পহেলা বৈশাখের চেতনা ও ৮ই ফাল্গুন: উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাত্যহিক ব্যবহারের দাবি
নববর্ষকে স্বাগত জানানো বিশ্বজুড়ে প্রতিটি মানুষের একটি সহজাত রীতি। এই সুন্দর ধরণীর বুকে মানুষ তাদের আগমনকে স্মৃতিময় করে রাখার জন্য, তাদের জীবন ও জীবিকার উৎসের জন্য বিধাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আনন্দময় করার প্রত্যাশা সামনে রেখে নববর্ষ উদযাপন করে থাকে। যুগ যুগ ধরে নববর্ষ পালনের বাঙালি সংস্কৃতিটি একটি অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে।আমরা জানি, বর্তমান বিশ্বে প্রায় প্রতিটি জাতিরই নিজস্ব এক নববর্ষ পালনের রীতিনীতি বিশেষভাবে স্বীকৃত। নববর্ষ উদযাপনের চিরায়ত বিশ্বব্যাপী ধরন যেমন হ্যাপি নিউ ইয়ার, আরব জাতির মহরমের প্রথম দিনের নওরোজ, লাওসে নববর্ষের উৎসব যে দিনটিতে শুরু হয় সেটি ঠিক আমাদের পহেলা বৈশাখ। ঋতুরাজ বসন্তের দহন শেষে গ্রীষ্মের উদার আঁচলে যখন বাহারি ফলের মেলা বসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই দুয়ারে কড়া নাড়ে বাংলা নববর্ষ। বৈশাখের অর্থই যেন নতুন কে বরণ করে নেওয়া পুরাতন ক্ষত মুছে নতুন সম্ভাবনার পথে পা বাড়ানো। তাইতো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উচ্চারণ করেন, "মুছে যাক গ্লানি, মুছে যাক জরা, অগ্নিস্নানে সূচি হোক ধরা।" এই আহ্বান কেবল ঋতু পরিবর্তনের নহে, ইহা এক আত্মীক শুদ্ধির আহ্বান, এক সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের সংকেত। বাংলা ক্যালেন্ডার এর বছরের প্রথম মাস হল বৈশাখ। বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ নামটি এসেছে। ইতিহাস সাক্ষী দেয় বাংলা সনের প্রবর্তন করেন মোগল সম্রাট আকবর। তিনি খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য তার সভার জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ সিরাজির সহযোগিতায় ১৫৮৪ সালের "তারিখ -এ -এলাহী"নামে একটি নতুন বছর গণনা পদ্ধতি চালু করেন। এটি কৃষকদের কাছে "ফসলের সন" নামে পরিচিত হয় তারপরে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।৯৬৩ হিজরীতে তথা ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আহরণের সময় থেকে আমাদের বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। বাংলা নববর্ষ যেন এক পলিমাটি যেখানে সব ভেদাভেদ ভুলে সব ধর্মের সব শ্রেণীর মানুষের প্রাণের উচ্ছ্বাস প্রস্ফুটিত হয়। এ কারণেই বাঙালির সর্বজনীন ও সবচেয়ে বড় উৎসব বাংলা নববর্ষ।১৬০৮ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে সুবেদার ইসলাম খান ঢাকাকে যখন রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন, সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত থেকেই পহেলা বৈশাখ দিনটি উৎসবের গুরুত্ব পেতে শুরু করে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের জাতীয় পার্বণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৮৯ সালে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বৈশাখের প্রভাতে তখনকার চারুকলা ইনস্টিটিউট এখন অনুষদ থেকে বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের ঢোল আর বাদ্যের তালে শোভাযাত্রা বের করে।বাংলা নববর্ষের একটি অনুষঙ্গ "আমানি"(আম পানীয়) খাওয়া। পূন্যাহ অর্থ কোন পুন্য কাজ শুরু করার জন্য জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুমোদিত প্রশস্ত দিন। বাংলায় এর অর্থ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল জমিদার কর্তৃক প্রজাদের কাছ থেকে নতুন বছরের খাজনা আদায়ের প্রারম্ভিক অনুষ্ঠান সূচক দিন।এই দিনে প্রজারা ভালো কাপড়-চোপড় করে জমিদার তালুকদারদের বাড়িতে খাজনা দিতে আসতেন। কোথাও কোথাও জমিদার তালুকদারেরা পান সুপারি অথবা মিষ্টি মুখ করিয়ে আপ্যায়ন করতেন । মোহাম্মদ এনামুল হকের লেখা উল্লেখ পাওয়া যায় যে ১৯২০ সাল পর্যন্ত পহেলা বৈশাখে পূন্যাহ অনুষ্ঠিত হতো । ব্যবসায়িক লেনদেনের স্বচ্ছতা ফেরাতে বাংলা নতুন বছরের শুরুতে পুরনো হিসাব নিকাশ চুকিয়ে ব্যবসায়ীদের নতুন খাতা খোলার এক আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ হালখাতা। সেকালের হালখাতা গুলো লালসালু বা কাপড়ে মোড়ানো থাকতো। এ উপলক্ষে সাধারণত নিয়মিত ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানানো এবং মিষ্টি দ্বারা আপ্যায়ন করা হয়।পহেলা বৈশাখের মেলা হলো বাঙালির প্রাণের মেলা,সামাজিক ও অর্থনৈতিক মিলনস্থল। অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে সব ধর্ম ও বর্ণের হাজার মানুষ সমবেত হয়ে থাকে এই মেলায়। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরাওগাইছেন বৈশাখী গান, মাকসুদ এর গীত "মেলায় যাইরে" হয়ে আছে নতুন যুগের বৈশাখী আবাহন।