি সরকার চাই, যারা জনগণের পালস বুঝবে, দুর্নীতিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবে, আইনশৃঙ্খলার নামে কাউকে হয়রানি করবে না, এবং মানুষের জীবনে প্রকৃত শান্তি ফিরিয়ে আনবে।
২০১৭ সালের এক জরিপে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে ৫১.২ শতাংশ রাজনীতিতে আগ্রহ দেখায় না, এবং ২৭ শতাংশ তরুণ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাকে অপছন্দ করে। আর মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত (দলীয় পদ, মিটিং-মিছিল) মোট জনসংখ্যার সর্বোচ্চ ২ থেকে ৫ শতাংশ মানুষ। যদিও স্থানীয় পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অনেকে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। বাংলাদেশে ভোটের সময় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বেশি থাকলেও, সরাসরি রাজনৈতিক দলের সদস্য বা সক্রিয় কর্মীর হার খুব কম এবং সিংহভাগ মানুষই সরাসরি দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকে। আর মুষ্টিমেয় কিছু ঘুষখোর ও সরকারের সুবিধাভোগী ছাড়া সবাই সাধারণ মানুষ।
সুতরাং রাজনৈতিক কর্মীর চেয়ে সাধারণ মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি আর এই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। তারা চায় ন্যায্য মূল্য, ন্যায্য আচরণ এবং ন্যায্য সুযোগ। একজন কৃষক চায় তার উৎপাদিত ফসলের সঠিক দাম; একজন শ্রমিক চায় তার পরিশ্রমের ন্যায্য মজুরি; একজন শিক্ষার্থী চায় নিরাপদ ক্যাম্পাস ও মানসম্মত শিক্ষা; একজন রোগী চায় চিকিৎসকের সঠিক সেবা, হাসপাতালের মানবিক আচরণ। এই চাওয়াগুলো কোনো বিলাসিতা নয়, এগুলো মৌলিক অধিকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বহু সময় এসব অধিকারই মানুষের কাছে স্বপ্ন হয়ে থাকে। ফলে মানুষ রাজনীতির প্রতি বিমুখ হয়ে পড়ে, কারণ তারা দেখে, ক্ষমতার পালাবদল হলেও তাদের জীবনের বাস্তবতায় তেমন পরিবর্তন আসে না।
দ্রব্যমূল্যের প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় সাধারণ মানুষকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যখন লাগামছাড়া হয়ে ওঠে, তখন সংসারের ভার সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। মধ্যবিত্ত পরিবারকে তখন হিসাব কষে চলতে হয়, কোনটা কিনবে, কোনটা বাদ দেবে। নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে তো বিষয়টি আরও নির্মম; অনেক সময় এক বেলা খেয়ে আরেক বেলা না খেয়েই দিন কাটাতে হয়। মানুষ চায় এমন একটি সরকার, যারা বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে, সিন্ডিকেট ভাঙবে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হতে দেবে না। শুধু আশ্বাস নয়, তারা চায় বাস্তব পদক্ষেপ, যাতে বাজারে স্থিতিশীলতা আসে এবং জীবনযাত্রা সহনীয় পর্যায়ে থাকে।
দুর্নীতি হলো সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাধিগুলোর একটি। এটি শুধু রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না, মানুষের মনোবল ভেঙে দেয়, ন্যায়বোধকে দুর্বল করে দেয়, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে ভুল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। মানুষ দেখতে পায়, ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না, তদবির ছাড়া সুযোগ মেলে না, ক্ষমতার ছায়ায় থাকলে অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়। এই বাস্তবতা মানুষকে হতাশ করে তোলে। তাই আমরা চাই এমন একটি সরকার, যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেবে, যাদের কাছে আইন সবার জন্য সমান হবে, মন্ত্রী হোক বা সাধারণ নাগরিক, প্রভাবশালী হোক বা অসহায় মানুষ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও মানুষের মনে নানা প্রশ্ন আছে। জনগণ চায় নিরাপত্তা, কিন্তু তারা চায় না নিরাপত্তার নামে হয়রানি। তারা চায় না যেন দলীয় পরিচয়ের কারণে কেউ সুবিধা পায়, আবার কেউ বঞ্চিত হয়। তারা চায় এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে পুলিশ হবে জনগণের বন্ধু, প্রশাসন হবে জনগণের সেবক, আদালত হবে ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়স্থল। যখন মানুষ দেখে যে, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলে আইন ভিন্নভাবে কাজ করে আর সাধারণ মানুষের জন্য আইন কঠোর হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রের ওপর আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। তাই জনগণের প্রধান চাওয়া হলো, ন্যায়ভিত্তিক, নিরপেক্ষ এবং মানবিক প্রশাসন।
শান্তি হলো মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া। রাজনৈতিক সহিংসতা, হানাহানি, সংঘর্ষ, এসবের খেসারত দেয় সাধারণ মানুষই। রাস্তা বন্ধ থাকে, যানবাহন চলে না, অফিস-আদালত অচল হয়ে পড়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের প্রতিটি স্তর। মানুষ চায় না প্রতিদিন অস্থিরতার মধ্যে বাঁচতে; তারা চায় স্থিতিশীল জীবন, নিরাপদ পরিবেশ। একটি ভালো সরকার সেই যে সরকার জনগণের জীবনে স্থিতি ফিরিয়ে আনতে পারে, ভয়ের বদলে আস্থা তৈরি করতে পারে, বিভাজনের বদলে ঐক্যের বোধ জাগিয়ে তুলতে পারে।
