চট্টগ্রামের পটিয়ায় একটি আধুনিক মানের সরকারি হাসপাতাল দরকার
চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপদ পটিয়া। বহু পুরোনো এই মহকুমাটি ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে পটিয়া শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের অনেক খ্যাতনামা শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও শিক্ষাবিদ এই অঞ্চল থেকেই বেড়ে উঠেছেন এবং দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তবুও দুঃখজনক হলেও সত্য, জনসংখ্যা ও গুরুত্বের তুলনায় পটিয়ায় আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা এখনো পর্যাপ্ত নয়। তাই পটিয়ায় একটি আধুনিক মানের সরকারি হাসপাতাল স্থাপন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পটিয়া একটি প্রাচীন ও জনবহুল এলাকা হওয়ায় এখানে প্রতিনিয়ত চিকিৎসা সেবার চাহিদা বাড়ছে। বর্তমান সময়ে সাধারণ চিকিৎসা সেবা ছাড়াও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা, আধুনিক যন্ত্রপাতি, জরুরি বিভাগ, আইসিইউ ও উন্নত অপারেশন সুবিধা অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে এসব আধুনিক সুবিধা সীমিত। ফলে অনেক রোগীকে জরুরি চিকিৎসার জন্য দূরবর্তী এলাকায় যেতে হয়, বিশেষ করে চট্টগ্রাম শহরের বড় হাসপাতালগুলোতে যেতে গিয়ে রোগীরা সময়, অর্থ ও ভোগান্তির শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে এই বিলম্ব রোগীর জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।
পটিয়ায় একটি আধুনিক সরকারি হাসপাতাল স্থাপিত হলে শুধু পটিয়ার মানুষই নয়, বরং পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের জনগণ উপকৃত হবে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা, যেমন আনোয়ারা, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া থেকে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরমুখী হন। একটি আধুনিক হাসপাতাল এই অঞ্চলে স্থাপিত হলে এসব এলাকার মানুষ স্থানীয় পর্যায়েই উন্নত চিকিৎসা সেবা পেতে পারবেন। এতে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি রোগীদের জীবন রক্ষা সহজ হবে।
পটিয়ার মানুষের দেশের অর্থনীতিতে অবদানও এই দাবি জোরালো করে। এই অঞ্চল থেকে উঠে আসা অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের অবদানের ফলে দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে। এমন একটি অবদানশীল এলাকার মানুষের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। একটি আধুনিক সরকারি হাসপাতাল স্থাপন করলে তা হবে এই অঞ্চলের মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।
এছাড়া একটি আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মচারীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি, আধুনিক হাসপাতাল থাকলে এলাকার স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং মানুষ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণে আগ্রহী হবে।
বর্তমান সময়ে দুর্ঘটনা ও জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনা, শিল্প দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা হঠাৎ অসুস্থতা, এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পটিয়ায় একটি আধুনিক হাসপাতাল থাকলে জরুরি মুহূর্তে দ্রুত চিকিৎসা প্রদান সম্ভব হবে। বিশেষ করে আইসিইউ, ট্রমা সেন্টার ও আধুনিক অপারেশন থিয়েটার থাকলে অনেক মূল্যবান জীবন রক্ষা করা যাবে।
পটিয়ার মতো একটি ঐতিহাসিক, জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে একটি আধুনিক সরকারি হাসপাতাল স্থাপন করা শুধু প্রয়োজনই নয়, বরং অত্যন্ত জরুরি। এটি বাস্তবায়িত হলে পটিয়া ও সমগ্র দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাবে, জীবনমান উন্নত হবে এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে বৈষম্য অনেকাংশে কমে আসবে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে দ্রুত পটিয়ায় একটি আধুনিক সরকারি হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা।
পটিয়ায় হাসপাতাল হলে শহরের চাপ অনেকটা কমবে:
চট্টগ্রাম অঞ্চলের জনসংখ্যা ও নগরায়ণের দ্রুত বিস্তারের ফলে বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ দিন দিন বাড়ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসার জন্য শহরে আসতে বাধ্য হন। বিশেষ করে পটিয়া উপজেলা থেকে বিপুলসংখ্যক রোগী প্রতিদিন শহরমুখী হন। এই বাস্তবতায় পটিয়ায় একটি আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হলে শহরের ওপর রোগীর চাপ অনেকাংশে কমে আসবে।
যে কারণে পটিয়াতে হাসপাতাল দরকার:
পটিয়া একটি ঐতিহ্যবাহী ও জনবহুল উপজেলা। এখানে জনসংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি আশপাশের অনেক উপজেলা ও গ্রামীণ এলাকার মানুষও পটিয়াকে কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার অভাবে গুরুতর রোগী হলে তাদের দ্রুত চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে যেতে হয়। এতে যেমন সময় নষ্ট হয়, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে। শহরের বড় হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ তৈরি হয়, যার ফলে চিকিৎসাসেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
যদি পটিয়ায় একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন করা যায়, তাহলে স্থানীয় পর্যায়েই অধিকাংশ রোগীর চিকিৎসা সম্ভব হবে। এতে শহরে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে এবং চট্টগ্রাম শহরের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ অনেকটা লাঘব হবে। জরুরি রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে, যা অনেক ক্ষেত্রে জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
১৯০১ সালে চট্টগ্রাম শহরের আন্দরকিল্লায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, সেই সময়ে চট্টগ্রামের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ লাখ। লোকসংখ্যা বৃদ্ধি ও চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ১৯২৭ সালে এই হাসপাতাল প্রাঙ্গণে চট্টগ্রাম মেডিকেল স্কুলের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৬০ সালে বর্তমান ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে চট্টগ্রামের জনসংখ্যা প্রায় এককোটি হলেও নতুন করে কোন হাসপাতাল হয়নি। ফৌজদারহাট টিভি হাসপাতালটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও সেবায় অনেকটা পিছিয়ে আছে। আর এটি উত্তর চট্টগ্রামে অবস্থিত। তবে চট্টগ্রাম বিভাগের জেলা সমূহে যে কয়টি মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং কলেজ আছে সেগুলোই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত।
সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে জনসংখ্যা আর এর সাথে বেড়েছে রোগীও। কিন্তু সেই তুলনায় সরকারী হাসপাতাল তেমন বাড়েনি। ফলে শহরের চাপ ও নাগরিক ভোগন্তি রোধে সরকারের উচিৎ দক্ষিণ চট্টগ্রামের জন্য পটিয়ায় একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা। এছাড়া শহরে রোগীর চাপ কমলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও রোগীদের প্রতি আরও মনোযোগ দিতে পারবেন। বর্তমানে অতিরিক্ত রোগীর কারণে অনেক সময় চিকিৎসা সেবার মান ব্যাহত হয়। পটিয়ায় একটি উন্নত হাসপাতাল চালু হলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় ভারসাম্য তৈরি হবে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হবে। আর রোগীর চাপ বৃদ্ধি মানেই নানা রকম ভোগান্তী, গাড়ীর চাপ, অতিরিক্ত মানুষের চাপ ইত্যাদি। রোগীর চাপ কমা মানেই রাস্তায় জ্যামে পড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা ও শ্রমিকের কর্মঘন্টা নষ্ট হওয়া থেকেও রক্ষা পাবে। শহরের মানুষের কষ্ট অনেকটা লাঘব হবে, রাস্তার জ্যাম অনেক কমবে, একটু আরামে চলাফেরা করতে পারবে।
অন্যদিকে, পটিয়ায় আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হলে আশপাশের এলাকা যেমন, আনোয়ারা উপজেলা, চন্দনাইশ উপজেলা এবং সাতকানিয়া উপজেলা এর মানুষও উপকৃত হবে। এসব এলাকার রোগীদের শহরে না গিয়ে কাছাকাছি চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে যাতায়াত খরচ কমবে এবং সময়ও সাশ্রয় হবে।
সর্বোপরি বলা যায়, পটিয়ায় একটি আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা শুধু একটি উপজেলার জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। এটি শহরের হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাবে, রোগীদের ভোগান্তি কমাবে এবং সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত এই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
পটিয়া উপজেলার বর্তমান আয়তন প্রায় ১৫৭ বর্গ কিলোমিটার, ২০২৬ সালের হিসেবে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫২ হাজার ৬৯৫ জন, তবে লোকসংখ্যা ৪ লাখের অধিক। পাকিস্তান আমলে অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে মহকুমা (সাবডিভিশন) হিসেবে প্রশাসনিক স্বীকৃতি লাভ করে পটিয়া। পরে ১৯৮৩ সালে মহকুমা বিলুপ্ত করে ১৯৮৪ সালে মহকুমা থেকে উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। ভৌগলিকভাবে পটিয়ার অবস্থান দক্ষিণ চট্টগ্রামের মিডল পয়েন্টে। বোয়লখালী, কর্ণফুলী, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া, এই এলাকাগুলোর মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে পটিয়া। সুতরাং পটিয়াতে একটি আধুনিক সরকারী হাসপাতাল স্থাপিত হলে পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ উপকৃত হবে।
বর্তমানে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এটি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