সময়ের পরিক্রমায় নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক প্রাচীন উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে আবার সংযোগ ঘটেছে অনেক নতুন ও বৈচিত্রময় উৎসবের। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে পূন্যাহ উৎসবেরও বিলুপ্তি ঘটে। তখন পহেলা বৈশাখ ছিল জমিদারদের পূণ্যাহের দিন। পুরান ঢাকার আকাশ জুড়ে ঘুড়ি ওড়ানো উৎসব এবং মুন্সিগঞ্জের গ্রামীণ জনপদে গরুর দৌড় প্রতিযোগিতা ছিল একসময় অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। কিন্তু এ দুটি সহ মোরগের লড়াই, ষাড়ের লড়াই, পায়রা উড়ানো, বহুরূপী সাজ ইত্যাদি গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় খেলা কালের করাল গ্রাসে আজ সেগুলো হারিয়ে যাওয়ার পথে। বাঙালি চিরায়ত নববর্ষ বর্তমানে নগর জীবনে নগর সংস্কৃতির আদলে অত্যন্ত জাকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়। পহেলা বৈশাখের ভোরে উদীয়মান সূর্যকে অভিবাদন জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নববর্ষের মাহেন্দ্রক্ষণ। নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন। এদিন সাধারণত সব শ্রেণীর এবং সব বয়সের মানুষ ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাক পরিধান করেন। এদিন সকালবেলা পান্তা ভাত খাওয়া একটি আভিজাত্যপূর্ণ ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। সঙ্গে থাকে মুচমুচে ইলিশ মাছ ভাজা আর ঝাল মরিচ পেঁয়াজ। বর্ষবরণের চমকপদ ও জমজমাট আয়োজন ঘটে রাজধানী ঢাকায়। ছায়ানটের উদ্যোগে জনাকীর্ণ রমনার বটমূলে রবীন্দ্রনাথের আগমনী গান "এসো হে বৈশাখ এসো এসো "এর মাধ্যমে নতুন বর্ষকে বরণ করা হয়। স্থানটি বটমূল নামে পরিচিত হলেও প্রকৃতপক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি করা হয় সেটি একটি অশ্বথ গাছ।বাংলা নববর্ষ ও চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) উপজাতিদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব "বৈসাবি" আনন্দমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়।পৃথিবীর বুকে একমাত্র যে দেশের মানুষ তাদের ভাষা রক্ষার জন্য আন্দোলন করে জীবন দিয়েছে, যে দেশে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষ পালিত হয় জমজমাট পরিবেশে আনন্দঘন উৎসবে সে দেশেই বাংলা সন ও বাংলা তারিখ চর্চা অত্যন্ত নগণ্য। অফিস আদালত ব্যাংক বীমা বিদেশ ভ্রমণের তারিখ নির্ধারণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলা তারিখের ব্যবহারিক কার্যকারিতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এই অবস্থায় পহেলা বৈশাখের চেতনা তথা বাঙালির সংস্কৃতি ও বাংলা সন তারিখ আদালত সহ দেশের সর্বত্র চালু করা প্রয়োজন। যেহেতু আমাদের মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগের গৌরবোজ্জ্বল দিনটি ছিল বাংলা ক্যালেন্ডার এর ৮ই ফাগুন তাই সকল দাপ্তরিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ইংরেজি ২১শে ফেব্রুয়ারির সঙ্গে এই বাংলা তারিখ ৮ই ফাল্গুন সংযুক্ত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সংস্কৃতি তার বহুত্ববাদ, পরমতসহিষ্ণুতা এবং উদার চিন্তাধারার জন্যই বিশ্বদরবারে সমাদৃত। সেই চেতনাকে অক্ষুন্ন রাখা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। শুভ নববর্ষ ১৪৩৩ !
লেখক শুভঙ্কর সাহা সহকারী শিক্ষক ঘুনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নাগরপুর, টাঙ্গাইল
এমএসএম / এমএসএম
হরমুজ প্রণালীতে ট্রাম্পের "ডেথ-ব্লক" ও ইরানের "ইউয়ান-টোল" ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধসের অপেক্ষায় বিশ্ব
বিশ্বাস-অবিশ্বাসে ভেস্তে গেল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা
পহেলা বৈশাখ: সম্প্রীতির উৎসবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক বাঙালি সত্তা
পহেলা বৈশাখের চেতনা ও ৮ই ফাল্গুন: উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাত্যহিক ব্যবহারের দাবি
সময়ের সাথে বেমানান প্যাডেল রিকশা, বিকল্প হতে পারে ইজিবাইক
বাংলা নববর্ষ উদযাপনে সেকালের আন্তরিকতা ও একালের আধুনিকতা
চট্টগ্রামের পটিয়ায় একটি আধুনিক মানের সরকারি হাসপাতাল দরকার
নববর্ষ ১৪৩৩ সবার জন্য হোক মঙ্গলময়
নিম্নমানের জ্বালানিতে বিলিয়ন ডলার ক্ষতি: আমরা কি তা উপেক্ষা করছি?
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরতদের মাসিক সম্মানী: আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের মহাপ্রলয়: অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ
তেলের যুদ্ধ: জিসিসির ক্ষয়, আমেরিকা-রাশিয়া-ইরানের জয়!