জনগণের পালস বোঝা মানে শুধু নির্বাচনের আগে জনসংযোগ করা নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনের বাস্তবতা অনুধাবন করা। একজন ভালো সরকারপ্রধান কিংবা শাসকগোষ্ঠী সেই, যারা গ্রামের মানুষের কষ্ট বুঝবে, শহরের শ্রমজীবী মানুষের সমস্যা বুঝবে, তরুণদের স্বপ্ন ও হতাশা বুঝবে, নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে সংবেদনশীল হবে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে যদি এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকে, তবে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যানই ফাঁপা হয়ে যায়। মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু এমন উন্নয়ন চায় যা তাদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনবে, কাগজে-কলমে নয়।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, এই দুই খাত মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। মানুষ চায় এমন একটি সরকার, যারা শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করবে না, বরং এটিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখবে। তারা চায় মানসম্মত সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে গরিবের সন্তানও সমান সুযোগ পাবে। একইভাবে স্বাস্থ্যসেবাও যেন ধনীদের একচেটিয়া অধিকার না হয়। সরকারি হাসপাতালে যেন চিকিৎসা পাওয়া যায় সম্মানের সঙ্গে, অবহেলা ছাড়া। একজন অসুস্থ মানুষ যখন হাসপাতালে গিয়ে অপমানিত হয় বা সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে মারা যায়, তখন সে শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
একটি ভালো সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো জবাবদিহিতা। জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্র চলে, তাই জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, ক্ষমতায় গেলে কেউ আর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চায় না। জনগণের সমস্যা শুনতে চায় না, সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখে। মানুষ চায় এমন এক শাসনব্যবস্থা, যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, সাংবাদিকরা ভয় ছাড়া সত্য লিখতে পারবেন, নাগরিকরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করতে পারবেন। কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো, এখানে শাসক জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।
তরুণ সমাজের দিকেও বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। কিন্তু যখন তারা দেখে যে যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে দাঁড়ায়, মেধার চেয়ে তদবির বেশি কার্যকর, তখন তারা হতাশ হয়ে পড়ে। অনেকে দেশ ছাড়ার স্বপ্ন দেখে, অনেকে নিজ দেশে থেকেও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে। একটি ভালো সরকার তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে, উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সহজ করবে, মেধাকে মূল্যায়ন করবে। তরুণদের স্বপ্ন যদি দেশের মাটিতেই পূরণ হয়, তাহলে দেশ এমনিতেই এগিয়ে যাবে।
গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমানোও একটি দায়িত্বশীল সরকারের কাজ। উন্নয়ন যদি শুধু শহরকেন্দ্রিক হয়, তাহলে গ্রামের মানুষ পিছিয়ে পড়বে, এবং সামগ্রিক উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মানুষ চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগের সুবিধা পাবে। একটি শিশুর জন্ম যদি গ্রামে হয়, তবে তার ভবিষ্যৎ যেন শহরের শিশুর চেয়ে কম সম্ভাবনাময় না হয়, এই নিশ্চয়তাই একটি মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয়।
সবশেষে বলতে হয়, জনগণের চাওয়া আসলে খুব সহজ, তারা এমন একটি সরকার চায়, যারা মানুষের পাশে দাঁড়াবে, মানুষের কথা শুনবে, মানুষের জন্য কাজ করবে। তারা চায় না ক্ষমতার অহংকার, তারা চায় না ফাঁকা প্রতিশ্রুতি। তারা চায় বাস্তব কাজ, দৃশ্যমান পরিবর্তন, এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ। সরকারের দলীয় পরিচয় নয়, সরকারের চরিত্রই মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যে সরকার মানুষের জীবনে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বস্তি এনে দিতে পারবে, সেই সরকারই হবে জনগণের কাক্সিক্ষত সরকার।
আমরা এমন একটা সরকার চাই, যেখানে মানুষ ভয় নয়, ভরসা নিয়ে বাঁচবে; যেখানে আইন হবে ঢাল, হাতিয়ার নয়; যেখানে দুর্নীতি হবে ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়; যেখানে উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য, মানুষের বিরুদ্ধে নয়। এই চাওয়াটাই আজ দেশের সাধারণ মানুষের মনের গভীর।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক, সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।
Aminur / Aminur
এমন একটা সরকার চাই
পবিত্র শবে বরাত: হারিয়ে যেতে বসা আত্মার জন্য এক গভীর ডাক : মোহাম্মদ আনোয়ার
ঘুষ, দালাল ও হয়রানি: জনগণের রাষ্ট্রে জনগণই সবচেয়ে অসহায়!
সুস্থ জীবনের স্বার্থে খাদ্যে ভেজাল রোধ জরুরী
আস্থার রাজনীতি না অনিবার্যতা: তারেক রহমান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক শূন্যতা!
রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কঠিন পরীক্ষায় ত্রয়োদশ নির্বাচন
নির্বাচনী ট্রেইনে সব দল, ক্ষমতার চূড়ান্ত মালিক জনগণ!
ঈমানের হেফাজতের নগরী মদিনা: মক্কার চেয়ে দ্বিগুণ বরকতের অন্তর্নিহিত রহস্য!
বিপ্লবের আশা-আকাঙ্ক্ষার যেন অপমৃত্যু না হয়
গণমানুষের আস্থার ঠিকানা হোক গণমাধ্যম
নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা: সরকার-বিরোধী উভয়েরই কল্যাণকর
শবে মেরাজের তাজাল্লি ও জিব্রাইল (আ.) এর সীমা: এক গভীর ও বিস্ময়কর সত্য!