ঢাকা বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

কেরানীগঞ্জে বিআরটিএ’র কর্মকর্তারা দালালদের মোবাইল ফোনেই সেবা প্রত্যাশীদের সমস্যা সমাধান করছেন


আব্দুল লতিফ রানা photo আব্দুল লতিফ রানা
প্রকাশিত: ১৩-৪-২০২৬ বিকাল ৫:৪৮

 দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সার্কেল-২ কার্যালয়ে এখন দালালচক্রের দৌরাত্ম্য নয়া কৌশলে এখন কয়েকগুন বেড়েছে। সরকারিভাবে নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও সেবাগ্রহীতা এখন দালালচক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। 
নয়া কৌশল হিসেবে এখন সেবা গ্রহিতা সরাসরি ভেতরে না ঢুকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর মোবাইল ফোন ও বিকাশের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেনের মাধ্যমেই দালাল তাকে সেবা পাইয়ে দিচ্ছেন। সেবা প্রত্যাশিরা বিআরটিএর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন, মালিকানা বদলিসহ প্রায় সব সেবাতেই দালাল চক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন।  
সূত্র জানায়, স্বৈরাচারী সরকার পতনের পর বহুল আলোচিত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের আগে দালালচক্রের প্রভাব ছিল। কঠোর নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকলেও দালালদের ঠেকানো যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের একটি অংশ এখনো বাধ্য হয়ে চক্রের শরণাপন্ন হচ্ছেন। ঢাকা জেলার ইকুরিয়া বিআরটিএ কার্যালয়ের মূল ফটকে ঢোকার আগেই দালালের সেবা প্রত্যাশিদের দিকে ছুটে এসে তাদের কাছে জানতে চান, তিনি কি কাজ করাবেন। এরপর তারা সেবাগ্রহিতাদের অফার করে বলেন, কম সময়ে, কম খরচে কাজ করিয়ে দেওয়া হবে। এরপর সেবা নিতে আসা লোকজনকে দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আড়ালে নিয়ে যায়।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে দালালদের কয়েকজন জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিআরটিএর কঠোর অবস্থানের কারণে আগের মতো সহজে ভেতরে ঢোকা যায় না। ফলে তাদের আয়-রোজগার কমে গেছে। তবে তারা স্বীকার করে বলেন, তাদের দালালীর কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই ভেতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজ সেরে নেন।
হাসানুজ্জামান নামে একজন সেবা প্রত্যাশি জানান, ইকুরিয়ায় বিআরটিএর জন্মলগ্ন থেকেই এখানে এই কাজ করছি। অন্য কোনো কাজ শিখিনি। এজন্য সংসার চালাতে এই কাজ ছাড়া তাদের আর কোন উপায় নেই। আর এই দালালীর কাজ করতে গিয়ে অনেকবার জেলে গিয়েছেন। তারপরও এই দালালীর পেশা ছাড়তে পারছেন না। এখন মোবাইল কোর্ট চলাকালে আমরা আশপাশেও থাকি না। ধরা পড়লে তিন মাস পর্যন্ত জেল খাটতে হয়। এজন্য এখন তারা দূরে থেকেই কাজ করে দেন।
অপর এক ব্যক্তি জানান, বিআরটিএ একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিস। এখানে প্রায়ই বিদ্যুৎ না থাকায় কাজের গতি ব্যাহত হয় এবং সেবায়ও বিলম্ব ঘটে। কোনো রকমের হয়রানি হয়নি, তবে অস্বস্তি হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না আসায় অন্ধকারে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। বিদ্যুৎ আসার পর কাজ সেরে ফিরছি। সেখানে কিছু সময় অপেক্ষার পর অফিসের ভেতরের পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত দেখা যায়। এসময় কেউ কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে গাড়ির ফিটনেস করান, আবার কেউ নতুন গাড়ির নম্বর প্লেট নিচ্ছেন। ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য অনলাইনে শিক্ষানবিশ কার্ড ও পরীক্ষার সময়সূচি দেওয়ার কারণে এখন আগের মতো ভিড় নেই বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগিরা।
স্থানীয় পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ইকুরিয়ার বিআরটিএ কার্যালয়ে দীর্ঘ ১৭-১৮ বছর ধরে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর এখনো অফিসের ভেতর ও বাইরের কিছু অসাধু কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশে তারা পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে তিনি বিআরটিএর এক দালালের সঙ্গে ১২ হাজার টাকায় চুক্তি করেন। 
ইউনুস আলী নামের এক ভুক্তভোগি জানান, গত চার বছর আগের বিআরটিএ আর এখনকার বিআরটিএর মধ্যে অনেক পার্থক্য। আগে বাধ্য হয়ে দালালের মাধ্যমে কাজ করতে হতো। এখন দালাল আছে, তবে আগের মতো সহজে ভেতরে ঢুকতে পারে না বা সরাসরি সামনে থাকেন না। তাই হয়রানি কিছুটা কমেছে।অপর একজন জানান, গত ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য সব পরীক্ষা শেষ করে টাকা জমা দিয়েছিলেন। চার বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো লাইসেন্স হাতে পাননি। বারবার যোগাযোগ করেও কোনো সঠিক উত্তর পাননি এমন আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দালালের মাধ্যমে করলে হয়তো তিন বছর আগেই লাইসেন্স পেয়ে যেতাম। বিআরটিএর ভোগান্তি যেন শেষই হয় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দালাল চক্রের একাধিক সদস্য জানান, এখানে গাড়ির ফিটনেস করাতে গাড়িপ্রতি গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হয়। প্রতিদিন যদি প্রায় ২০০টি ফিটনেস সম্পন্ন হয়, তাহলে শুধু এই খাত থেকেই প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। আর ছোট পিকআপ ভ্যানের ক্ষেত্রে এই অংক ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। বাসের ক্ষেত্রে একটি ফিটনেস করাতে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে দাবি তাদের। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০টি বাসের ফিটনেস হলে এই খাত থেকেই প্রায় ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়।
এছাড়া গাড়ির মালিকানা বদলির ক্ষেত্রে প্রতিটি ফাইলে প্রায় ২ হাজার টাকা এবং রেজিস্ট্রেশন বা নম্বর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রায় ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৫০টি মালিকানা বদলি হলে শুধু এই খাত থেকেই প্রায় ১ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয় বলে দাবি তাদের। ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। দালাল চক্রের সদস্যদের দাবি, লেখাপড়ায় দুর্বল প্রার্থীদের লাইসেন্স করাতে প্রায় ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং তুলনামূলকভাবে সক্ষম প্রার্থীদের ক্ষেত্রে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে এসব খাত থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন হয় বলে দাবি দালাল চক্রের সদস্যদের। তাদের ভাষ্য, আমরা করলে টাকা কম লাগে, আর সেবাগ্রহীতারা সরাসরি করলে খরচ আরও বেশি পড়ে যায়।
বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো সার্কেল-২-এর উপপরিচালক প্রকৌশলী সৈয়দ আইনুল হুদা চৌধুরী গণমাধ্যমে বলেছেন, বিআরটিএ প্রাঙ্গণের ভেতরে দালালের কোনো দৌরাত্ম্য নেই। গেটের বাইরে দালাল থাকলে সে বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই। তবে অফিসের ভেতরে যাতে কোনো দালাল প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেছেন, নিয়মিত ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। মূল গেটে আনসার সদস্য মোতায়েন রয়েছে এবং সেবাগ্রহীতা ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। যারা প্রবেশ করেন, তাদের এন্ট্রি করে ঢুকতে হয়। ‘অফিসের ভেতরের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন এবং বাইরের দালাল চক্রের মাধ্যমে কাজ করছেন’ এ ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা দালালদেরই জিজ্ঞেস করুন। এ বিষয়ে তিনি অবগত নন বলেও জানান।

এমএসএম / এমএসএম

কেরানীগঞ্জে বিআরটিএ’র কর্মকর্তারা দালালদের মোবাইল ফোনেই সেবা প্রত্যাশীদের সমস্যা সমাধান করছেন

সরকারি স্টাফ ও দালাল সিন্ডিকেটে জিম্মি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ

শতকোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ : আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধ দুদকে আবেদন

আওয়ামী সরকারের জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরাদের আশীর্বাদ পুষ্ট আলাউদ্দিনকে ফায়ার সার্ভিসে নিয়োগ

পাউবো’র নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদী দখলের চাঞ্চল্যকর তথ্য

উপ-পরিচালক ডা. তউহিদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়ালে বছরে তেল বাবদ বেশি খরচ হবে ৬১০০০ কোটি টাকা

রক্তের আল্পনায় ঈদযাত্রা ২০২৬: সড়ক, রেল ও নৌপথে অব্যবস্থাপনার পৈশাচিক উৎসব

রাষ্ট্রীয় অর্থে ‘রাক্ষুসে থাবা’

বিআরটিএর ভাতিজা রফিক এর তোঘলতি বদলি বাণিজ্য

চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্লা রেজাউল করিম গিলে খাচ্ছে চট্টগ্রামের বনাঞ্চল

তথ্যপ্রাপ্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে তথ্য প্রদানে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন বিপ্লব কুন্ডু

‘ফাঁসির মঞ্চ’ থেকে ফিরে সংসদে যাচ্ছেন যারা