চট্টগ্রামে যত্রতত্র ভুয়া মিনারেল ওয়াটার কারখানা! দায়সারা বিএসটিআই
চট্টগ্রামে হাত বাড়ালেই মিলছে মানহীন মিনারেল ওয়াটার (বিশুদ্ধ পানি)। আর যারা এগুলো উৎপাদন করছে তাদের বেশিরভাগ কারখানারই নেই বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনিস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) অনুমোদন। অলিতে গলিতে অনুমোদহীন কারখানার ছড়াছড়ি থাকলেও কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা সরকারি দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো। বিএসটিআই’র ভুয়া লোগো ব্যবহার করে অনেকে ময়লা পানি বাজারজাত করছে। ফলে টাকা দিয়ে কিনে সেই পানি পান করে নানা রকম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ভোক্তা। অভিযোগ উঠছে বিএসআিই’র কতিপয় অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজসে এসব অপ-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে একশ্রেণির লোভী বক্যবসায়ী।
জীবন বাঁচতে পানির কোন বিকল্প নেই, তবে তা হতে হবে অবশ্যই বিশুদ্ধ পানি। পানি বিশুদ্ধ কি-না তা পরিক্ষা করার জন্য আমাদের আছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই। পানি বাজারজাতকরণের জন্য বাধ্যতামূলক পণ্যের তালিকা মোড়কজাত ও প্রচার করতে লাইসেন্স এর কথা বলা থাকলেও মানছেনা অনেকেই। আর এসব অপরাধের বিচার না হওয়ায় দিনের পর দিন বাড়ছে এই অপরাধের পরিমান ও অপরাধীর সংখ্যা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় অলিতে-গলিতে দেখা মেলে মানহীন জারে বিক্রি করা হচ্ছে নানান প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনহীন লগো সম্বলিত মানহীন পানি। ওয়াসার লাইন হতে জারে ভরে সাপ্লাই দেয়া হচ্ছে দোকানে দোকানে। সাধারণ জনগণ অজান্তেই বিশুদ্ধ ভেবে পান করে যাচ্ছে এসব পানি। ফলে নানান পানিবাহিত রোগের হুমকিতে আছে চট্টগ্রাম নগরীর সাধারণ মানুষ।
যেসব কারখানার অনুমোদন আছে:
বিএসটিআই সুত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে বিএসটিআই অনুমোদিত ন্যাচারাল মিনারেল ওয়াটারের অনুমোদন রয়েছে ২ টি প্রতিষ্ঠানের। একটি চট্টগ্রাম নগরীর চাঁন্দগাঁও এলাকায় সানোয়ারা ড্রিংকস এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের উৎপাদিত 'ইয়েস'। অন্য একটি হলো রাউজান গহিরার শ্রী কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের উৎপাদিত 'সিনমিন'। বিএসটিআইয়ের অনুমোদিত ড্রিংকিং ওয়াটারের অনুমোদন আছে ১০ টি প্রতিষ্ঠানের। তার মধ্যে রয়েছে, নাজের ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের‘জারা, তাহেরী এগ্রো ফুডস এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘সতেজ প্রিমিয়ার’ ও ‘অ্যাকুয়া হর্স প্রিমিয়ার’, মের্সাস ফ্রেন্ডস কো এন্টারপ্রাইজের ‘ফ্রেন্ডস কো’, জয় ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘মীম সুপার’ এসএ বেভারেজ লিমিটেডের ‘মুসকান’, এম এন আর বি ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘সালসাবিল’, ফেভারিটা লিমিটেডের ‘ব্লু অ্যাকোয়া’, উইষ্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের ‘ উইষ্ট’ ও ‘কে-ওয়াটার’।
