সময়ের সাথে বেমানান প্যাডেল রিকশা, বিকল্প হতে পারে ইজিবাইক
সময়ের সাথে সভ্যতা যেমন বদলায়, তেমনি বদলায় মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম। একসময় গরুর গাড়ি ছিল আধুনিকতার প্রতীক, পরে এল ঘোড়ার গাড়ি, তারপর মোটরচালিত যানবাহন। নগরায়ণের এই দ্রুতগতির যুগে পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন শুধু বিলাসিতা নয়, এটি একটি প্রয়োজন। আমাদের শহরগুলো, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, ঢাকা কিংবা অন্যান্য জেলা শহর, আজ জনসংখ্যার চাপ, যানজট, দূষণ ও সময়ের অপচয়ের চরম সংকটে আছে। এই প্রেক্ষাপটে প্যাডেল রিকশা কি সত্যিই সময়োপযোগী? নাকি প্রযুক্তিনির্ভর ইজিবাইক বা ব্যাটারিচালিত রিকশাই হতে পারে একটি কার্যকর বিকল্প?
প্যাডেল রিকশা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এটি শ্রমনির্ভর, পরিবেশবান্ধব এবং বহু মানুষের জীবিকার উৎস। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কি আজকের নগর বাস্তবতায় কার্যকর? প্যাডেল রিকশা চালানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। একজন চালককে সারাদিন শারীরিক শক্তি খরচ করে অল্প দূরত্বে যাত্রী পরিবহন করতে হয়। এতে তার স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে, আয় সীমিত থাকে, আর যাত্রীও দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। শহরের ব্যস্ত সড়কে ধীরগতির প্যাডেল রিকশা অনেক সময় যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বড় শহরের দ্রুতগতির যানবাহনের ভিড়ে এটি অনেক ক্ষেত্রে বেমানান মনে হয়। আর চট্টগ্রামের উচুনিচু রাস্তা তাদের কষ্ট আরো বাড়িয়ে দেয়। যখন দেখি টানতে কষ্ট হয় তখন প্যাডেল রিকশা চড়ার প্রতি আগ্রহ থাকে না।
অন্যদিকে, ইজিবাইক বা ব্যাটারিচালিত রিকশা তুলনামূলক দ্রুত, কম পরিশ্রমসাপেক্ষ এবং অধিক কার্যকর। বৈদ্যুতিক শক্তিচালিত হওয়ায় এটি জ্বালানির খরচ কমায় এবং বায়ুদূষণ কমাতে সহায়ক। একজন চালক কম শারীরিক পরিশ্রমে বেশি ট্রিপ দিতে পারে, ফলে তার আয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। যাত্রীও কম সময়ে, তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। পরিশ্রম কম হওয়ায় অনেক শিক্ষিত বেকার যুবকরাও এই রিকশা চালানোর কাজ করে সংসার চালায়, যা প্যাডেল রিকশায় সম্ভব না।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইজিবাইক চলছে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো বৈধতার অভাবে নানা সমস্যায় পড়ে। লাইসেন্স, রুট পারমিট, নিবন্ধন, এসব অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু চক্র চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হয়। চালকদের কাছ থেকে প্রতিদিন অবৈধভাবে টাকা আদায় করা হয়। এতে চালকদের আয় কমে যায় এবং যাত্রীদের উপর অতিরিক্ত ভাড়া চাপিয়ে দেওয়া হয়। যদি সরকার সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে, নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করে এবং নির্দিষ্ট রুটে বৈধতা দেয়, তাহলে এই চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব।
চার্জিং স্টেশন নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। বর্তমানে অনেক চালক বাসাবাড়িতে বা অনিরাপদ স্থানে ব্যাটারি চার্জ দেন, যা অগ্নিকাণ্ড বা বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করে। যদি সরকার বা সিটি কর্পোরেশন পরিকল্পিতভাবে চার্জিং স্টেশন তৈরি করে, সোলার শক্তির ব্যবহার বাড়ায় এবং নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তোলে, তাহলে এটি হবে একটি টেকসই সমাধান। এতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাও নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং পরিবেশবান্ধব শক্তির ব্যবহার বাড়বে।
চালকদের প্রশিক্ষণও অত্যন্ত প্রয়োজন। অনেক ইজিবাইক চালক ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞ। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। সরকার যদি ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক আইন শিক্ষা এবং গ্রাহকসেবা বিষয়ক সংক্ষিপ্ত কোর্স চালু করে, তাহলে এই বাহনগুলোকে আধুনিক ও নিরাপদ গণপরিবহনে রূপান্তর করা সম্ভব। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক মানে নিরাপদ যাত্রা, শৃঙ্খলাবদ্ধ চলাচল এবং যাত্রীদের আস্থা বৃদ্ধি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সিএনজি অটোরিকশার অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সমস্যা। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, মিটার না মানা, অতিরিক্ত ভাড়া দাবি, স্বল্প দূরত্বে যেতে অনীহা। যদি ইজিবাইক সুশৃঙ্খল ও বৈধভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে এটি একটি প্রতিযোগিতামূলক বিকল্প তৈরি করবে। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই ভাড়া নিয়ন্ত্রণে আসবে। যাত্রীরা বিকল্প পেলে কোনো একটি বাহনের একচেটিয়া দৌরাত্ম্য কমে যায়।