পটিয়া একটি প্রাচীন ও জনবহুল এলাকা হওয়ায় এখানে প্রতিনিয়ত চিকিৎসা সেবার চাহিদা বাড়ছে। বর্তমান সময়ে সাধারণ চিকিৎসা সেবা ছাড়াও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা, আধুনিক যন্ত্রপাতি, জরুরি বিভাগ, আইসিইউ ও উন্নত অপারেশন সুবিধা অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে এসব আধুনিক সুবিধা সীমিত। ফলে অনেক রোগীকে জরুরি চিকিৎসার জন্য দূরবর্তী এলাকায় যেতে হয়, বিশেষ করে চট্টগ্রাম শহরের বড় হাসপাতালগুলোতে যেতে গিয়ে রোগীরা সময়, অর্থ ও ভোগান্তির শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে এই বিলম্ব রোগীর জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।
পটিয়ায় একটি আধুনিক সরকারি হাসপাতাল স্থাপিত হলে শুধু পটিয়ার মানুষই নয়, বরং পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের জনগণ উপকৃত হবে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা, যেমন আনোয়ারা, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া থেকে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরমুখী হন। একটি আধুনিক হাসপাতাল এই অঞ্চলে স্থাপিত হলে এসব এলাকার মানুষ স্থানীয় পর্যায়েই উন্নত চিকিৎসা সেবা পেতে পারবেন। এতে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি রোগীদের জীবন রক্ষা সহজ হবে।
পটিয়ার মানুষের দেশের অর্থনীতিতে অবদানও এই দাবি জোরালো করে। এই অঞ্চল থেকে উঠে আসা অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের অবদানের ফলে দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে। এমন একটি অবদানশীল এলাকার মানুষের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। একটি আধুনিক সরকারি হাসপাতাল স্থাপন করলে তা হবে এই অঞ্চলের মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।
এছাড়া একটি আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মচারীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি, আধুনিক হাসপাতাল থাকলে এলাকার স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং মানুষ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণে আগ্রহী হবে।
বর্তমান সময়ে দুর্ঘটনা ও জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনা, শিল্প দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা হঠাৎ অসুস্থতা, এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পটিয়ায় একটি আধুনিক হাসপাতাল থাকলে জরুরি মুহূর্তে দ্রুত চিকিৎসা প্রদান সম্ভব হবে। বিশেষ করে আইসিইউ, ট্রমা সেন্টার ও আধুনিক অপারেশন থিয়েটার থাকলে অনেক মূল্যবান জীবন রক্ষা করা যাবে।
পটিয়ার মতো একটি ঐতিহাসিক, জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে একটি আধুনিক সরকারি হাসপাতাল স্থাপন করা শুধু প্রয়োজনই নয়, বরং অত্যন্ত জরুরি। এটি বাস্তবায়িত হলে পটিয়া ও সমগ্র দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাবে, জীবনমান উন্নত হবে এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে বৈষম্য অনেকাংশে কমে আসবে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে দ্রুত পটিয়ায় একটি আধুনিক সরকারি হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা।
পটিয়ায় হাসপাতাল হলে শহরের চাপ অনেকটা কমবে:
চট্টগ্রাম অঞ্চলের জনসংখ্যা ও নগরায়ণের দ্রুত বিস্তারের ফলে বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ দিন দিন বাড়ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসার জন্য শহরে আসতে বাধ্য হন। বিশেষ করে পটিয়া উপজেলা থেকে বিপুলসংখ্যক রোগী প্রতিদিন শহরমুখী হন। এই বাস্তবতায় পটিয়ায় একটি আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হলে শহরের ওপর রোগীর চাপ অনেকাংশে কমে আসবে।
যে কারণে পটিয়াতে হাসপাতাল দরকার:
পটিয়া একটি ঐতিহ্যবাহী ও জনবহুল উপজেলা। এখানে জনসংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি আশপাশের অনেক উপজেলা ও গ্রামীণ এলাকার মানুষও পটিয়াকে কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার অভাবে গুরুতর রোগী হলে তাদের দ্রুত চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে যেতে হয়। এতে যেমন সময় নষ্ট হয়, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে। শহরের বড় হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ তৈরি হয়, যার ফলে চিকিৎসাসেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
যদি পটিয়ায় একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন করা যায়, তাহলে স্থানীয় পর্যায়েই অধিকাংশ রোগীর চিকিৎসা সম্ভব হবে। এতে শহরে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে এবং চট্টগ্রাম শহরের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ অনেকটা লাঘব হবে। জরুরি রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে, যা অনেক ক্ষেত্রে জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
১৯০১ সালে চট্টগ্রাম শহরের আন্দরকিল্লায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, সেই সময়ে চট্টগ্রামের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ লাখ। লোকসংখ্যা বৃদ্ধি ও চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ১৯২৭ সালে এই হাসপাতাল প্রাঙ্গণে চট্টগ্রাম মেডিকেল স্কুলের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৬০ সালে বর্তমান ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে চট্টগ্রামের জনসংখ্যা প্রায় এককোটি হলেও নতুন করে কোন হাসপাতাল হয়নি। ফৌজদারহাট টিভি হাসপাতালটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও সেবায় অনেকটা পিছিয়ে আছে। আর এটি উত্তর চট্টগ্রামে অবস্থিত। তবে চট্টগ্রাম বিভাগের জেলা সমূহে যে কয়টি মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং কলেজ আছে সেগুলোই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত।
সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে জনসংখ্যা আর এর সাথে বেড়েছে রোগীও। কিন্তু সেই তুলনায় সরকারী হাসপাতাল তেমন বাড়েনি। ফলে শহরের চাপ ও নাগরিক ভোগন্তি রোধে সরকারের উচিৎ দক্ষিণ চট্টগ্রামের জন্য পটিয়ায় একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা। এছাড়া শহরে রোগীর চাপ কমলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও রোগীদের প্রতি আরও মনোযোগ দিতে পারবেন। বর্তমানে অতিরিক্ত রোগীর কারণে অনেক সময় চিকিৎসা সেবার মান ব্যাহত হয়। পটিয়ায় একটি উন্নত হাসপাতাল চালু হলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় ভারসাম্য তৈরি হবে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হবে। আর রোগীর চাপ বৃদ্ধি মানেই নানা রকম ভোগান্তী, গাড়ীর চাপ, অতিরিক্ত মানুষের চাপ ইত্যাদি। রোগীর চাপ কমা মানেই রাস্তায় জ্যামে পড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা ও শ্রমিকের কর্মঘন্টা নষ্ট হওয়া থেকেও রক্ষা পাবে। শহরের মানুষের কষ্ট অনেকটা লাঘব হবে, রাস্তার জ্যাম অনেক কমবে, একটু আরামে চলাফেরা করতে পারবে।
অন্যদিকে, পটিয়ায় আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হলে আশপাশের এলাকা যেমন, আনোয়ারা উপজেলা, চন্দনাইশ উপজেলা এবং সাতকানিয়া উপজেলা এর মানুষও উপকৃত হবে। এসব এলাকার রোগীদের শহরে না গিয়ে কাছাকাছি চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে যাতায়াত খরচ কমবে এবং সময়ও সাশ্রয় হবে।
সর্বোপরি বলা যায়, পটিয়ায় একটি আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা শুধু একটি উপজেলার জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। এটি শহরের হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাবে, রোগীদের ভোগান্তি কমাবে এবং সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত এই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
পটিয়া উপজেলার বর্তমান আয়তন প্রায় ১৫৭ বর্গ কিলোমিটার, ২০২৬ সালের হিসেবে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫২ হাজার ৬৯৫ জন, তবে লোকসংখ্যা ৪ লাখের অধিক। পাকিস্তান আমলে অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে মহকুমা (সাবডিভিশন) হিসেবে প্রশাসনিক স্বীকৃতি লাভ করে পটিয়া। পরে ১৯৮৩ সালে মহকুমা বিলুপ্ত করে ১৯৮৪ সালে মহকুমা থেকে উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। ভৌগলিকভাবে পটিয়ার অবস্থান দক্ষিণ চট্টগ্রামের মিডল পয়েন্টে। বোয়লখালী, কর্ণফুলী, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া, এই এলাকাগুলোর মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে পটিয়া। সুতরাং পটিয়াতে একটি আধুনিক সরকারী হাসপাতাল স্থাপিত হলে পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ উপকৃত হবে।
বর্তমানে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এটি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক, সভাপতি: রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।
এমএসএম / এমএসএম
বিশ্বাস-অবিশ্বাসে ভেস্তে গেল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা
পহেলা বৈশাখ: সম্প্রীতির উৎসবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক বাঙালি সত্তা
পহেলা বৈশাখের চেতনা ও ৮ই ফাল্গুন: উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাত্যহিক ব্যবহারের দাবি
সময়ের সাথে বেমানান প্যাডেল রিকশা, বিকল্প হতে পারে ইজিবাইক
বাংলা নববর্ষ উদযাপনে সেকালের আন্তরিকতা ও একালের আধুনিকতা
চট্টগ্রামের পটিয়ায় একটি আধুনিক মানের সরকারি হাসপাতাল দরকার
নববর্ষ ১৪৩৩ সবার জন্য হোক মঙ্গলময়
নিম্নমানের জ্বালানিতে বিলিয়ন ডলার ক্ষতি: আমরা কি তা উপেক্ষা করছি?
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরতদের মাসিক সম্মানী: আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের মহাপ্রলয়: অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ
তেলের যুদ্ধ: জিসিসির ক্ষয়, আমেরিকা-রাশিয়া-ইরানের জয়!
সড়ক দখলমুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন
”আলোর খোঁজে” আধাঁর পথে ঘুরছি শুধু দিনে রাতে
Link Copied