লাইন্সেস নবায়ন ও প্রক্রিয়াধীন আছে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের এগুলো হচ্ছে: আনন্দ পিওর ড্রিংকিং ওয়াটারের ব্র্যান্ড ‘আনন্দ’, ম্যাক বেভারেজের ‘ম্যাক’, মারস (বিডি) ফুড এন্ড বেভারেজের ব্র্যান্ড ‘নিউ ওরিয়েন্ট’, তাকওয়া এন্টারপ্রাইজের (সিরাজ ফুড প্রোডাক্টস) ‘বাহীব’, মীর ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘মীর’, কনফিডেন্স ফুড এন্ড বেভারেজের ‘কনফিডেন্স’, জে বি এন্টারপ্রাইজের ‘দিশা’, এমইবির ‘দাদা’, এস এস ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘শীতল’, শাহ গাজী ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘নীড’, ওরিয়েন্টেড রিফাইন্ড ওয়াটার কোম্পানির ‘মাউন্ট’, মালিক ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘লিন’, মাশরিফা ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের ‘মামিয়া’ উল্লেখযোগ্য।
যেসব কারখানার অনুমোদন নেই:
সরোজমিন ঘুরে দেখা মিলে আরো অসংখ্য প্রতিষ্ঠান বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়াই চলছে এই সব ড্রিংকিং ওয়াটারের কারখানা গুলো।যার সংখ্যা প্রায় অর্ধ শতাধিক। অনুমোদনহীন এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, নগরীর বালুছরা এলাকার ডেলস ইন্টারন্যাশনাল পিউর ড্রিংকিং ওয়াটার ,বাদশা চেয়ারম্যান ঘাটার নাহার ড্রিংকি ওয়াটার, কালামিয়া বাজারের আয়েশা ড্রিংকি ওয়াটার, তুলাতলি বালুর মাঠ এলাকার ইকো ড্রিংকিং ওয়াটার, তুলাতলি নয়া মসজিদ এলাকার ওয়াইসিস ড্রিংকি ওয়াটার, ডিসি রোড শিশু কবরস্থান এলাকার মা ড্রিংকি ওয়াটার, শমসের পাড়া ডেন্টাল হাসপাতালের পাশে স্কাইল্যান্ড ড্রিংকিং ওয়াটার, সিএন্ডবি বালুরটাল এলাকার আল রিয়াদ ড্রিংকিং ওয়াটার, অক্সিজেন মোড় এলাকার ড্রিংকিং ওয়েল ওয়াটার এবং আপন ড্রিংকিং ওয়াটার, অক্সিজেন কয়লার ঘর এলাকার অক্সিজেন ড্রিংকিং ওয়াটার, সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকার পিউর এন্ড ফ্রেশ ড্রিংকিং ওয়াটার, ব্যাটারি গলি মধুবনের বিপরীতে কাউন্সিলর ড্রিংকিং ওয়াটার, জিইসি এলাকার নিডস ড্রিংকিং ওয়াটার, একে খান কমিশনার মঞ্জুর কারখানার পাশে সাজিদ ড্রিংকিং ওয়াটার, ব্যারিস্টার কলেজ মদিনা ড্রিংকিং ওয়াটার, এনায়েত বাজার রাণীর দিঘির পাড় এলাকার ডিউ ড্রপ ড্রিংকিং ওয়াটার ।
কারখানা মালিকের বক্তব্য:
লাইন্সেস জটিলতা নিয়ে চান্দগাঁও এলাকার এস এস ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘শীতল’ ড্রিংকিং ওয়াটারের মালিক সজীব রায় জানান, গত দেড় বছরে নগরীতে প্রায় চল্লিশটিরও বেশি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা অনেক চেষ্টা করেও অনুমোদন পায়নি। আমার মতে ড্রিংকিং ওয়াটার ব্যবসায়ীদের নিয়ে সরকারের আরও ভাবা উচিত।