তবে এই পরিবর্তন হঠাৎ করে করা উচিত নয়। প্যাডেল রিকশাচালকদের পুনর্বাসন জরুরি। যারা বহু বছর ধরে এই পেশায় আছেন, তাদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স দিয়ে ইজিবাইক চালনায় উৎসাহিত করা যেতে পারে। এতে তাদের আয় বাড়বে, জীবনমান উন্নত হবে এবং সামাজিক মর্যাদাও বৃদ্ধি পাবে।
পরিবেশের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। প্যাডেল রিকশা সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত হলেও এর সীমাবদ্ধতা আছে। ইজিবাইক বিদ্যুৎচালিত হওয়ায় সরাসরি ধোঁয়া নির্গত করে না। যদি নবায়নযোগ্য শক্তি, বিশেষ করে সোলার পাওয়ার, ব্যবহার বাড়ানো যায়, তাহলে এটি আরও পরিবেশবান্ধব হবে। একই সাথে পুরনো, নিম্নমানের ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পরিবেশ দূষণ না ঘটে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইজিবাইক সম্ভাবনাময়। দেশীয়ভাবে সংযোজন ও উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হলে কর্মসংস্থান বাড়বে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন। স্থানীয় সরকার রাজস্ব আয় করতে পারবে লাইসেন্স ও নিবন্ধনের মাধ্যমে। পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হলে এটি হতে পারে নগর অর্থনীতির একটি শক্তিশালী খাত।
নগর পরিকল্পনার সাথে সমন্বয় করাও জরুরি। নির্দিষ্ট লেন, নির্দিষ্ট রুট ও স্টপেজ নির্ধারণ করলে বিশৃঙ্খলা কমবে। ইজিবাইককে যদি ফিডার সার্ভিস হিসেবে ব্যবহার করা যায়, অর্থাৎ বড় বাস বা গণপরিবহনের সাথে সংযোগকারী বাহন হিসেবে, তাহলে শহরের পরিবহন ব্যবস্থায় একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি হবে। এতে ব্যক্তিগত গাড়ির উপর নির্ভরতা কমবে, যানজটও কমতে পারে।
প্রযুক্তিগত উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত মানের ব্যাটারি, জিপিএস ট্র্যাকিং, ডিজিটাল ভাড়া নির্ধারণ ব্যবস্থা যুক্ত করা গেলে ইজিবাইক আরও আধুনিক রূপ পাবে। অ্যাপভিত্তিক বুকিং চালু হলে যাত্রীরা নির্দিষ্ট ভাড়া ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অনিয়ম কমবে।
সবশেষে, পরিবর্তনের মূল কথা হলো সময়ের দাবি মেনে চলা। প্যাডেল রিকশা আমাদের ইতিহাসের অংশ, কিন্তু ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান প্রয়োজন। ইজিবাইক সেই সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে, যদি তা সুশৃঙ্খল, বৈধ ও পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়। চাঁদাবাজি বন্ধ, বৈধতা প্রদান, চার্জিং স্টেশন নির্মাণ এবং চালকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সরকার চাইলে এই খাতকে একটি আধুনিক, মানবিক ও কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে পারে।
নগর জীবনের গতি থেমে থাকে না। মানুষের সময় মূল্যবান, শ্রম মূল্যবান, পরিবেশ মূল্যবান। সেই মূল্যবোধকে সামনে রেখে যদি আমরা পরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক করি, তাহলে নাগরিক জীবনে আসবে স্বস্তি, অর্থনীতিতে আসবে গতি, আর সমাজে তৈরি হবে ন্যায্যতার নতুন দিগন্ত। সময়ের সাথে বেমানান প্যাডেল রিকশার জায়গায় পরিকল্পিত ইজিবাইক হতে পারে সেই পরিবর্তনের প্রতীক, যেখানে শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা পাবে, যাত্রী পাবে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ সেবা, আর শহর পাবে এক নতুন গতিময়তা।
ব্যাটারী রিকশা নিয়ে নানারকম এলার্জি কিন্তু আছে, এরমধ্যে অনভিজ্ঞ চালকের ফলে দুর্ঘটনা, বৈদ্যুতিক অপচয় অন্যতম। দুর্ঘটনা রোধে চালকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে সরকার। আর বৈদ্যুতিক অপচয় ঠেকাতে প্রথমেই চোরা লাইনের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ চাইলে চার্জিং স্টেশনের জন্য বাণিজ্যিক সংযোগ দিয়ে বিল আদায় করতে পারে। আর বিদ্যুতের ঘাটতি থাকলে উৎপাদনে মনযোগী হতে পারে। তাও সম্ভব না হলে সোলার সিস্টেম বাধ্যতামুলক করে সরকার একটি নীতিমালা তৈরি করতে পারে। আর সেই নীতিমালার আলোকে এটি একটি সাশ্রয়ী ও সময়োপযোগী পরিবহন হতে পারে।
লেখক: কবি,সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক, সভাপতি: রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।
এমএসএম / এমএসএম
বিশ্বাস-অবিশ্বাসে ভেস্তে গেল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা
পহেলা বৈশাখ: সম্প্রীতির উৎসবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক বাঙালি সত্তা
পহেলা বৈশাখের চেতনা ও ৮ই ফাল্গুন: উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাত্যহিক ব্যবহারের দাবি
সময়ের সাথে বেমানান প্যাডেল রিকশা, বিকল্প হতে পারে ইজিবাইক
বাংলা নববর্ষ উদযাপনে সেকালের আন্তরিকতা ও একালের আধুনিকতা
চট্টগ্রামের পটিয়ায় একটি আধুনিক মানের সরকারি হাসপাতাল দরকার
নববর্ষ ১৪৩৩ সবার জন্য হোক মঙ্গলময়
নিম্নমানের জ্বালানিতে বিলিয়ন ডলার ক্ষতি: আমরা কি তা উপেক্ষা করছি?
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরতদের মাসিক সম্মানী: আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের মহাপ্রলয়: অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ
তেলের যুদ্ধ: জিসিসির ক্ষয়, আমেরিকা-রাশিয়া-ইরানের জয়!
সড়ক দখলমুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন