রায়ের কপি’ বেঁচে ‘প্রাইভেট সিএনজি মালিক কল্যাণ সমিতি’র নেতারা কোটিপতি
রাজধানীতে উচ্চ আদালতের এক ‘রিটপিটিশনের রায়’ এর ফটোকপি বিক্রি করে ‘প্রাইভেট সিএনজি মালিক কল্যাণ সমিতি’র মহাসচিব মো. হোসেনের নেতৃত্বে একটি চক্র ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৬ বছরে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি করার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে সংগঠনের মহাসচিব মো. হোসেন এর সেল ফোনে কল করা হলে তিনি ফোনে কোন কথা বলতে রাজী না হয়ে তার অফিসে গিয়ে কথা বলতে বলেন।
সূত্র জানায়, প্রাইভেট সিএনটি অটোরিকসার লাইসেন্স ও নম্বর প্লেট বিহনী চালানোর দায়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ ধরপাকড় করে। আর এজন্য প্রাইভেট সিএনজি মালিক কল্যাণ সমিতির পক্ষে উচ্চআদালতে একটি রিট পিটিশন করা হয়। আর সেই রিট পিটিশনের আদেশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজধানী ঢাকায় প্রায়ভেট সিএনজি অটোরিকসার ব্যবসায়ীরা এক সম্রাজ্য গড়ে তোলেন। প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকসা মালিক কল্যাণ সমিতির নাম ব্যবহার করে একটি সংগঠনের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের রায়ের অপব্যাখ্যা দিয়ে কোটি কোটি টাকা অভিনব পন্থায় চাঁদাবাজি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ সিএনজি অটোরিকসা বা যানবাহন রাস্তায় নামানোর অভিযোগ পাওয়া যায়।
জানা গেছে, গত ২০১০ সালের উচ্চ আদালতের এক আদেশে সিলভার রঙের প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকসা আটক বা চালক ও মালিকদের ট্রাফিক পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কোন প্রকার হয়রানী না করা হয়, সেই নির্দেশনা দিয়েছিলেন আদালত। এরপর থেকে প্রতারকচক্রের সদস্যরা সেই আদেশের ফটোকপির অপর পিটে সই স্বাক্ষর করে প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকসা নামে গাড়ির মালিক ও চালকদের কাছে বিক্রি করছেন। প্রতিটি গাড়ির জন্য এক বছরের জন্য ১০ হাজার টাকা করে আদায় করে আসছে চক্রটি।
অভিযোগে জানা গেছে, ‘প্রাইভেট সিএনজি মালিক কল্যাণ সমিতি’র সভাপতি শাহজাহান ও মহাসচিব মো. হোসেন উচ্চ আদালতের সেই আদেশের ফটোকপির উল্টোপিঠে স্বাক্ষর করে তা বিক্রি করছেন। ছয় মাস থেকে এক বছর মেয়াদী এই অনুমতির বিনিময়ে প্রত্যেক চালক ও গাড়ির চালক ও মালিকদের কাছ থেকে মোট ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন। প্রাইভেট সিএনজি অটো রিকসা চালকদের ধারনা দেওয়া হচ্ছে যে, আদালতের এই পিটিশনের রায়ের কপি থাকলেই ট্রাইফক পুলিশ ও বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ তাদের গাড়ি ধরবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ‘প্রাইভেট সিএনজি মালিক কল্যাণ সমিতি’র মহাসচিব মো. হোসেন, সবুজ ও জাকির হোসেন এই প্রতারকচক্রের অন্যতম সদস্য। সংগঠনের আগের সাধারণ সম্পাদক পদত্যাগ করার পর মো. হোসেন দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি দায়িত্ব দীর্ঘ দিন পালন করলেও সংগঠনের বার্ষিক রিটার্ন, ও নির্বাচন না করেই তিনি অবৈধভাবে সাধারণ সম্পাদক পরিচয়ের দায়িত্ব পালনকারী হিসেবে আদালতে মামলা দায়ের করেন। এরপর আদালতের রিটপিটিশনের রায় এর কপি বিক্রির মাধ্যমে প্রতিবছর লাখ লাখ টাকা অভিনব পন্থায় চাঁদা আদায় করছেন।
‘প্রাইভেট সিএনজি মালিক কল্যাণ সমিতি’র অন্যতম নেতা ও চক্রের সদস্য আনোয়ার সাদাত ওরফে রাসেল প্রায় ১ হাজার প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকসার মালিক এর কাছে আদালতের রায় এর ফটোকপি বিক্রি করে কোটিপতি বনে গেছেন। শুধু তাই নয়, এই আনোয়ার সাদাত ওরফে রাসেলে গ্যারেজে প্রায় ২শত প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকসা রাখা হচ্ছে। আবার তার অন্যতম সহযোগি ও প্রতারক চক্রের সদস্য সুবজ হাওলাদার রাজধানীর উত্তরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা ও রামপুরা এলাকায় যতগুলো প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকসা আছে। সেগুলোর মালিক ও চালকদের কাছে উক্ত রায়ের কপি বিক্রি করেছেন বলেও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উচ্চ আদালতের রায়ের কপির ফটোকপি দিয়ে চাঁদাবাজির হোতা মো. হোসেন চক্রের রাজধানীতে ৩ হাজার ৯শ, ৫০টি প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকসার আড়ালে বিআরটিএর কর্মকর্তাদের যোগসাজসে প্রায় দুই হাজার প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকসার রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ও ডিজিটাল প্লেট জালিয়াতি করে অবৈধভাবে গাড়িগুলো চালাচ্ছেন। গত ২০১০ সাল থেকে এই ব্যবসা করে একেক সময় একেকটি রিপ পিটিশন করে এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।
এ ব্যাপারে ‘প্রাইভেট সিএনজি মালিক কল্যাণ সমিতি’র প্রতিষ্ঠা সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তিনি সকালের সময়কে জানান, সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা হওয়ার দেড় বছরের মাথায় আমি পদত্যাগ করি। এরপর সংগঠনের কোন প্রকার নির্বাচন বা কমিটি গঠন করা হয়নি। আর সংগঠনের আয় ব্যায়ের কোন হিসাব বা অডিক করা হয়েছে কিনা, তাও এখন পর্যন্ত আমি শুনতে পাই নাই। এছাড়া উচ্চ আদালতের রায়ের ফটো কপির মাধ্যমে গাড়ির মালিকদের কাছ থেকে এক কালীন ১০ হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের বাৎসরিক বাকি পড়ে তাদের কাছ থেকে নেওয়া হতে পারেন। তবে মাসিক চাঁদা দিতে দেরী হলে তাদের কাছ থেকে এককালীন চাঁদা নেওয়া হয় বলে জানিায়েছেন তিনি।
আবার এসব প্রাইভেট সিএনজি অটো রিকসার ইকোনমিক লাইফ বা আয়ুস্কাল ১৫ বছরের মেয়াদ হলেও তা ২০ বছরের বেশী সময় ধরে চালানো হচ্ছে। গত ২০১০ সালের হাইকোর্টের রিটপিটিশনের আবেদনে ২৫০০ সিএনজি অটো রিকসার কথা উল্লেখ করা হলেও তা প্রাইভেট লেখা ইস্টিকার লাগিয়ে ৩৯০০টি সিএনজি রাজধানীতে দৌড়িয়ে বেড়াচ্ছে। একে ১৪০০টির মত প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকসা চালানো হচ্ছে। আর এই ১৪শ অটোরিকসার কোন প্রকার বৈধ কাগজপত্র নেই। শুধু মাত্র ‘প্রাইভেট সিএনজি মালিক কল্যাণ সমিতি’র টোকেন এর মাধ্যমে রাজধানীতে চালানো হচ্ছে। একে বাংলাদেশ সরকার প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব হতে বঞ্চিত হচ্ছে। আর সড়কে বিশৃঙ্খলার পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে।এসব গাড়ির মেয়াদকাল ১৫ বছর হলৌ গত ২০ বছর ধরে চালানো হলেও রাস্তা থেকে তুলে নেওয়ার কোন প্রকার পদক্ষেপ নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। এসব গাড়ির চালক ও মালিকদের ‘প্রাইভেট সিএনজি মালিক কল্যাণ সমিতি’র অনির্বাচিত নেতারা শুধু মাত্র অভিনব চাঁদা আদায়ের জন্যই এই গাড়িগুলো রাস্তায় টিকিয়ে রাখছেন।
সংশ্লিষ্ট একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই মেয়াদত্তীর্ণ ও লক্কর ঝক্কর যানবহান সিএনজি অটোরিকসাগুলো একদিকে নগরীর পরিবেশ নষ্ট করছে। আবার অপরদিকে কোন কোন সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা বা যান্ত্রিক দুর্ঘটনার কারণে মানুষ হতাহতসহ বড় ধরণের দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটছে।
অনেক ক্ষেত্রে পুরাতন বাণিজ্যিক প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকসা সিলভার রং করে প্রাইভেট হিসেবে নগরীতে চালানো হচ্ছে। এসব সিএনজি অটোরিকসার মালিক ও চালকগণ সতিমির টাকা দিতে বিলম্ব করলে, তাদের গাড়ি ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের দিয়ে তা আটক করছেন। ফলে তারা চাঁদা না দিয়ে গাড়ি রাস্তায় নামাতে পারবেন না। হাইকোর্টের রায় চীরস্থায়ী হিসেবে ব্যবহার করেছে চক্রের সদস্যরা। পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ব্যবস্থা না নেওয়ায় সড়কে চলাচলকারী যানবাহন মালিক ও শ্রমিকদের মাঝে নানা ক্ষোভের সৃস্টি হয়েছে। ফলে কথিত সমিতির নির্বাচন নেই, কোট প্রকার হিসাব নিকাশ নেই। অবৈধ সমিতির অফিসসহ চক্রের সদস্যদের চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর অভিযান দাবি করছেন সচেতন মহল।
সমিতির অন্যতম সদস্য আনোয়ার সাদাত সকালের সময়কে জানান, সমিতির নির্বাচন করা না হলেও অডিট ফার্ম থেকে অডিট করা হয়েছে। আর ২০০৭ এ যে আইনের আবেদনের পেক্ষিতে হাইকোর্ট রায় দিয়েছিলেন। সেই রায়টি খারিজ হয়ে গেছে। এরপর ২০১৮ সালের সংশোধনী আইনে পুনরায় আবেদন করা হয়। পরে বিআরটিএ’ রাইট শেয়ারিং এর আইনে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। ওই আবেদনে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের কমিশনার, বিআরটিএর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে বলে জানান তিনি। আর আদালতের সেই আবেদনের ভিত্তিতেই এখন আমাদের সংগঠনের কার্যক্রম চলছে বলে জানান তিনি।
এমএসএম / এমএসএম
রায়ের কপি’ বেঁচে ‘প্রাইভেট সিএনজি মালিক কল্যাণ সমিতি’র নেতারা কোটিপতি
কেরানীগঞ্জে বিআরটিএ’র কর্মকর্তারা দালালদের মোবাইল ফোনেই সেবা প্রত্যাশীদের সমস্যা সমাধান করছেন
সরকারি স্টাফ ও দালাল সিন্ডিকেটে জিম্মি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ
শতকোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ : আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধ দুদকে আবেদন
আওয়ামী সরকারের জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরাদের আশীর্বাদ পুষ্ট আলাউদ্দিনকে ফায়ার সার্ভিসে নিয়োগ
পাউবো’র নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদী দখলের চাঞ্চল্যকর তথ্য
উপ-পরিচালক ডা. তউহিদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়ালে বছরে তেল বাবদ বেশি খরচ হবে ৬১০০০ কোটি টাকা
রক্তের আল্পনায় ঈদযাত্রা ২০২৬: সড়ক, রেল ও নৌপথে অব্যবস্থাপনার পৈশাচিক উৎসব
রাষ্ট্রীয় অর্থে ‘রাক্ষুসে থাবা’
বিআরটিএর ভাতিজা রফিক এর তোঘলতি বদলি বাণিজ্য
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্লা রেজাউল করিম গিলে খাচ্ছে চট্টগ্রামের বনাঞ্চল