বালুছড়া ডেলস ইন্টারন্যাশনাল পিউর ড্রিংকিং ওয়াটার কারখার মালিক সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এই ব্যবসা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছি, পানির ব্যবস্যা এখন অলাভজনক ব্যবস্যা। আমাদের এখন প্রচুর অর্থ ব্যয় হয় লাইসেন্স এবং অনুমোদন নেওয়ার জন্য। ভোগান্তির কারনে এই ব্যবস্যা বন্ধ করে দেবেন বলেছেন জানিয়েছেন তিনি।
অক্সিজেন ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানার মালিক বলেন , আপনারা আমাদের লাইসেন্স নাই এটা দেখেন কিন্তু ভাল দিকগুলো দেখেন না, আমার প্রতিষ্ঠানের পানির মান কোন ভাবেই খারাপ না, আমরা যারা ব্যবসা করি মান উত্তির্ন পানি বাজারজাত করণের চেষ্টা করি। নোংরা জারে পানি সাপ্লাইয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, পানির দায় আমি নিতে রাজি, জার আমাদের ডিলাররা বাইরে থেকে কিনি তবে আমরা পরিষ্কার জার ব্যবহার করার চেষ্টা করি।
ক্যাব এর বক্তব্য:
এই বিষয়ে কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু বলেন , নগরের মানুষের প্রধান সমস্যা পানযোগ্য বিশুদ্ধ পানি। দূষিত পানি পানের ফলে সাধারন মানুষ আক্রান্ত হবে নানান ধরনের পানিবাহিত রোগে।আমরা সবসময় নিরাপদ পানি বাজারজাতকরণের জন্য বার বার বলে আসছি। এই সব অনুমোদন হীন কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান গুলোকে অনুরোধ করে আসছি। পাশাপাশি সাধারণ জনগণকে ও সচেতন ভাবে নোংরা এবং মানহীন পানি পান করা হতে বিরত থাকার জন্য বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়ে থাকেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ব্যবসায়ী সমিতির বক্তব্য:
এবিষয়ে চট্টগ্রাম ড্রিংকিং ওয়াটার ওনার এসোসিয়েশনের সভাপতি ফয়সাল আব্দুল্লাহ আদনান বলেন, আমার সংগঠনে নগরে আছে ৪৮টি ও বিভাগে আছে ১২৭টি ড্রিংকি ওয়াটার প্রতিষ্ঠান। নগরে ৫৮টি প্রতিষ্ঠান তালিকায় অনুমোদন ছিল ২০২০ সাল পর্যন্ত। পরে বিএসটিআই লাইন্সেস পাওয়ার শর্ত হিসেবে ৯টি প্যারামিটার সংযোজন করে। যার অনেকগুলি শর্ত বাংলাদেশে পূরণ করা সম্ভব নয়। কারণ আমরা নদীর পানি প্রসেস করি এটাতে প্লেটস (অনুজীবাণু) আগে ১ হাজার রাখা হলেও এখন ১০০ করা হয়েছে। যা শুধুমাত্র পর্বতের পানি প্রসেস করলে সম্ভব। আমাদের দেশে মিনারেল ওয়াটার উৎপাদন করা সম্ভব না, মিনারেল ওয়াটার পর্বত থেকে প্রসেস করা। এছাড়া জার কেলিব্রেশন বিএসটিআই গত বছর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকায় শুরু করেছে। এর আগে তিনটা ১৯ লিটারের জার নিয়ে আমাদের ঢাকা সাইন্স ল্যাবে যেতে হতো। তখন ফি নিতো সাড়ে ৬ হাজার টাকা। যখন সারা বাংলাদেশ থেকে দুই হাজারের কাছাকাছি প্রতিষ্ঠানের চাপ পড়ে তারা তখন ফি বাড়িয়ে ৪৭ হাজার দুইশ টাকা করে। চট্টগ্রাম থেকে জারে করে স্যাম্পল নিয়ে যেতে অনেক সময় লাগে এবং কয়েকদিন অপেক্ষাও করতে হয় এগুলোর মান কিভাবে ঠিক থাকবে। এসব বিষয়ে বিএসটিআইয়ের সহযোগিতা পাচ্ছি না আমরা। আইনে ছিল বিএসটিআই’র কর্মকর্তা সহ থেকে পানির জারগুলো বায়ুনিরোধক পাত্রের সাহায্যে ঢাকায় নেওয়া হবে , কিন্তু বাস্তবে আমরা সেই সহযোগীতা পাচ্ছি না। আমি প্রতি বছর আমার তালিকা হাল নাগাদ করে , ক্যাব, বিএসটিআই এ জমা দিই। অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান আবেদন করে বসে আছে কিন্তু মান উত্তির্ন হতে না পেরে এবং নানান জটিলতার কারণে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। নানান জটিলতা কি প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান বিএসটিআই এইসব পানির কারখানা গুলোর প্রতি কোন নজর ই দেয়না, মাসে মাসে চাঁদা আদায় করে আর না দিলে জরিমানা করে। পরে আগের মত ঠিকই চলে। নোংরা এবং জার ব্যহারের বিষয়ে তিনি বলেন , সাদা জার ব্যবহার করার ফলে ভোগান্তি বাড়ছে, দামও বাড়তি গুনতে হয় আমাদের, নীল বাদামী রং ব্যবহার করে অন্য পানীয় পণ্যগুলি মোড়ক জাত করা হলেও পানির ক্ষেত্রে কেন সাদা জার? পানির মান নিয়ে কাজ করা উচিত, সাধারণ মানুষ যেন নিরাপদ পানি পান করতে পারে। লাইসেন্স এর প্রক্রিয়াগুলো আরো সহজ করার সুযোগ থাকলে ভাল হত বলে জানান তিনি।
বিএসটিআই’র বক্তব্য:
এই বিষেয়ে জানতে চাইলে, অনৈতিক লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করে, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনিস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) চট্টগ্রাম অফিসের সহকারী পরিচালক (সিএম) মোস্তাক আহমেদ বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেই এটা সত্য। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। তাদের বিরুদ্ধে একাধিকবার মামলা ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানাও করা হয়েছে। তাহলে কিভাবে এসব প্রতিষ্ঠান ড্রিংকি ওয়াটারের নামে ওয়াসার পানি জারে ভরে ব্যবসা করছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিএসটিআইয়ের আইনে কারখানা বন্ধ বা সিল করার ক্ষমতা নেই আমাদের। এই সুযোগটাই নিচ্ছে এরা।
এমএসএম / এমএসএম
ভূরুঙ্গামারীতে বিদেশে পাঠিয়ে উপকার করার পর হুমকি ও মারধরের অভিযোগ
নালিতাবাড়ীতে স্বপ্নময় মানবকল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে কম্বল বিতরণ
গলাচিপায় গণভোট জনসচেতনতায় ওপেন এয়ার কনসার্ট
সরিষাবাড়িতে আইন-শৃংখলা ও মাসিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত
কোটালীপাড়ায় গণভোট সচেতনতা সৃষ্টিতে শিক্ষক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অবহিতকরণ সভা
ঠাকুরগাঁওয়ে তিন লাখ টাকার ইয়াবাসহ দুই যুবক গ্রেপ্তার
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথবাহিনী যথা যথ ভূমিকা পালন করবে: নৌবাহিনী প্রধান এম নাজমুল হাসান
মাদারীপুর জেলা শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ নির্বাচিত হওয়ায় সংবর্ধনা
নোয়াখালীতে ইউপি প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভূমি দখল, হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ
সংস্কার ইস্যুতে গণভোট নিয়ে অজ্ঞতা: মনপুরায় নেই তেমন প্রচার-সচেতনতা
জয়পুরহাটে ০১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেকুন নাহার শিখা
ঘোড়াঘাটে জুয়া ও মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ওপর হামলা,গুলিবর্ষণ;গ্রেপ্তার-৫